যে কারণে বাড়ছে বজ্রপাত
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২০ জুন ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

যে কারণে বাড়ছে বজ্রপাত

পরিবর্তন প্রতিবেদক ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৯, ২০২১

যে কারণে বাড়ছে বজ্রপাত
দেশজুড়ে বজ্রপাত ও বজ্রঘাতে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। গত এক দশকে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। চলতি বছর প্রাণহানি ইতোমধ্যে দুইশ ছাড়িয়েছে। আর গত এক সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জনের।
এদিকে গত ২২ দিনে সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন, লম্বা গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, আকাশে কালো মেঘের পরিমাণ ও মেঘে মেঘে ঘর্ষণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বজ্রপাত। 

তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।

ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে সাধারণত বজ্রপাত হয়ে থাকে। তবে কালবৈশাখী সক্রিয় থাকলে বজ্রপাত বেড়ে যায়। চলতি মাসে প্রতিদিনই বজ্রপাত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এতে নিয়মিত মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে।

জুনের প্রথম সপ্তাহেই বজ্রপাতে সারা দেশে ৫৬ জনের মৃত্যুর হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জুন ৯ জন, ৬ জুন ২৫ জন, ৫ জুন ৭ জন, ৪ জুন ৯ জন, ৩ জুন ৫ জন এবং ১ জুন একজনের মৃত্যু হয়েছে। ২ জুন বজ্রপাতে কারও মৃত্যুর কথা জানা যায়নি।

গত ২২ দিনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি, তাড়াশ, কামারখন্দ, রায়গঞ্জ ও কাজীপুরে বজ্রপাতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল এই এগারো বছরে দেশে বজ্রপাতে মোট মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৩৭৯ জন। ২০২০ সালে মারা বজ্রপাতে মারা গেছেন ২৯৮ জন। তবে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে ২০১৮ সালে, ৩৫৯ জন। ২০১৭ সালে মারা গেছেন ৩০১ জন। 

২০১৬ সালে ২০৫ জন, ২০১৫ সালে ১৬০ জন, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৩ সালে ১৮৫ জন, ২০১২ সালে ২০১ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন এবং ২০১০ সালে ১২৩ জন বজ্রপাতে মারা যান। চলতি বছর এপ্রিলের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। 

গত দেড় মাসে বজ্রপাতে ১৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলে ১১০ জন ও মে মাসে (১৯ মে পর্যন্ত) ৫৭ জন মারা গেছে। দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের সমন্বয়কারী মেহেরুন নেসা বলেন, গত দেড় মাসে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা গেছেন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা জেলায়। আর বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে সিলেটে। বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই খোলা মাঠে কাজ করছিলেন বা মাছ ধরছিলেন। 

কালবৈশাখীর কারণে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে এপ্রিল ও মে মাসে। বজ্রপাতে মৃতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ বলেও ডিজাস্টার ফোরামের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে। তবে বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।

আবহাওয়াবিদ মজিদুল ইসলাম বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত যখনই মেঘ হোক তখনই বজ্রপাত হতে পারে। কালবৈশাখী যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, সেটা বজ্রপাতের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তবে শীতকালে বজ্রপাত হয় না, কারণ তখন মেঘ তৈরি হয় না। আর জুনে মৌসুমী বায়ু এলে বজ্রপাত কমে যায়। বজ্রপাতের জন্য যে মেঘগুলো দরকার, সেগুলো হলে যেকোনো সময় বজ্রপাত হতে পারে।’


বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয় 

বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলেই অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। বজ্রপাতের সময় মৃত্যু এড়াতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। সেগুলো হলো- 

পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিন: ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকা যাবে না। এ অবস্থায় সবচেয়ে ভালো হয়, কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে। 

উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকুন: সাধারণত উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এসব জায়গায় যাবেন না বা কাছাকাছি থাকবেন না। ফাঁকা জায়গায় কোনো যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে। 

জানালা থেকে দূরে থাকুন: বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন। 

ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলুন: বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে আহত হন। টিভি-ফ্রিজ থেকে সাবধান বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখুন। 

গাড়ির ভেতরে থাকলে: বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ অবস্থানে ফেরার চেষ্টা করুন। যদি প্রচণ্ড বজ্রপাত ও বৃষ্টির সম্মুখীন হন, তবে গাড়ি কোনো গাড়িবারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে নিয়ে যান। এ সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। 

পানিতে নামা যাবে না: ঝড়-বৃষ্টির সময় রাস্তায় পানি জমাটা আশ্চর্য নয়। তবে বাজ পড়া অব্যাহত থাকলে সে সময় রাস্তায় বের না হওয়াই মঙ্গল। একে তো বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। উপরন্তু কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়।

ব্যক্তির ওপর বজ্রপাত হলে করণীয় 

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাত নিয়ে নানা ধরনের সতর্কবার্তা প্রচার করছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বজ্রপাতে কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে পারলে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। বেশি দেরি হলে আহত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে।

ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ বলেন, বজ্রপাতে আহত হলেও কিছু কিছু মানুষের হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই মারা যায়। আবারো কারও-কারও হার্ট একটু বন্ধ হয়ে আবার চালু হয়। তাদের যখন হাসপাতালে আনা হয় তখন হয়তো আমরা কাউকে-কাউকে রক্ষা করতে পারি। 

তিনি বলেন, যদি আহত ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড সচল থাকে তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর দিতে হবে। সেজন্য সিপিআর সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স বা কোনো গাড়ি ডেকে দ্রুত আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে হবে। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা যাবে না। 

তানভীর আহমেদ বলেন, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে ধরার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। কারণ আহত কিংবা মৃত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও