বস্তিতে পাঁচ বছরে ৮৭২ বার আগুন
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২০ জুন ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

বস্তিতে পাঁচ বছরে ৮৭২ বার আগুন

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৮, ২০২১

বস্তিতে পাঁচ বছরে ৮৭২ বার আগুন
বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন কিছু নয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে সারা দেশের বিভিন্ন বস্তিতে ৮৭২ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ গতকাল সোমবার মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। এ আগুনে বস্তির শতাধিক ঘরে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
সূত্র জানায়, শুধু সাততলা বস্তিতেই এখন পর্যন্ত পাঁচবার আগুন লেগেছে। এর আগে ২০১২, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০২০ সালেও এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। 

ফায়ার সার্ভিস সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবারই বৈদ্যুতিক শট সার্কিট থেকে এই বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে। অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং দুর্বল তারের (ক্যাবল) কারণেই বার বার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।

পাঁচ বছরে ৮৭২ বার বস্তিতে আগুন

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে সারা দেশে ২১ হাজার ৭৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে ১০৯টি। তার আগের বছর ২০১৯ সালে ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ১৭৪টিই লাগে বস্তিতে। ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নি দুর্ঘটনার মধ্যে বস্তিতে আগুন লাগে ১৬৫টি। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বছরটিতে সারা দেশে ১৮ হাজার ১০৫টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৫৪টি ছিল বস্তিতে আগুন। ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৮৫৮টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে বস্তিতে আগুন ছিল ১৭০টি। সে হিসেবে এই পাঁচ বছরে দেশে ৮৭২ বার বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস

সূত্র জানায়, বার বার বস্তিতে আগুন লাগার প্রধান দুটি কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও চুলার আগুন। এ ছাড়া সিগারেটের আগুন আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকেও বিভিন্ন সময় বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।

সাততলা বস্তিতে কেন বার বার আগুন লাগে?

২০১২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে শুধু মহাখালীর সাততলা বস্তিতেই পাঁচবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কেন এই বস্তিতে বার বার আগুন লাগে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগ ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘ঢাকার অন্যান্য বস্তিতে যেভাবে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, সাততলা বস্তিও এর বাইরে নয়। বস্তিতে দাহ্য পদার্থ, বাঁশ, কাঠ দিয়ে তৈরি ঘর, আবার অনেক ঘর দোতলা। এসব কারণে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। সেখান থেকেও আগুনের সূত্রপাত ঘটতে পারে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘বস্তিতে টিনের ঘর অনেক বেশি সেপারেশন হওয়ায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। দাহ্য বস্তুর উপস্থিতি বেশি থাকায় আগুন বেশি ছড়িয়েছে। প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এ দুটির যে কোনো একটি কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ১৮টি ইউনিট কাজ করেছে। এখন পর্যন্ত আগুনে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে।

অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকেই অগ্নিকাণ্ড

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, সাততলা বস্তির ভেতর ছোট ছোট সরু গলি। যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ গ্যাস লাইন। হাঁটার রাস্তার ওপর দিয়ে অরক্ষিতভাবে নেওয়া হয়েছে অধিকাংশ অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন। এসব লাইনের ওপর দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চলাচল করেন। অনেকের রান্নার চুলাও বসানো হয়েছে অরক্ষিত এসব গ্যাস লাইনের কাছে। সংযোগ লাইনের ওপর আবর্জনা থেকে শুরু করে রয়েছে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ।

জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে সাততলা বস্তি। তারা কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দিয়েছে সাততলা বস্তিতে। প্রতিঘর থেকে গ্যাস সংযোগবাবদ চক্রটি হাজার টাকা করে নিচ্ছে। বস্তির প্রায় এক হাজার ঘর থেকে টাকা তুলছে তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের বস্তিটি পরিচালিত হয় স্থানীয় রাজনৈতিক লোকদের দ্বারা। যখন যে দলের সরকার থাকে তখন সেই দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করে। তারাই মূলত বিদ্যুৎ অফিস ও তিতাস গ্যাসের সঙ্গে যোগসাজশ করে আমাদের বস্তিতে অবৈধ সংযোগ দেয়। মাঝে-মধ্যেই গ্যাস লাইনে লিকেজ হয়। আমরা খবর দিলে স্থানীয় নেতারা ম্যাকানিক এনে রাবার দিয়ে লাইন ঠিক করে যায়।’

প্রত্যক্ষদর্শী বস্তিবাসীরা অভিযোগ করেন, দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের গ্যাসের লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত। প্রথমে বালিচাপা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। এতে আগুন নেভে না। বরং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-পূর্ব দিকে। পুড়ে যায় দেড় শতাধিক ঘর। বস্তির বাসিন্দা শফিয়া বেগম বলেন, রাত সাড়ে ৩টার দিকে বস্তির দক্ষিণ পাশে একটি ঘরে রান্নার কাজ চলছিল। চুলা থেকে হঠাৎ করে গ্যাস লিকেজ হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরে ঘরের মানুষজন আগুন আগুন বলে চিৎকার শুরু করলে আমরা বেরিয়ে আসি।

সব হারিয়ে নিঃস্ব ক্ষতিগ্রস্তরা

সাততলা বস্তির বাসিন্দা গার্মেন্টকর্মী নাসরিন ভাবতেও পারেননি তার অনেক কষ্টে জমানো ১৫ হাজার টাকা মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আগুন লাগার পর ঘর থেকে বেরিয়ে যান তিনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর যখন ঘরে ফেরেন তখন দেখতে পান ঘরের সব পুড়ে ছাই। নাসরিন বলেন, ‘টাকা-পয়সা, সব পুড়ে গেছে। সংসার করতি যা লাগে, তার সবই আমাদের ছিল। কিছুই নেই। আমরা ঘুরে দাঁড়াব, সে পরিস্থিতি নেই।’

গতকাল সোমবার ভোর ৪টার দিকে লাগা ওই আগুনে পুড়ে গেছে রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের ঘরও। রফিকুল বলেন, ‘আমার ঘরের একটা জিনিসও নিতে পারিনি। গায়ে একটা গেঞ্জি ছিল। সে অবস্থায় বেরিয়ে গেছি। আমি রিকশা চালাই। নিজের উপার্জনের টাকায় যা জিনিস কিনছিলাম, সব পুড়ে গেল।’

ক্ষতিগ্রস্ত নান্টু মিয়া বলেন, ‘আমি ৫ বছর ধরে এই বস্তিতে থাকি। ঘরে নিজেই বাস্কেট, ফুলদানি, পা-পোছ, জায়নামাজ এগুলো বানিয়ে মহাখালীতে বিক্রি করি। পরিবার নিয়ে ধীরে ধীরে বড় করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এক আগুন আমার সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেল। আসবাবপত্র-ব্যবসার মালামাল কিচ্ছু বের করতে পারি নাই।’

তদন্ত কমিটি গঠন

সাততলা বস্তিতে আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক নূর হাসানকে সভাপতি করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন, তেজগাঁও জোনের কমান্ডার উপ-সহকারি পরিচালক আবুল বাশার (সদস্য সচিব), তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার এবং একই স্টেশনের দুজন পরিদর্শক (ওয়্যার হাউস)।

পাঁচ হাজার টাকা করে অনুদান মেয়রের

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীদের জন্য তাৎক্ষণিক পাঁচ হাজার টাকা করে অনুদান ঘোষণা করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম আতিক। 

বস্তি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীদের ঘর নির্মাণের জন্য টিনের ব্যবস্থা করা হবে। তাৎক্ষণিক খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে আরও কী ধরনের সহযোগিতা করা যায় সেগুলো নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও