অভিযাত্রীর সীমান্ত অভিযান
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২০ জুন ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

পর্ব-২

অভিযাত্রীর সীমান্ত অভিযান

মো: ইমাম হোসেন, অভিযাত্রী ১:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২১

অভিযাত্রীর সীমান্ত অভিযান
শুভ সকাল, ভুরুঙ্গামাড়ি। সবাই দ্রুত সব গুছিয়ে নিচ্ছে, সে যুদ্ধে যুক্ত হলাম আমিও। এর মধ্যেই এসে উপস্থিত হয়েছে বাংলোর কেয়ারটেকার। বয়স্ক মানুষ, বাড়ি কুড়িগ্রামে, চাকরির প্রায় শেষ দিকে চলে এসেছেন। বেশ পজেটিভ মানুষ। গতকাল এই উপজেলার কিছু মানুষের সাথে কথা হচ্ছিলো। সবাই বয়স্ক, একজন বিদায় দেবার আগে বললেন, তোমাদের কাছে একটা রিকুয়েস্ট। রাতে যেখানেই থাকো, একটু নিরাপদ জায়গা দেখে থেকো। মানুষটার মুখভর্তি সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি। এমন মায়া করে কথাটা বললেন শুনেই কেমন মনটা ভরে গেল। কেয়ারটেকার আঙ্কেল গেছেন নামাজে, আমি রুমেই নামাজ শেষ করলাম। সব গুছিয়ে ফাইনাল চেক দিয়ে বের হব তখনই আবার কেয়ারটেকার আঙ্কেল আসলেন। বিদায় নিয়ে আমরা এবারের বর্ডার ট্রিপের যাত্রা শুরু করলাম। তখন ঘড়ির কাঁটায় ৬.৩০ মিনিট।

‘তার আগে পিচ্চিকে একটা ক্ষুদে বার্তা।’ 
ফাঁকা রাস্তা, মাঝে মাঝে মুসল্লীদের দেখা যাচ্ছে। ডিভাইসে ১০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখাচ্ছে, সাথে ঘন কুয়াশা। হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি বর্ডারের দিকে। হাতের বা পাশে বিজিবি ক্যাম্প রেখে আমরা আরো সামনে যাচ্ছি। রাস্তায় দেখা হলো সাত বিজিবি সদস্যের সাথে, টহল শেষ করে তারা ক্যাম্পে ফিরছেন।

আমাদের বাংলোর কেয়ারটেকার বলেছিলেন এই রাস্তা দিল্লি চলে গেছে। স্যাটেলাইটও তাই দেখাচ্ছে। রাস্তাটা একদম সোজা চলে গেছে দার্জিলিং। মাঝে আশ্চর্য এক কাটা তারের বেড়া। যেটা বিভক্ত করেছে বাংলা, জাতীয়তা আর পরিচয়। কী আশ্চর্য এক নিয়ম মানুষ তৈরি করেছে! নিশ্চয়ই এখানে একসময় সমৃদ্ধ কোনো জনপদ ছিল, না হলে এমন রাস্তা হবার কথা নয়। এখানে মানচিত্র কিছুটা ভারতের মধ্যে ইউ আকারে ঢুকে গেছে। আমরা এর মধ্যে না যেয়ে বামের রাস্তা ধরলাম। মাটির রাস্তা, এখান থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত খুবই কাছে কিন্তু কুয়াশার কারণে দেখা যাচ্ছে না। কিছুটা এগিয়েই আটকে গেলাম, রাস্তার কাজ হচ্ছে। বালুর মধ্যে হেঁটে হেঁটে সাইকেল ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি। 

মাত্র খারাপ রাস্তা শেষ করে ভালো রাস্তায় উঠেছি, আমরা একদম জিরো লাইন এর কাছাকাছি এখান থেকে ডানে দুই মিনিট গেলেই নো-ম্যান্স-ল্যান্ড। এখান থেকে বামে যাবো আমরা। অমনি একটা মোটরসাইকেল এসে থামলো আমাদের সামনে, দুইজন বিজিবি সদস্য। তাদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা বেশ চিন্তিত, বিরক্ত এবং রাগান্বিত। প্রথম দুই মিনিট তাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবার সুযোগই পেলাম না। তারাই বলে গেলেন। তাদের মূল বক্তব্য এমন, আমরা পিছনে যে বিজিবি ক্যাম্প ফেলে এসেছি ওখানে কেউ রিপোর্ট করেছে আমরা সাইকেল নিয়ে ইন্ডিয়ার মধ্যে চলে গিয়েছি। সব কিছু শোনার পর তারাও মজা পেলো। প্রায় ৩ কি:মি: রাস্তা আমাদের এগিয়ে দিয়ে ফুলকুমার নদীর রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। 

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দারুণ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে আমাদের বর্ডার এলাকাগুলোতে। এক সদস্যের তথ্য অনুযায়ী এই অঞ্চলটি 'বি' টাইপ স্পর্শকাতর সীমান্ত। গত দুই বর্ডার ট্রিপে আমরা দেখেছিলাম বিজিবি বিওপিগুলো সীমান্তের জিরো লাইন থেকে বেশ দূরে ছিলো। কিন্তু এবছর আমরা দেখলাম বিওপিগুলো একদম সীমান্ত লাগোয়া। তাদের ভাষ্যমতে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার পাশাপাশি অত্র এলাকায় দেশের জনগণের ভালোমন্দ দেখাও তাদের রেসপন্সিবিলিটির মধ্যে পড়ে।

ফুলকুমার নদীর পাড় দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। হাতের ডানে ফুলকুমার। এখন নদীর মাঝ দিয়ে হালকা পানির স্রোত। কিন্তু নদীর পাড় দেখে বোঝা যাচ্ছে বর্ষায় এটা কী ভয়ংকর! দু'কূল ছাপিয়ে নদীর পানি যে লোকালয় ভাসায় তা বেশ স্পষ্ট। আমরা নদীর পাড়ের মাটির রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। বাঁশঝাড়, বাড়ির খোলা উঠোন পেরিয়ে একটা ব্রিজের কাছে গিয়েই অবাক হলাম। জায়গার নাম খাটের পার, ফুলকুমারের উপরেই ব্রিজ। ব্রিজটার পাশেই একটি ব্রিজের ধ্বংসাবশেষ। যে ব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছি সেটা দেখে বোঝা যাচ্ছে এটাও বেশ পুরানো। অর্থাৎ এই ব্রিজের গুরুত্ব বহুকাল আগ থেকে। আমার যেটুকু মনে হলো শত বছর আগেও এখানে ব্রিজের গুরুত্ব ছিল। গত বর্ডার ট্রিপে রৌমারীর একটা প্রত্যন্ত গ্রাম দিয়ে যাওয়ার পথে একটা সাকো পার হয়েছিলাম। সাকোটার পাশেই ছিল এমন একটা মস্ত ব্রিজের ধ্বংসাবশেষ। সেটিও ছিল এমন বর্ডারের পাশে। এই পুরো অঞ্চলটাই এক সময় ছিল সমৃদ্ধশালী। দেশভাগের পর এসব এলাকা সকল ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ে। 

এতক্ষণে কুয়াশা কেটে গ্রামগুলো জেগে উঠেছে। ব্রিজের পাশেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান, তার সামনেই মস্ত এক বট গাছ আর তার পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই দোকানের আশেপাশে ছোটখাটো আরও কয়েকটা দোকান দেখলাম। সকাল থেকে এখনো কিছু খাওয়া হয়নি। এই দোকানেই খাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

একজন মহিলা দোকানটা চালান। এখানে সকালের খাবারের আয়োজন বলতে গরম লুচি আর ভুনা ডাল৷ কী যে দারুণ সেই ডাল ভুনা, কয়টা করে লুচি খেলাম তা আর জনসম্মুখে না বলি। একজন বয়স্ক মানুষ আমাদের খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন৷ গল্পে গল্পে শুনি এই দোকানি তার স্ত্রী, তিনি পুরোদস্তুর একজন কৃষক। স্ত্রীর একা একা পরিশ্রম হবে বলেই তিনি সাহায্য করছেন। আমাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি মাঠে যাবেন। অনেকেই এর মধ্যেই এসে জুটেছেন আমাদের এখানে৷ কথা হলো সবার সাথে। কথা হলো এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য আর বাজার প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে।

আমাদের সাইকেলযাত্রা শুরু হবার কথা ছিল গতকাল। কিন্তু গতকাল জ্যামের কারণে ভুরুঙ্গামাড়ি পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়েছে। এপি আপু আর নিশু আপুর প্ল্যান ছিল বিজয়ের এই দিনে তারা লাল-সবুজ শাড়িতে পুরোদস্তুর একজন বাঙালি নারীর সাজে সাইকেল চালাবেন। কিন্তু সেটা গতকাল সম্ভব না হলেও আজ তারা শাড়ি পরেই চালাচ্ছেন।

দিনাজপুরকে বলা হয় দেশের শস্য ভান্ডার। মনে পড়লো গতবার বঙ্গ সোনাহাট স্থলবন্দরের দিকে যেয়ে দেখেছিলাম মাঠভরা সোনালী ধান৷ তখন রত্না বলেছিলো সোনালী ধানের জন্যই মেবি সোনাহাট নাম হয়েছে।
যখন মাধ্যমিকের স্টুডেন্ট তখন পড়েছিলাম, প্রাচীন মিসরীয়রা বার্ষিক প্লাবনের জন্য অপেক্ষা করতো। এই বার্ষিক প্লাবনের পরেই যে পূর্ণিমা আসতো সেদিন থেকেই নতুন বছরের গণনা শুরু। তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে পারি এই প্লাবন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্লাবনের ফলে বহুদূর থেকে বহন করে নিয়ে আসা পলি প্লাবন শেষে ফসল উৎপাদনের মূল উপাদান ছিল। নদীবিধৌত এই অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সাথে। 

নাস্তা শেষ করতে করতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগলো। বর্ডার ট্রিপের সব চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য- আমাদের কোনো তাড়া নেই। আমরা গল্প করবো, গ্রাম দেখবো, প্রকৃতি দেখবো। আমরা যাচ্ছি গ্রামের ছোট্ট ছোট্ট বাজার, মাঠ পার হয়ে। আমরা আজ কুড়িগ্রাম জেলা পার হয়ে লালমনিরহাট সদরে ঢুকবো। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ৫০-৫৫ কি:মি: চালানোর ইচ্ছে। 

এরমধ্যে শুনতে পেলাম আজ এপি আপুর অফিসে মিটিং আছে। বেচারির ঘুরতে এসেও শান্তি নেই। জ্যুমে মিটিং অ্যাটেন্ড করবেন। আমার নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, সাইকেলের সিট বারবার নিচে নেমে যাচ্ছে। অগত্যা আজকের দিনটা ওভাবেই চালাতে হবে। রাতে যেখানে থাকবো সেখানে পৌঁছে দেখেশুনে ঠিক করবো। 

কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে চারপাশ। আমরা বর্ডারের আধা কি:মি: এর মধ্যেই আছি। সূর্য উঠে গিয়েছে, মাদ্রাসার অনেক ছেলেমেয়ের সাথে দেখা হচ্ছে।
মাঝেমধ্যেই সরিষা খেতের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। আমরা একটা জমি দেখে দাঁড়ালাম ছবি তোলার জন্য। 


আমাদের মধ্যে একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বারবার। সাত জনের মধ্যে কেউ অনেক আগে চলে যাচ্ছে, কেউ পিছিয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে দিদার ভাই বেশ বিরক্ত। গতকাল রাতে অনেকভাবে আমি আর ইউসুফ ম্যাপ রিডিং করেছি। তাতে লালমনিরহাট ঢুকতে দুইটা অপশন ছিল আমাদের হাতে -
১. ধরোলা ব্রিজ পার হওয়া
২. বর্ডারের কাছাকাছি কোথাও দিয়ে ধরোলা পার হওয়া। 

গুগল ম্যাপ বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ম্যাপেও এখানের নদী পাড়াপাড়ের কোনো তথ্য নেই। তবুও ক্ষীণ আশা নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরলাম। আমাদের তেমন কোনো তাড়া নেই, আমরা আস্তে আস্তে গল্পগুজব করতে করতে এগোচ্ছি। গত রাতে যেমন প্ল্যান হয়েছিলো, আমরা লালমনিরহাট সদর থেকে আরও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। 

দাঁড়িয়েছি চা খাওয়ার জন্য, হঠাৎ খেয়াল করলাম আমরা ভুরুঙ্গামাড়ি পার হয়ে এসেছি। এখন আমরা ফুলবাড়ী উপজেলার মধ্যে। এখানেও চায়ের দোকানি একজন চাচী, চাও বেশ মজার। পাশের রাস্তায় মাইক বাজিয়ে যাচ্ছেন এক বিক্রেতা, গান বাজছে ভাওয়াইয়া। তার কাছ থেকে সেদ্ধ জলপাই কিনে খেলাম।

রাস্তা ছেড়ে একদমই আলমাটির পথ ধরলাম। গ্রামের মেঠো পথ, এই পাকা রাস্তা ছাড়ার সময় একটা রিক্সা আমাদের পার হয়ে চলে গেলো। এই একটা মাত্র রিক্সা দেখলাম সারাদিনে। রিক্সায় দুজন মেয়ে, তারা বেশ উৎসুক আমাদের দেখে৷ এপি আপু অনেকক্ষণ তাদের সাথে গল্প করতে করতে এগিয়ে গেলেন। রাস্তাটা এমন দুই পাশেই বাড়ি মাঝ দিয়ে মাটির রাস্তা। 

মাইকে ভাওয়াইয়া গান শুনে আমি আর নিশু আপু দাঁড়িয়ে গেছি। ভেবেছিলাম এখানে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। পরে দেখি এটা একটা বিয়ে বাড়ি। গ্রামের মহিলারা মেয়েকে গোসল করানোর সময় এমন গান করছে। কণক দা এই গান শুনে অবাক৷ তার মতে এসব গান নাকি বিলুপ্তির পথে৷ মানুষের মুখে মুখে চলে আসা আবহমান বাংলার ভাওয়াইয়া। বিয়ে বাড়ির আশেপাশের সবাই এমনভাবে আমাদের বিয়ে বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন একরকম লজ্জাই পেয়ে গেলাম।

স্যাটেলাইট দেখাচ্ছে, আমরা যে রাস্তার কথা চিন্তা করছি সেটা বর্ডারের খুব কাছাকাছি। হ্যাঁ, কিছুদূর গিয়ে বুঝলাম, হাতের ডানে তারকাটার বেড়া, তারপর নো-ম্যান্স-ল্যান্ড, ধানের জমি তার পরেই মাটির রাস্তায় আমরা। হুট করে আবিষ্কার করলাম আমরা একটা বিজিবি বিওপি এর সামনে এসে পড়েছি। পড়বি পড় মালির ঘাড়ের মতো অবস্থা। তখনই চেক পোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন ওই বিওপি কমান্ডার। মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল, চোখে চশমা, ছিমছাম মানুষটা বেশ কুল টাইপের ট্যালেন্ট। সাধারণত একদম আদর্শ সামরিক কমান্ডার যেমন হয়। 

আমাদের সবার সামনে ইউসুফ। বেচারা পড়েছে কমান্ডারের সামনে। 
চলবে...