একজন সফল বাবার গল্প
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ | ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

একজন সফল বাবার গল্প

আব্দুল্লাহ আল নোমান ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২১

একজন সফল বাবার গল্প
মো. আব্দুল লতিফ। বয়স ৬৬ বছর। পেশায় প্রথমে ছিলেন তামাক উন্নয়ন বোর্ডের সুপারভাইজার। আব্দুল লতিফের বাসা টাঙ্গাইলে হলেও চাকরিসূত্রে থাকতেন রংপুর। চাকরির শুরুতে তিনি বেতন পেতেন ৩০৮ টাকা।

পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় তাকে সামান্য বেতন দিয়েই নিজে এবং সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে হতো। ফলে তাকে কষ্ট করতে হতো অনেক। ১৯৮৩ সালে সরকার তামাক উন্নয়ন বোর্ডে বিপুল করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সাথে সংযুক্ত করে। 

পরবর্তীতে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-সহকারী কৃষি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। পরে পদোন্নতী পেয়ে তিনি সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার হয়েছিলেন। এ চাকরি থেকে তিনি ২০১৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরির শেষের দিকে তার বেতন হয় ৩৬ হাজার টাকা। ১৯৮৬ সালে তিনি বিয়ে করেন। তিনি দুই সন্তানের বাবা হন। সন্তানদের তিনি অনেক কষ্টে এবং ধার-দেনা করে লেখাপড়া করান। বর্তমানে আব্দুল লতিফের বড় ছেলে আলিম আল রাজি আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আর ছোট ছেলে আসিফ আল রাবি ডাক্তারি পাস করে বর্তমানে ইর্ন্টানি করছেন।  

আব্দুল লতিফের বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হুগড়া ইউনিয়নের চকগোপাল গ্রামে।  আব্দুল লতিফ বলেন, আমি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে বড় হয়েছি। আমার বাবা দর্জির কাজ করতো। এর ফলে আমাদের অনেক কষ্টে দিনযাপন করতে হতো। এই দূরঅবস্থায়ও আমার বাবা মা আমাকে ‘আইএসসি’ পর্যন্ত লেখাপড়া করায়। পরবর্তীতে আমি ১৯৭৭ সালে রংপুরে মাত্র ৩০৬ টাকা বেতনে একটি চাকরি শুরু করি। এই সামান্য বেতন দিয়ে নিজে চলাও খুব দূরূহ ছিলো। 

তিনি আরো বলেন, যেহেতু আমার বাবা মাকে সংসার খরচের জন্য টাকা দিতে হতো, যার কারণে আমি চাকরি পাওয়ার ৯ বছর পরে বিয়ে করি। পরবর্তীতে আমার প্রথম সন্তান জন্ম হলে, তাকে কিভাবে লেখাপড়া করাবো তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। তারপর বেতনের থেকে কিছু কিছু টাকা বাঁচিয়ে আগেই বিভিন্ন প্রকার বই কেনা শুরু করি। আমার ছেলে যখন কথা বলা শুরু করে তখন থেকেই চাকরির অবসর সময়ে তাকে আমি নিজেই লেখাপড়া শিখাতে শুরু করি। আমার ছেলেকে আমি এমনভাবে পরিচর্যা করেছি যাতে কোনো রোগবালাইয়ে আক্রান্ত না হয়। আমি নিজে তাকে গোসল করিয়েছি। অতি অল্প বেতনের টাকা দিয়েও আমি পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করেছি, যাতে তাদের বুদ্ধি ভালোভাবে বিকশিত হয় এবং সব কিছুর ধারণ ক্ষমতা তাদের মধ্যে থাকে। 

প্রথম ছেলে আলিম আল রাজিকে যখন আমি নার্সারিতে ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুল রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি করাতে গেলাম, স্কুল কর্তৃপক্ষ আমার বেতনের কথা শুনে জানায় ‘আপনি তো গরিব মানুষ। আপনার ছেলেকে এই স্কুলের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে পারবেন না। এখানে পড়াতে গেলে অনেক টাকা লাগবে। পরবর্তীতে আমি তাদের বলি, আমি গরিব হতে পারি। কিন্ত আমার মনটা অনেক ধনী। একথা শুনে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমার ছেলেকে ভর্তি করে নেয়।’ ছাত্র হিসেবে শুরু থেকেই আমার ছেলে খুবই মেধাবী ছিলো। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার পর আমি আর ইংলিশ মিডিয়ামের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারছিলাম না। যে কারণে পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে তাকে একই স্কুলে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করাই। এ অবস্থায় আমার দ্বিতীয় সন্তান আসিফ আল রাবি জন্মগ্রহণ করে। আমার ছেলের কোনো প্রাইভেট শিক্ষক ছিলো না। আমি নিজেই তাকে পড়াতাম। বড় ছেলে আলিম আল রাজি অষ্টম শ্রেণীতে ট্যানেলপুলে বৃত্তি পায়। এসএসসি এবং এইচএসসিতে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’ পায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করার জন্য ঢাকায় পাঠানোর মতো সাধ্য ছিলো না আমার। তাই কোচিং ছাড়াই বাসায় নিজে নিজে পড়ে খুলনা প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারে ‘খুয়েটে’ চান্স পায়। এদিকে ছোট ছেলেকেও রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি করাতে হয় বলে তিনি জানান। 

তিনি আরো বলেন, আলিম আল রাজি খুলনা প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পাস করে স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকার ‘এমএস’ করার জন্য ভর্তি হয়। পরবর্তীতে আলিম আল রাজি সেখানেই পিএসডি শেষ করে। বর্তমানে সে আমেরিকাতেই ইঞ্জিনিয়ারে হিসেবে কর্মরর্ত রয়েছেন। তার মাসে বেতন এখন ৭ লাখ টাকা। একইভাবে আমি আমার ছোট ছেলে আসিফ আল রাবিকে লেখাপড়া করাই। রাবির ডাক্তারি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু সরকারি মেডিকেলে চান্স পায় না। কিন্তু আমার ছেলের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য কোনো প্রকার টাকা না থাকা সত্তেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করাই। ছেলেকে মেডিকেলে ভর্তি ও চাকরি শেষ হওয়ার কারণে আমরা রংপুর থেকে ঢাকায় চলে আসি। অবসরের পর পেনশনের সব টাকা দিয়ে বাড়ি ঘর না করে ভাড়া বাসায় থেকে ছেলেকে মেডিকেলে পড়াই। বর্তমানে সে ইর্ন্টানি চিকিৎসক হিসেবে ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজে কর্মরত রয়েছে। 

আব্দুল লতিফের কথায় জানা যায়, ছেলেদের লেখাপড়া করার কারণে তিনি এবং তার স্ত্রী ভালো জামা কাপড় পড়িনি এবং এক টাকাও সঞ্চয় করতে পারেনি। সব টাকা পয়সা ছেলেদের পেছনে খরচ করেছেন। তার বিশ্বাস ছিলো তার সকল সম্পদ ছেলেরা। তার কোন চাওয়া পাওয়া ছিলো না। তাদের সকল খরচ এখন বড় ছেলে বহন করছে। তিনি ছেলেদের নিয়ে এখন খুব গর্ববোধ করেন। তিনি তাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করতে পেরেছেন। এটাই তার বাবা হিসেবে জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। 

আব্দুল লতিফের ছোট ছেলে ডা. আসিফ আল রাবি বলেন, আমার জীবনের প্রতিটি সফলতার ও ডাক্তার হয়ে উঠার পেছনে যে মানুষটি সব চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তিনি হলেন আমার বাবা। সন্তানদের জন্য বাবারা যে এতো ত্যাগ ও কষ্ট করতে পারে আমার বাবার সানিধ্যে না থাকলে তা অনুভব করতে পারতাম না। তার এই অবদান কোনো কিছুর বিনিময়ে পরিশোধ করার যোগ্য নয়। ভবিষ্যৎতে আরো বড় ডাক্তার হয়ে বাবার সম্মান বৃদ্ধি করাই আমার মূল লক্ষ্য। 

এসকে
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও