প্রজন্ম ডুবে আছে অ্যান্ড্রয়েড স্ক্রিনে
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২০ জুন ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

প্রজন্ম ডুবে আছে অ্যান্ড্রয়েড স্ক্রিনে

কামরুজ্জামান তোতা ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২১

প্রজন্ম ডুবে আছে অ্যান্ড্রয়েড স্ক্রিনে
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ও জাতি গঠনে চাই উন্মুক্ত স্থান ও খেলার মাঠ। মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস ফেলার অধিকার শিশুটির জন্মগত অধিকার। শিশুকিশোরদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে খোলা জায়গার প্রয়োজনীয়তা অনেক।

সারাদিন কর্মব্যস্ততার পরে যেখানে অবসরে একটু বসা যায়, কথা বলা যায় সমমনস্ক কারও সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে মন হালকা করা যায় তেমন একটু খোলা জায়গার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
 
আবার দেখা যায় স্কুল আছে। স্কুলে কয়েকশ’ ছাত্রছাত্রী। স্কুলের একটি খেলার মাঠ নেই। টিফিনের ফাঁকে, ছুটির পরে ছাত্রছাত্রীরা খেলাধুলা করে না। মাঠ নেই, বল খেলবে কোথায়? ক্লাসে বসে কেউ ঝিমোয়। কেউবা ভিডিও গেম খেলে; যা শরীরের জন্য ভালো নয়। রাজধানীর অসংখ্য স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয় না। অবশ্য চাঁদা নেওয়া হয়। স্কুলে খেলার মাঠ থাকবে না, এমনটি আগে ভাবাও যেত না। স্কুলের বাইরেও কি খেলার মাঠ আছে? বিকেলবেলা ছেলেমেয়েরা ঘরে বসে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে। 

বাস্তবে অর্ধেক স্কুলে নেই খেলার মাঠ এবং যা আছে তার কোনোটার বেশিরভাগ, কোনোটার কিছু অংশ প্রভাবশালীদের দখলে। দোকান করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে মাঠের অংশ। ভালো খেলার মাঠ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারণ খেলার মাঠগুলোতে নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়, মেলা, ওরস, মিলাদ, কনসার্ট, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের কাজে ব্যবহার করা হয়। কেটেকুটে মাঠকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। ইট-বালির পাকা স্থাপনা বসানো হয়। বাঁশ পুঁতে প্যান্ডেল করা হয়। কর্মকাণ্ড শেষ হয়ে যায়। তবে মাঠের অবস্থা আর খেলার মতো থাকে না। সঠিকভাবে নির্মাণসামগ্রী সরানো হয় না। এমন অবস্থায় খেলাধুলা করতে গিয়ে পা কেটে অনেকেই আহত হন। তবে মাঠের উন্নয়নে তাদের তৎপরতা তেমন নেই। কেউ মাঠের ক্ষতি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এটা বড়ই দুঃখের বিষয়। সবুজে ঢাকা ভালো মাঠগুলো এভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে।

একসময় শহরে গ্রামে অনেক খোলা জায়গা ছিল যা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে সকল খোলা জায়গা অপরিকল্পিতভাবে দালানকোঠা নির্মাণের ফলে আজ প্রায় বিলীনের পথে। যতটুকু অবশিষ্ট আছে তা আনুষ্ঠানিক ও আইনগতভাবে খেলার মাঠ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে বিভিন্নভাবে দখল করার পাঁয়তারা চলছে। এসব এলাকা, মহল্লা, বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে খেলার মাঠবিহীন থাকবে না এ প্রত্যাশা সকলের। 

সরকারিভাবে মাঝে মাঝে মাঠ সংরক্ষণের আশার বাণী দেওয়া হলেও বাস্তবিক অর্থে মাঠ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং এখনো যে সকল মাঠ আছে তা সংরক্ষণের কোনো অগ্রগতি হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পার্ক ও খেলার মাঠের দাবি, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার, খেলার মাঠে মেলার নামে জুয়ার আসর বসানো, এসব নিয়ে এরই মধ্যে জোর আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এলাকাভিত্তিক কোনো কোনো স্থানে পার্ক, খেলার মাঠ, শিশু পার্ক প্রভৃতি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এসবের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
 
এখন দেশের সকল শহর বন্দর নগরে এমনকি গ্রামও অনেকাংশে এমনটিই হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। বিশেষ করে শৈশব কৈশোরের দুরন্তপনা, যা ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠার অন্যতম শর্ত তা আজ আটকা পড়েছে টিভি কার্টুন আর কম্পিউটার গেমসের বেড়াজালে। আমাদের পর্যাপ্ত খেলার জায়গা না থাকায় শিশু-কিশোররা ঘরে বসে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। হচ্ছে মস্তিষ্কনির্ভর খেলায় অভ্যস্ত, শরীরনির্ভর খেলা ভুলে যাচ্ছে। শারীরিকভাবে অলস হয়ে যাচ্ছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে না, এতে প্রায় শিশুরা খিটখিটে মেজাজের, অপরিপক্ক আচরণ এবং বিপথগামী পথে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

শিশুর শেখার ক্ষমতা, বুদ্ধি-চেতনার উন্নতির ওপর তাদের সার্বিক বৃদ্ধি-বিকাশ ও বড় হওয়া নির্ভর করে এবং সবকিছুর ওপরে চারপাশের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলার ওপরেও সেটা নির্ভরশীল। খেলাধুলার সময়ে, একটি শিশু উল্লিখিত সবকিছুর সঙ্গে আরও অনেক কিছুই শেখে। শিশু বেড়ে ওঠার সময়ে তার খেলার ধরনও বদলায়। শিশুর মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে, সে যাই করুক না কেন, খেলার সময় আবশ্য মনঃসংযোগ দরকার হয়। এটা যেহেতু তার কী কী করা উচিত অথবা কীভাবে খেলা দরকার সেটা একভাবে সৃজনশীলতার পরীক্ষা নেয় বলে, শিশুর চিন্তাভাবনার ক্ষমতাকে সক্রিয় করে তোলে। খেলাধুলা একাধারে মনোনিবেশ বাড়ানোর সঙ্গে সামাজিক শিক্ষাও গড়ে তোলে। 

খেলাধুলা কিন্তু সবসময়ে শারীরিক কিংবা বাইরের গতিবিধির ওপর মনোনিবেশ করা নয়। সেটা বাড়ির ভিতরেও হতে পারে। অনেক শিশুই রঙ-তুলি নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। তারা ফিগার বা প্রাকৃতিক দৃশ্য রঙ করে। মাটির ডেলা দিয়ে কিছু বানানো অথবা নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো তৈরি করতে, এরা নরম মাটি নিয়েও খেলা করে। এইসব ধরনের খেলাধুলা শিশুর স্পষ্ট ভাব ও ভিতরের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে সাহায্য করে। যেকোনো সৃজনশীল বা গঠনমূলক খেলা একটা শিশুকে তার ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

নিজের শিশুকে পরে যখনই খেলতে দেখবেন, তখন তাকে না আটকিয়ে বরং ভালোভাবে সময় কাটাতে উৎসাহিত করুন। আপনি জানেন যে উপকারিতা প্রচুর তাই শিশুকে বৃদ্ধি-বিকাশ ও বেড়ে ওঠার সেরা সময় উপভোগ করতে দিন। 

অন্যদিকে, খেলার মাঠ দখল করে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ ও শিল্পকারখানা তৈরি করা হচ্ছে মফস্বল শহরগুলোতে। কৈশোরে একমাত্র বিনোদনের স্থান হলো খেলার মাঠ। আর এই মাঠগুলো দিন দিন প্রভাবশালীদের দখলে যাচ্ছে, হচ্ছে যৌবনের বিনোদন কেন্দ্র। বর্তমান সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণের মধ্যে খেলার মাঠের স্বল্পতা অন্যতম। 

এর জন্য সমাজব্যবস্থা ও মফস্বল শহরগুলোর অপরিণত পরিকল্পনাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এই অপরিণত পরিকল্পনায় একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুবিধা পেয়ে থাকলেও তা নিকটবর্তী প্রজন্মের জন্য শঙ্কাপূর্ণ। আজ থেকে ১০-১৫ বছর পিছনে তাকালেই একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে। একসময় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারও ছেলেমেয়েদের একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর মনে হয়। ফলে তারা চায় নতুন বা চমকপ্রদ কোনো অভিনব বিষয়ের মাধ্যমে আনন্দ পেতে খেলার মাঠ না থাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধপ্রবণতা।

পর্যাপ্ত খেলার মাঠ এবং শারীরিক শক্তি ব্যয় হবে এমন খেলাধুলার ব্যবস্থা না থাকায় ভিডিও গেম, প্লে­-স্টেশন, স্মার্টফোন বা ট্যাবের স্ক্রিনে শিশুর ডুবে থাকার পুরো দায় অভিভাবকের। গবেষণা বলছে, শিশুরা ভিডিও গেমে কী খেলছে তার ওপর নির্ভর করে তার আচরণ। নিজেদের জীবনযাপন বাধামুক্ত রাখতে এবং সহজে শিশুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিভাইস ধরিয়ে এক জায়গায় বসিয়ে রাখেন অভিভাবকরা। ফলে শিশুর আশপাশের জগৎ বা প্রতিদিন যে নতুন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। 

গবেষকরা বলছেন, অভিভাবকরা যদি তাদের সন্তানদের ভিডিও গেম খেলার মাত্রা এবং স্ক্রিনে কী দেখবে তার ধরনের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তাহলে প্রভাবটি কমতে পারে। আর শিশুদের গড়ে তোলার পদ্ধতি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন- যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না সেহেতু ভিডিও গেমের সঙ্গে পরিচিত না করানোই একমাত্র উপায়।

সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স ও চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, প্রথমেই এটা স্বীকার করে নিতে হবে, শিশুদের ভিডিও গেম আসক্তির জন্য পরিবারের বড়রা দায়ী। বড়রা যখন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা ও নিজেদের সময় দিতে পারে না কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না, তারা শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, কম্পিউটারের মাধ্যমে গেমস তুলে দেয়। 

অনেক অভিভাবক এ ধরনের গেমসকে শিশুদের ব্যস্ত রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ফলে শিশুর যথাযথ বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশু মানুষের সঙ্গে মিশতে শেখে না, সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠে না, ফলে বাইরের পৃথিবী থেকে এই শিশুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, কী ধরনের ভিডিও গেম খেলছে তার ওপর নির্ভর করে তার ভিতরে হিংস্রতা, অশ্লীলতা, অসামাজিকতা কিংবা স্বার্থপরতার বিকাশ ঘটতে পারে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে যারা ভিডিও গেম খেলে তার দুই থেকে তিন শতাংশ ‘গেমিং ডিজঅর্ডারে’ ভোগে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সে কারণে ভিডিও গেম আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকাভুক্ত করেছে।

ভায়োলেন্ট ভিডিও গেমস ইফেক্টস অন চিলড্রেন অ্যান্ড এডোলসেন্ট : থিওরি রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক পলিসি শিরোনামে গবেষণায় গবেষকরা একটি স্কুলের তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পর্যালোচনা করে দেখতে চেয়েছেন- শিক্ষাবর্ষে শুরু থেকে যারা প্রতিনিয়ত সহিংসতামূলক ভিডিও গেম খেলে, তারা শিক্ষাবর্ষের শেষে গিয়ে উগ্র হয়ে যাচ্ছে কিনা। গবেষকরা জানতে পারেন, গেম খেলার পরিমাণ এবং গেমের ধরনের ওপর বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভরশীল।

স্কুলের পারফরমেন্স খারাপ হওয়ার পিছনে ভিডিও গেম খেলার পরিমাণ অনেকাংশে দায়ী। সহিংসতামূলক ভিডিও গেম খেলার মধ্য দিয়ে ‘পৃথিবীটা একটা নির্মম জায়গা’ এ রকম একটা ধারণার জন্ম নেয়। কথাবার্তা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মধ্যে এক ধরনের উগ্রতা কাজ করে, সমাজগত আচরণ তাদের মধ্যে লোপ পায়।

পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধপ্রবণতা। শিশুরা হয়ে পড়ছে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ আসক্ত। শারীরিকভাবে হয়ে পড়ছে দুর্বল। বিগত বছরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বসতবাড়ি। ফলে পতিত জমিগুলো আর ফাঁকা পড়ে না থাকায় ছেলেমেয়েরা তাদের নিজ নিজ এলাকার স্কুল কিংবা কলেজের মাঠে খেলাধুলা করতে পারছে না। 

বর্তমানে মফস্বল শহরের স্কুল কিংবা কলেজের মাঠগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এরং অধিকাংশ স্কুলে চালু না হওয়ার ফলে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর সেই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের বিকেলের সময়গুলো অতিবাহিত করছে। ফলে শারীরিক ও মানসিক দু’ভাবেই তারা বিপর্যয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক, ঝিনাইদহ।
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও