চার বছরেও ফল ধরেনি মোতাল্লেবের খেজুর চারায়
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ | ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

চার বছরেও ফল ধরেনি মোতাল্লেবের খেজুর চারায়

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, মে ০৪, ২০২১

চার বছরেও ফল ধরেনি মোতাল্লেবের খেজুর চারায়
সৌদি খেজুর চাষ করে সাফল্য পেয়ে সারা দেশে চমক সৃষ্টি করেছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকার মোতাল্লেব মিয়া। বিস্তীর্ণ খামারে সুমিষ্ট ফলটির থোকা থোকা ফলনের খবর গণমাধ্যমের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়লে তিনি হয়ে যান তারকা। পরিচিতি পান খেজুর মোতাল্লেব নামে।
এরপর থেকে তিনি চারা বিক্রি শুরু করেন। গাছভর্তি মধুফল আর কোটি টাকা লাভের চিত্র সামনে এনে এই মোতাল্লেব লাগামহীন বেশি দামে চারা বিক্রি করতে থাকেন। চারা করার পর স্ত্রী জাতের গাছগুলো নিজের বাগানের জন্য রেখে নিষ্ফলা পুরুষ জাতের গাছ নতুন চাষিদের কাছে গছানোর ফাঁদ পাতেন মোতাল্লেব। 

এভাবে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও তার পেছনে দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা থাকায় ভয়ে কিছু বলতে পারছে না প্রতারিতরা।

চারার দাম ২০ হাজার থেকে লাখ টাকা: 

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেক জাতের খেজুর উৎপন্ন হয়। সেসব জাতের খেজুরের স্বাদ ও আকারভেদে মোতাল্লেব একেকটি চারার দাম নিয়ে থাকেন ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিমানে যারা খেজুরের চারা এনে খেজুর চাষে সাফল্য পেয়েছেন, তাদের পরিবহন খরচসহ কোনো জাতের চারার দামই ১০ হাজার টাকার বেশি পড়েনি। 

জাতীয় পর্যায়ে গণমাধ্যমে মোতাল্লেবের খেজুর চাষে সাফল্য নিয়ে একাধিক অনুষ্ঠান প্রচার হওয়ার পর তিনি অত্যধিক বেশি দামে চারা বিক্রির সুযোগ নেন। 

পরে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তারকা বনে যান তিনি। তার খেজুর চারার ব্যবসা হয়ে ওঠে রমরমা। ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সৌদি খেজুর চাষের সাফল্য নিয়ে ফলাও করে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় তিনি নামেন প্রতারণার নতুন পথে। নিষ্ফলা পুরুষ জাতের চারা আলাদা করে বিক্রি করে লোকসানে ফেলেন অনেক উদ্যোক্তাকে।

সফল চাষি থেকে প্রতারক ব্যবসায়ী: 

একযুগ আগে খেজুর চাষ শুরু করেন মোতাল্লেব, তবে অভিজ্ঞতার অভাবে প্রথম দিকে সুবিধা করতে পারেননি। কয়েক বছর পরে তিনি খেজুর চাষে সাফল্য পাওয়ার পর প্রথমে বাড়াতে থাকেন নিজের খেজুর বাগান। প্রথম দিকে কাঁচা খেজুর হিসেবে ভালো দাম পেয়ে কোটি টাকা আয় করেন। পরে সৌদিফেরত অনেকেই খেজুর চাষে সাফল্য পাওয়ায় তার কাঁচা খেজুর বিক্রির চমক কমে যায়। এরপর তিনি খেজুরের চারা বিক্রিতে নেমে পড়েন। 

এরই মধ্যে কোটি টাকা আয় করায় তিনি বাড়াচ্ছিলেন বাগান ও গাছের সংখ্যা। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় চারা ছোট থাকতেই তিনি কোনটা পুরুষ জাত আর কোনটা নারী জাত তা শনাক্ত করতে শিখে গেছেন। 

নারী জাতের খেজুর গাছই কেবল ফলন দেয়, পুরুষ জাত নিষ্ফলা। গাছের আকৃতি, মোচার আকৃতি, কাটার ঘনত্ব, পাতার চেহারা এবং গাছের বৃদ্ধি দেখে অভিজ্ঞরা সহজেই ধরতে পারেন। তিনি চারা করে বেশির ভাগ নারী জাতগুলো নিজের বাগানের জন্য রাখেন, আর পুরুষ জাতগুলো খেজুর চাষে আগ্রহী নবীন ও অনভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের গছিয়ে দেন। এভাবে চারা গাছের ফাঁদে অনেক চাষি ও উদ্যোক্তাদের সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

প্রতারিত হয়েও ভয়ে মুখ খোলেন না কেউ: 

২০১৭ সালে ৪২ লাখ টাকায় ১০০ চারা কিনে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুঁটিমারীতে বাগান গড়েন এক উদ্যোক্তা। মোটামুটি বড় আকৃতির গাছ ভালুকা থেকে কিনে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে আনা হয়। কিন্তু চার বছরে একটি গাছ ছাড়া কোনো গাছে ফল আসেনি। অথচ অন্য জায়গা থেকে এনে কুড়িগ্রামসহ আশপাশ জেলার একাধিক বাগানে পরে আবাদ শুরু হলেও সেখানে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুরে ভরে গেছে গাছ, লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন চাষি ও উদ্যোক্তরা।

এই বাগানের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বাবলা বলেন, আমরা সার-কীটনাশক ও যত্নের অভাব রাখিনি। গাছে কোনো রোগবালাইয়ে চিহ্ন দেখলে ছুটে গেছি ওষুধ ও স্প্রের জন্য। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বাগান মালিকের সঙ্গে আলাপ করে সব ব্যবস্থা নিয়ে গাছ সুন্দর অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। এখন গাছগুলো তরতাজা ও সুন্দর, তবে ফল ধরছে না। আমরা তো আগে কখনো খেজুর চাষ করিনি। পরে অন্য চাষি ও কৃষি অধিদফতর আমাকে এসে চিহ্নগুলো দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয়, এগুলো পুরুষ জাত।

তিনি বলেন, প্রথম দিকে মোতাল্লেব পরামর্শ দিলেও এখন যোগাযোগ করে না, আমার মোবাইল ফোন ঢুকে না, হয়তো ব্লক করে দিছে। ৪২ লাখ টাকার চারার পেছনে সব মিলে কোটি টাকার ওপরে ব্যয় হয়েছে। এখন পুরোটাই লোকসান।

নীলফামারীর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি গিয়েছি পুঁটিমারীর ওই বাগানে, পাঁচ বছর পর মাত্র একটিতে ফল ধরছে। অথচ সেখানেই কয়েকটি মসজিদে তিন বছর আগে এমন চারা আনা হয়েছিল গাজীপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে। ভালো মানের চারা হওয়ায় গাছগুলো ভালো আছে, ফল ধরবে শিগগিরই।

তাহলে পুঁটিমারীর খেজুর বাগানে কেন ফল ধরল না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চারা তিনভাবে করা হয়। বীজ থেকে, টিস্যু কালচার করে এবং গাছের গোড়ায় গজানো সাকার থেকে। বীজ থেকে উৎপন্ন চারা স্ত্রী জাতের হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। সাকার থেকে স্ত্রী জাতের হয়। আর টিস্যু কালচার থেকে বেশির ভাগ স্ত্রী জাতের হলেও তা ব্যয়বহুল। এ বাগানের বেশির ভাগ বীজ থেকে উৎপন্ন চারা, তাই সেগুলো পুরুষ জাতের। তবে চারা একটু বড় হওয়ার পর তা চাষে অভিজ্ঞরা বুঝতে পারেন, সেগুলো স্ত্রী নাকি পুরুষ জাতের। নতুন কেউ তা বুঝতে না পারলেও অভিজ্ঞ বাগান মালিক কেন এগুলো বিক্রি করলেন, সেটাই প্রশ্ন।

খেজুর চাষের সাফল্য শুধু গণমাধ্যমে আসে। তবে খেজুর চাষ করতে গিয়ে অনেকে সব সম্বল হারিয়েছেন, এমন উদাহরণ অসংখ্য। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই জানিয়েছেন, তারা একটি টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয় কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে মোতাল্লেবের কাছ থেকে খেজুর চারা কিনে চাষ শুরু করেন। এখন প্রতারিত হয়ে লাখ লাখ টাকা লোকসানের স্বীকার হয়েও তারা মুখ খুলতে চান না।

ময়মনসিংহের এক কৃষক বলেন, আমার এক টুকরো জমি ছিল, তার পুরোটাতেই মোতাল্লেবের খেজুরের চারা এনে আবাদ করি। এখন ফলনও আসে না, অন্য শস্যও চাষ করতে পারছি না। অথচ সুদে টাকা এনে চাষ করে সে টাকাও বাড়ছে দিন। আমরা হয়েছে, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

আরেক চাষি বলেন, মক্কা-মদিনার ফল খেজুর চাষ করতে শুরু করছিলাম। গাছগুলো বড় হইছে, দেখতেও সুন্দর লাগে। ফল না হওয়ায় পরে জানলাম, এগুলো বেডা জাতের। পবিত্র এই ফল নিয়ে যারা প্রতারণা করছে, তাদের বিচার আল্লাহ করবো।

আবদুস সবুর নামে একজন বলেন, আপনি এমন একজনকে দেখান, যে মোতাল্লেবের কাছ থেকে চারা নিয়ে খেজুর ফলাতে পেরেছে। পাবেন না। কারণ, সে জেনে-বুঝেই এসব দিচ্ছে।

মোতাল্লেব এসব অভিযোগ আমলে নেন না: 

মোতাল্লেব দরিদ্র থেকে এই খেজুরের বাগান করে কোটিপতি হয়েছেন, এখন তাকে সবাই চেনে। তিনি খোলা কাগজের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উড়িয়ে দেন হাসিমুখে। বলেন, এগুলো লিইখা কিছুই করতে পারবেন না। আর যাগোর খেজুর হয় না, তারা টাকা দিক। আমি এখান থাইকা লোক পাঠাই। তাহলে ঠিকই সব ঠিকঠাক অইব।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও