করোনা মহামারীতেও পুঁজিবাজারে রেকর্ড
Back to Top

ঢাকা, শুক্রবার, ৭ মে ২০২১ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৮



করোনা মহামারীতেও পুঁজিবাজারে রেকর্ড

জাহিদ সুজন ৭:৩৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০২০

করোনা মহামারীতেও পুঁজিবাজারে রেকর্ড
বছর শেষ মানে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানো। বছরের শুরুটা সেভাবে গুছিয়ে নিতে না পারলেও করোনা মহামারীর বছরে চমক ছিল দেশের পুঁজিবাজারে। ফলে, লেনদেন ও সূচকের চাঙ্গা ভাবের সাথে নতুন নতুন রেকর্ড গড়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

বছরের শুরুতেই টানা বিক্রয় চাপে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় স্বরণকালের সবচেয়ে মন্দাবস্থায় চলে যায় দেশের পুঁজিবাজার৷ শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারী নন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বাজার থেকে সরে যায়৷ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ইক্যুইটি নেতিবাচক হয়ে পড়ায় বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়৷ সব মিলিয়ে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়ে পুঁজিবাজার।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কমিশন পুনর্গঠন, নতুন চেয়্যারম্যান নিয়োগ ও ফ্লোর প্রাইজ নির্ধারণের কারণে করোনা পরবর্তী সময়ে লেনদেন ও সূচকের উল্লম্ফন দেখা দেয় পুঁজিবাজারে। নিম্নে ২০২০ সালের বাজারচিত্র তুলে ধরা হলো:-
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)

শিল্প উদ্যোক্তারা ২০২০ সালে বাজার থেকে মোট ৮টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৯৮৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ৩টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৩১১ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করে৷ অপরদিকে ২০১৯ সালে ১টি করপোরেট বন্ডসহ মোট ৯টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও’র মাধ্যমে মোট ৬৫২ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করা হয়৷ এর মধ্যে ৩টি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে৷

তালিকাভুক্তি
২০২০ সালে ১টি করপোরেট বন্ডসহ মোট ৯টি সিকিউরিটিজ ৬ হাজার ২ কোটি ৭১ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়৷ অপরদিকে ২০১৯ সালে ১টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ মোট ১০টি সিকিউরিটিজ ১ হাজার ৪৪৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়৷

রাইট শেয়ার ইস্যু
২০২০ সালে ১টি কোম্পানি ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৫১টি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ২৩ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৬৫ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে প্রিমিয়াম বাবদ ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৫ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷

অপরদিকে ২০১৯ সালে ২টি কোম্পানি ২০ কোটি ৭৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৮২টি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মোট ২৩১ কোটি ৩০ লাখ ০৫ হাজার ৫০০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷ এর মধ্যে ১ কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩ কোটি ৫৬ লাখ ১৩ হাজার ৬৮০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে৷
কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বব্যাপি স্টক মার্কেটের গতি মন্থর থাকলেও বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সকল ক্ষেএে সাফল্যের মাইলফলক সৃষ্টি করে৷

টাকার অংকে লেনদেন
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে ২০৮ দিন লেনদেন হয়৷ ৩৮ কার্যদিবস লেনদেন কম হলেও ২০২০ সালে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮১ কোটি ২২ লাখ টাকা৷ যা ডিএসই’র ইতিহাসে পঞ্চম সর্বোচ্চ লেনদেন এবং গতবছরের চেয়ে ২১ হাজার ১৫৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ১৮.৫৯ শতাংশ বেশী৷ যার গড় লেনদেন ছিল ৬৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা৷

অপরদিকে ২০১৯ সালে ২৩৭ কার্যদিবসে মোট লেনদেনের পরিমান ছিল ১১৩,৮২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং গড়ে লেনদেনের পরিমান ছিল ৪৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা৷
ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স)

লেনদেনের উল্লম্ফনের সাথে ঊর্ধ্বমুখী ছিল মূল্যসূচক। এবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ৯৪৯.১৩ পয়েন্ট বা ২১.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪০২.০৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়৷ ২০২০ সালে ডিএসইএক্স মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ৫৪০২.০৭ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৩৬০৩.৯৫ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ৪,০৯০.৪৭ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়৷

ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০)
ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) ৪৫০.৬১ পয়েন্ট বা ২৯.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৬৩.৯৬ পয়েন্টে দাঁড়ায়৷ ২০২০ সালে ডিএস৩০ মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ১৯৬৩.৯৬ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ১২০৩.৪৩ পয়েন্ট৷ ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ১,৪৭৩.০১ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাএা শুরু হয়৷
ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস)

একই বছর ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) ২৪২.২৮ পয়েন্ট বা ২৪.২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২৪২.১১ পয়েন্টে উন্নীত হয়৷ ২০২০ সালে ডিএসইএস মূল্য সূচক সর্বোচ্চ ১২৪২.১১ পয়েন্টে উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ৮৩৪.৭৮ পয়েন্ট৷ ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি ৯৪১.২৮ পয়েন্ট নিয়ে এ সূচকের যাত্রা শুরু হয়৷
বাজার মূলধন

২০২০ সালে বাজার মূলধন ডিএসইর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে৷ ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ০৮ হাজার কোটি টাকা বা ৩২.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়৷ ২০২০ সালে বাজার মূলধন সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং সর্বনিম্ন ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার কোটি৷
মার্কেট পিই

২০২০ সালের শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিঃ এ তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ সমূহের মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই দাঁড়ায় ১৫.০৯৷ খাতওয়ারী সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ব্যাংকিং খাতের, যার মার্কেট পিই ৮.১০, ফুয়েল এন্ড পাওয়ার খাতের ১১.১৭, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মার্কেট পিই ১৩.৭৫, টেক্সটাইল খাতের মার্কেট পিই ১৪.৪৫, টেলিকমিউনিকেশন খাতের মার্কেট পিই ১৭.৯৯, ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের মার্কেট পিই ১৮.২৫, সার্ভিসেস এন্ড রিয়েল এস্টেট খাতের মার্কেট পিই ১৮.৪৩, ফার্মাসিউটিক্যালস এন্ড কেমিক্যালস খাতের মার্কেট পিই ১৮.৮৫,ট্যানারি খাতের মার্কেট পিই ২১.১১, ফুড এন্ড এ্যালাইড প্রোডাক্ট খাতের মার্কেট পিই ২৩.০১,আর্থিক খাতের পিই ২৩.৩৬,সিরামিক খাতের মার্কেট পিই ২৪.৮৫, আইটি-খাতের মার্কেট পিই ২৫.৪৭,সিমেন্ট খাতের মার্কেট পিই ২৫.৬৪, ইন্স্যুরেন্স খাতের মার্কেট পিই ২৫.৯১,বিবিধ খাতের মার্কেট পিই ২৬.৩৬, ট্রাভেল এন্ড লেইজার ২৯.৩১, পেপার এন্ড প্রিন্টিং খাতের মার্কেট পিই ৩৪.৭৫ এবং জুট খাতের মার্কেট পিই ৫০.২৬৷ অপরদিকে ২০১৯ সালের শেষে সামগ্রিক বাজার মূল্য আয় অনুপাত বা মার্কেট পিই ছিল ১১.৫১৷
মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২০২০ সালে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ সমূহের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপির অনুপাত দাঁড়ায় ১৬.০৩ শতাংশ, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম৷
বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের লেনদেন

২০২০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বিগত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ৷ ২০২০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০,৩৮৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা৷ যা মোট লেনদেনের ৭.৬৯ শতাংশ৷ অপরদিকে ২০১৯ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭,৮৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা৷ যা মোট লেনদেনের ৬.৮৯ শতাংশ৷
মোবাইল লেনদেন

বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও বিকাশের ফলে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য মডেল এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রেক্ষাপট ও গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে৷ পুঁজিবাজারের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেএে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের সাথে তাল মিলিয়ে কোভিড–১৯ পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে৷ যা ২০২০ সালে ৪৯ হাজার ১৫১ জনে উন্নিত হয়৷ ২০২০ সালে মোবাইলের মাধ্যমে মোট ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৯টি আদেশ প্রেরণ করে৷ এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৪৭টি আদেশ কার্যকর হয়৷ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বোত্তম সুবিধা বিনিয়োগকারীর দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সর্বদা সচেষ্ট৷

ওটিসি মার্কেট
২০২০ সালে ওটিসি মার্কেটে শেয়ার লেনদেন আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে ৯৩.৫৬ শতাংশ। এই বছরে ওটিসি মার্কেটে মোট ১০ লাখ ১৮ হাজার ২৩টি শেয়ার লেনদেন হয়৷ যার মূল্য ১ কোটি ০৯ লাখ ২১ হাজার ৪৯ টাকা৷ অপরদিকে গত বছরে শেয়ার লেনদেনের পরিমান ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৭৪ টি শেয়ার৷ যার মূল্য ছিল ২২ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৮৯২ টাকা৷

জেডএস

 

আরও পড়ুন

আরও