মৌসুমে চাঙ্গা রাঙ্গামাটির পর্যটন
Back to Top

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

মৌসুমে চাঙ্গা রাঙ্গামাটির পর্যটন

প্রান্ত রনি, রাঙ্গামাটি ৫:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২০

মৌসুমে চাঙ্গা রাঙ্গামাটির পর্যটন

পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে পাহাড়ের পর্যটন। বিগত কয়েক মৌসুমের তুলনায় এ বছর রাঙ্গামাটিতে পর্যটক বেড়েছে প্রচুর। ফলে এ খাতের সঙ্গে জড়িতরাও ব্যস্ত সময় পারছেন। বিশেষ করে হোটেল-মোটেল, কটেজ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট বোটচালক, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকদের নজর কাড়ছে স্থানীয় তাঁতশিল্পও। তবে স্থানীয়ভাবে পর্যটনশিল্পকে আরো অগ্রসর করা না গেলে এ ধারাবাহিকতা হারাবে রাঙ্গামাটি, এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের অন্যতম আর্কষণীয় পর্যটন এলাকা রাঙ্গামাটি। মূলত শীতের আবহ শুরু হলেও পাহাড়ে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ে। এই সময়টাকে স্থানীয়রা ‘পর্যটন মৌসুম’ বলে থাকেন। বছরের নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে পর্যটন মৌসুমের ধারাবাহিকতা থাকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

রাঙ্গামাটি শহরের আশপাশে পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যটন ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, ডিসি বাংলো, কাপ্তাই হ্রদ, আরণ্যক, চাকমা রাজার বাড়ি, আসামবস্তি, কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি সড়কের বরগাঙ ও বেরাইন্যা।

তবে রাঙ্গামাটি শহরের মধ্যেই জেলা পুলিশ পরিচালিত পলওয়েল পার্কটি এখন স্থানীয় ও বাইরে থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে অন্যতম আর্কষণ। এছাড়া জেলা শহরের অদূরে ফুরমোন পাহাড়, বরকলের ঠেগামুখ ও সুন্দরী সাজেকসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে এসে প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন সিগ্ধা সরকার। সিগ্ধা জানান, ‘কর্মব্যস্ত জীবনে মাঝে মধ্যে ছুটি পেলেই প্রকৃতির মাঝে ছুটে আসি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছি। তবে পাহাড়ে অন্যরকম এক মুগ্ধতা রয়েছে। এই জল পাহাড়ের দেশে এসে একেবারেই ফিরতে মন চাইছে না।’

সাজেকের পর্যটক পলাশ মজুমদার জানিয়েছেন, ‘প্রতিবছরই এই সিজনে আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখি। এ বছর বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করলাম পাহাড়ে ঘুরবে। রাঙ্গামাটি শহর এলাকায় ঘুরে খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকে আসলাম। এই পাহাড়ের ভালোবাসা ও সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ হলাম। তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম পর্যটকরা সেখানে-যেখানে ময়লা ও নিষিদ্ধ পলিথিন ফেলছেন। ব্যাপারটি আমাদের বেশ ভালো লাগেনি। আমরা সবাই একটু সচেতন হলেই প্রকৃতিতে সুন্দর রাখতে পারি।’

রাঙ্গামাটি শহরের তবলছড়ি টেক্সটাইলের মার্কেটের বিক্রেতারা জানান, শীতকাল হওয়ায় পর্যটকদের বিশেষ চাহিদায় রয়েছে স্থানীয় তাঁতের তৈরি চাঁদরের। এছাড়া যারা পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন, তারা অনেকেই পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক কিনছেন। সবমিলিয়ে জমে ওঠেছে স্থানীয় তাঁতশিল্পের পণ্য বেচাকেনায়।

কাপ্তাই হ্রদে ইঞ্জিনচালিত ট্যুরিস্ট বোটচালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, সারা বছরের তুলনায় পর্যটকে মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটক অনেককটা বেড়েছে। তবে সব পর্যটক হ্রদে তেমন একটা ঘুরে বেড়ান না। তবুও মোটামুটিভাবে ট্যুরিস্টবোট ভালোই ভাড়া হচ্ছে।

রাঙ্গামাটি পর্যটন বোটঘাটের ম্যানেজার রমজান আলী জানিয়েছেন, সারাবছর পর্যটকদের সমাগম কম থাকায় ট্যুরিস্টবোটও কম ভাড়া হয়। আমরা মূলত পর্যটন মৌসুমের দিকেই চেয়ে থাকি। এ সময়ে পর্যাপ্ত বোট ভাড়ায় হওয়ায় এই খাতের সঙ্গে জড়িতদের পরিবারেরও আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে।

আবাসিক হোটেল মতিমহলের সত্ত্বাধিকারী মো. শফিউল আজম জানান, এ বছর পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা বেশি অন্যবারের তুলনায়। তবে বেশির ভাগই পর্যটক সকালে এসে বিকেলে চলে যান। যার কারণে হোটেলে-মোটেলে একটু চাপ পড়ে কম। তবে পর্যটকদের কাছে রাঙ্গামাটির আর্কষণ আরও ফুটিয়ে তোলা না গেলে বর্তমানের ধারাবাহিকতাও থাকবে না।

রাঙ্গামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটক বাড়লেও ডিসেম্বরের চেয়ে জানুয়ারি মাসে পর্যটক কিছুটা কমেছে। আমাদের এখন প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজারের মতো ঝুলন্ত সেতুতে প্রবেশের টিকেট বিক্রি হচ্ছে।

রাঙ্গামাটির সাজেকে অবস্থিত অবকাশ রিসোর্টের সত্ত্বাধিকারী লালমিং ময়া বলেন, সপ্তাহের প্রতিদিনই সাজেকে পর্যটকদের উপস্থিতি রয়েছে। মৌসুমকে ঘিরে আমাদের ব্যবসা ভালোই চলছে। প্রতিদিন সাজেকে দুই হাজারের মতো পর্যটকের সমাগম ঘটছে। তবে তুলনামূলকভাবে শুক্র ও শনিবারে এ সংখ্যা আরো বাড়ে।

রাঙ্গামাটি জেলা হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দীন সেলিম বলেন, ‘এ বছর বিগত কয়েক বছরের চেয়ে ব্যাপকহারে রাঙ্গামাটিতে পর্যটক আসছে। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের এদিকে সুনজর দিতে হবে। এই রাঙ্গামাটিতে ঝুলন্ত সেতুটাই পর্যটকের আর্কষণ। কিন্তু বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পর্যটন শিল্পে আমাদের পরে কাজ শুরু করলেও আজ এই দুই জেলায় আমাদের চেয়ে পর্যটকদের পদচারণা বেশি। তারা সময়ের সঙ্গে তালমিলিয়ে পর্যটকদের জন্য ক্যাবলকারসহ অন্যান্য আকর্ষনীয় কেন্দ্র গড়ে তুলেছে, এক্ষেত্রে আমরা অনেকটা পিছিয়ে। তাই রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে রাঙ্গামাটির সম্ভাবনাময়ী এই শিল্পের দিকে সুনজর দিতে হবে।’

এদিকে পাহাড়ের পর্যটনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থা। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি থেকে রাঙ্গামাটি শহর থেকে বরকল উপজেলার দুর্গম ঠেগামুখ পর্যন্ত নৌ-পথে লঞ্চ চলাচল চালু হয়েছে। অথচ আগে এই দুর্গম পথটিতে যেতে হলে বরকল হয়ে আলাদা, আলাদাভাবে যেতে হতো, তাও রিজার্ভবোটে করে। এখন সরাসরি লঞ্চের মাধ্যমে ঠেগামুখে পৌঁছাতে পারবেন নৌ-পথের যাত্রীরা।

এ প্রসঙ্গে নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থা, রাঙ্গামাটি জোনের চেয়ারম্যান মো. মঈন উদ্দীন সেলিম জানান, আমরা বিআইডব্লিউটি’র অনুমোদনক্রমে নতুন বছরের শুরুতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে রাঙ্গামাটি থেকে ঠেগামুখ পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল চালু হল। এই সার্ভিসের সাড়া পেতে যদিও একটু সময় লাগবে। আমরা আশাবাদী , ঠেগামুখের পরিচিত পেলে এটা সাজেকের চেয়ে ব্যাপকহারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠবে।

জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশ পরিদর্শক মাকসুদ আহাম্মদ পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা শহরের পর্যটক স্পটগুলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রেখেছি। বিশেষ করে সুবলং ঝর্না, পর্যটন ঝুলন্ত সেতু, শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন এলাকায়। এছাড়া আমাদের ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা কাপ্তাই হ্রদে স্টিডবোটের মাধ্যমে নৌ-টহল অব্যাহত রেখেছে।’

এইচআর

 

: আরও পড়ুন

আরও