থ্যালিডোমাইড: প্রজন্ম ধংসকারী এক ওষুধ
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

>

থ্যালিডোমাইড: প্রজন্ম ধংসকারী এক ওষুধ

ডা: মো: মিজানুর রহমান ৩:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২২

থ্যালিডোমাইড: প্রজন্ম ধংসকারী এক ওষুধ
একবার ভেবে দেখুনতো, বাংলাদেশে হঠাৎ করেই জন্মগত হাত পা ছাড়া অনেক বাচ্চা জন্ম নেয়া শুরু করলো। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি জেলায় ৩০/৫০টি বাচ্চা এমন জন্ম নিলেও বছর কয়েক পর দেখা গেল ১০-১৫ হাজার বাচ্চা জন্ম নিয়েছে যাদের জন্মগত হাত-পা নেই কিংবা থাকলেও আংগুল নেই! এছাড়া ১ বছর পর সমীক্ষা করে জানা গেল প্রায় এক লক্ষের অধিক বাচ্চা জন্মগ্রহনকালে কিংবা জন্মের পরে মারা গিয়েছে।

এমন ভৌতিক ঘটনা হয়ত আপনি সিনেমাতে দেখতে চাইবেন কিন্তু বাস্তবে নয়। কিন্তু দুনিয়াতে কতিপয় মানুষের লোভের কারণেই এমন ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৭০/৮০ বছর আগে।

শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডে, পরে জার্মানি জাপান, অস্ট্রেলিয়াতেও বার্থ ডিফেক্টসহ বাচ্চার জন্ম নেয়। এক সময় শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোতেই ১০ হাজারের অধিক বাচ্চা একই সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়।

ঘটনার শুরু ১৯৫০ এর দিকে:
মার্চ, ১৯৫৪ উত্তর-পশ্চিম জার্মানির ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কেমি গ্রুয়েন্থাল-এর হাত ধরে আবিষ্কৃত হয় থ্যালিডোমাইড। এই কোম্পানিই তার কিছুদিন আগে পেনিসিলিন বাজারে এনেছিল। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, কোম্পানির মালিক 'হারমেন উইর্টজ' এলার্জি প্রতিরোধক ওষুধ বানানোর জন্য একদল রসায়নবিদকে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত, তারা থ্যালিডোমাইড আবিষ্কার করে ফেলে। প্রাথমিক পরীক্ষা চালানো হয় ইঁদুরের ওপর।
  
যেকোনো ওষুধ কতটা ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত, সেটা বোঝার জন্য স্ট্যান্ডার্ড টক্সিসিটি টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষায় করা হলো একদল ইঁদুর নিয়ে। সেগুলোর অর্ধেক মারা যাওয়া পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো হয়। যে পরিমাণ ওষুধের জন্য অর্ধেক ইঁদুর মারা যায়, তাকে বলে লিথাল ডোজ ৫০ বা LD50 লেভেল। এই মাত্রা থেকে হিসেব করে বের করা হয়, মানুষের জন্য ওষুধটা আদৌ ব্যবহার করা যাবে কি না বা গেলে, কতটুকু ব্যবহার করা যাবে। 

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত থ্যালিডোমাইডের স্ট্যান্ডার্ড টক্সিসিটি টেস্ট রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গড়ে প্রতি কেজি ওজনের ইঁদুরে ৫,০০০ মিলিগ্রাম থ্যালিডোমাইড পুশ করেও কোনো ধরনের বিষক্রিয়া দেখা যায়নি। থ্যালিডোমাইড বেশ ভালো সিডেটিভ বা ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

১৯৫৬ সাল থেকে ওই কোম্পানির বিজ্ঞানীরা ঘুম হয় না কিংবা দুশ্চিন্তায় ভুগছে- এমন রোগীদেরকে প্রথম এই ওষুধ দিতে শুরু করে। এই ধাপটাকে বলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এরা সবাই এমনিতে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। জার্মান মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, রোগীরা থ্যালিডোমাইডের কারিকুরিতে সন্তুষ্ট। সেই সাথে এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

১৯৬০ পর্যন্ত যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তার কোনোটিতেই প্রজনন বা নবজাতকের উপরে এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাবের কথা পাওয়া যায়নি। যদিও এইসব রিপোর্টে অনেক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। 

১৯৫৬ সালের নভেম্বরে কমন ফ্লু-এর ওষুধ হিসেবে ‘গ্রিপেক্স’ বাজারে আসে থ্যালিডোমাইড। জার্মান ভাষায় কমন ফ্লুকে বলে ‘গ্রিপে’। সেই থেকেই এই নাম। পরবর্তী বছর আরো ২টি ব্র্যান্ডে বাজারে আসে এটি। ‘কন্টারগ্যান’ নামের ওষুধটি দুশ্চিন্তার ওষুধ হিসেবে ছাড়া হয়, আর ‘কন্টারগ্যান ফোর্ট্যে’ ছাড়া হয় ঘুমের ওষুধ হিসেবে। দুটোই বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তখন সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। জার্মানি ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এর মাঝে শুরু হয়ে গেছে স্নায়ুযুদ্ধ। এসব কিছুর মাঝে থ্যালিডোমাইড জার্মানির জন্য বিশাল এক আশীর্বাদ হয়ে এলো। বাজারের অন্যান্য ওষুধের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি বিক্রি হচ্ছিল এটি।

১৯৫৯ সালের শুরু দিকে প্রথম প্রসূতি মায়েরা এই ওষুধ খেতে শুরু করে। সে সময় পর্যন্ত আর যেসব সিডেটিভ ছিল, সবগুলোরই কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল। তাছাড়া, প্রসূতি মায়েদের মর্নিং সিকনেস এবং বিভিন্ন ব্যথার জন্য ওসব সিডেটিভ অনেক বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করতে হতো। 

এদিকে থ্যালিডোমাইডের মাত্রা যেমন কম লাগে, তেমনি এটি দারুণ কার্যকরী এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তখনও পাওয়া যায়নি।

১৯৬১ সালের মধ্যে থ্যালিডোমাইড অসম্ভব জনপ্রিয় এক ওষুধে পরিণত হয়। ফলে ৬৫টি ব্র্যান্ড বা কোম্পানির হাত ধরে ৪৬টা দেশে ঝড়ের গতিতে বিক্রি হয় এই ওষুধ।

কিন্তু এক বছর দেখা গেল বার্থ ডিফেক্টসহ বাচ্চার ডেলিভারি হচ্ছে বিভিন্ন এরিয়াতে। প্রথমে বিষয়টা কারো তেমন নজরে আসেনি। বছর দুই পর দেখা গেল হা-পা বিহীন অনেক বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। তখন অনেকেরই টনক নড়ে। অনেক পিতামাতা নিজের সদ্য জন্মনেয়া বাচ্চা হা-পা নেই দেখে হতাশ হয়ে পড়েন। অনেকেই চিকিৎসক এর কাজে গেলেও চিকিৎসক প্রকৃত কারন ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ওষুধটি যেহেতু ইউরোপ থেকে জাপান ও অস্ট্রেলিয়াতে সাপ্লাই হয়েছিল,তাই অস্ট্রেলিয়াতেও বার্থ ডিফেক্টসহ বাচ্চা ডেলিভারির পরিমাণ বেড়ে যায়।
 
১৯৬১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফার্মাকোলজি প্রফেসর উইলিয়াম ব্রাইড সন্দেহ করেন ‘থ্যালিডোমাইড’- এর কারনেই হয়ত এমন হচ্ছে। তাই তিনি ইউনিভার্সিটি অফ সিডনিকে রিকুয়েস্ট করেন যেন ‘থ্যালিডোমাইড’ নিয়ে ভাল করে রিসার্চ করা হয়। মানুষ ও পশুর গবেষণা চলে যখন তারা প্যাগনেন্ট অবস্থায় থাকে। অনেক গবেষণার পর দেখা যায় যে, পশু প্যাগনেন্ট অবস্থায় থ্যালিডোমাইড নিলেও তাদের পেটের বাচ্চার কোনো সমস্যা হয়নি, অথচ মানুষ এর বাচ্চার ক্ষেত্রে মায়ের পেটেই বাচ্চার হা-পা ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে না আর হলেও সেটা আশানুরূপ হচ্ছে না।

এই গবেষণা রিপোর্ট পাঠানো হয় অন্যান্য দেশে এবং থ্যালিডোমাইড যেন প্র্যাগনেন্ট মায়েদের না দেয়া হয় সেই রিকুয়েস্ট করা হয়। ইউরোপের দেশগুলোতেও এই গবেষণা হয়। বিশেষ করে জার্মানিতে ব্যপক গবেষণা হয় এবং প্রমাণিত হয় যে থ্যালিডোমাইড এর জন্যেই বাচ্চা মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় বাচ্চার হাত-পা কিংবা নাক কান ডেভেলপমেন্ট হয়না আর হলেও সেটা স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না।

তবে ওই সময়ে ইউরোপের দেশগুলো ভুগতে থাকলেও একই সময়ে থ্যালিডোমাইড এর ব্যপার সতর্ক ছিল আমেরিকা। Dr Frances Kelsey- যিনি U.S. Food and Drug Administration এর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সহায়তা নিয়ে থ্যালিডোমাইড বাজারজাত করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হন। মূলত ১৯৬০ সালে ‘কেভাডন’ ব্র্যান্ড নামে থ্যালিডোমাইডের অনুমতি চেয়ে একটি চিঠি পেয়েছিল আমেরিকা। 

সেটা তদন্ত করার দায়িত্ব পান 'ফ্র্যান্সিস ওল্ডহ্যাম কেলসি' উপর। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য না পাওয়ায় ওষুধটি বাজারজাত করার অনুমতি দেননি তিনি। তাছাড়া উইলিয়াম এস মার্সেল নামের এক আমেরিকান ড্রাগ-কোম্পানির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে একটা রিপোর্টও করেছিল। তারপরেও ১৭ জন আমেরিকান শিশুর ব্যপারে তথ্য পাওয়া যায়, যাদের অঙ্গবিকৃতি হয়েছিল।

প্রায় এক বছর আটকে রাখার পর, ১৯৬১ সালের দিকে এই ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অথচ প্রথমবার এর অফিসিয়াল প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ১৯৬০ সালের দিকেই। উইলহ্যাম কসনোও এবং রুডলফ ফাইফ্যার নামের দুজন ডাক্তার জন্মগতভাবে দুটি শিশুর অঙ্গবিকৃতির কথা জানান। রিপোর্টে তারা বাচ্চাগুলোর এক্স-রে ফিল্মও যুক্ত করে দিয়েছিলেন।

সে বছরের সেপ্টেম্বর হ্যানস-রুডলফ ওয়াইডারম্যান এরকম ২৭ জন শিশুর কথা রিপোর্ট করেন। সমস্যা হচ্ছে, এদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছিল এবং জার্মানির বাইরের কোথাও থেকে তখনো সেভাবে রিপোর্ট আসেনি। ফলে ডাক্তাররা যুদ্ধের সময়কার তেজস্ক্রিয়তা বা কোনো ধরনের রাসায়নিক ছড়িয়ে যাওয়ার ফল হিসেবে একে গণ্য করছিলেন।

এদিকে 'উইডুকিন্ড লেঞ্জ' নামে আরেক শিশু বিশেষজ্ঞ বেশ কিছু বাচ্চার এরকম অবস্থা দেখার পর এ নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। তিনি প্রসূতি মায়েদের পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু জেনে নিতে চেষ্টা করেন। মোট ১৮টি এমন কেসের সন্ধান পাওয়া গেল, যেখানে মায়েরা নতুন বলতে এক থ্যালিডোমাইডই খেয়েছেন। এছাড়া আর সব কিছু তারা স্বাভাবিক নিয়মেই করেছেন। সে বছরের নভেম্বরে গ্রুয়েন্থালের রিসার্চ ডিরেক্টর হেনরিক মুকটারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে থ্যালিডোমাইডের ক্ষতিকর দিক থাকার কথা জানান। 

তাতেও লাভ হয়নি। এদিকে কসনোও এবং ফাইফ্যারও এ নিয়ে কাজ করছিলেন। ১৯৬১ সালের ১৯ নভেম্বর অ্যাসোসিয়েশন অফ পেডায়াট্রিশিয়ানস ইন রেইনল্যান্ড-ওয়েস্টফ্যালিয়া-এর এক মিটিংয়ে তারা তাদের গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত বলেন। তাদের প্রেজেন্টেশন থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড হারে মায়ের পেটে থাকতেই বাচ্চারা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সেই মিটিংয়ে লেঞ্জও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেদিন প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে ঘোষনা দেন , একটা নির্দিষ্ট ওষুধই (থ্যালিডোমাইড)- এর জন্য দায়ী।

শুরু হয়েছিল ওয়েল্ট এন্ড সনট্যাগ নামের একটা ম্যগাজিনের হাত ধরে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় সব পত্র-পত্রিকায় লেঞ্জের বিবৃতি দিয়ে খবরটি প্রকাশিত হয়। থলের বিড়াল বেরিয়ে যাওয়ায় গ্রুয়েন্থাল দ্রুত বাজার থেকে থ্যালিডোমাইডের সব ওষুধ সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিভিন্ন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বাজার থেকে সব ওষুধ সরিয়ে নিতে নিতেও লেগে যায় প্রায় এক বছর।

ততদিনে ক্ষতি যা হবার হয়ে গিয়েছে। ১০ হাজারের অধিক শিশু বিকৃত অংগ নিয়ে জন্ম নিয়ে নিয়েছে। 

কেবল সরকারি হিসেবেই দুনিয়া জুড়ে এক লক্ষ তেইশ হাজারের কম বেশি শিশু জন্মের আগে বা জন্মের সময় মারা গেছে। এক কথায় একটা প্রজন্ম ধ্বংস হয়েছে শুধু মাত্র একটি ওষুধ কোম্পানির কিছু মানুষের লোভের কারণে।

১৩ মার্চ, ১৯৬৭। উত্তর রাইন-ওয়েস্টফ্যালিয়ারর স্টেট প্রসিকিউটর গ্রুয়েন্থালের ১৮ জন কর্মী এবং বিজ্ঞানীর নামে মামলা করেন। সেই মামলা কোর্টে ওঠে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে। ‘কনটারগ্যান ট্রায়াল’ নামে খ্যাত এই বিচারকাজ প্রায় আড়াই বছর ধরে চলেছে।

চিন্তা করুন, পুরো একটা প্রজন্ম ধ্বংস করে দেয়ার পরেও কতটা ক্ষমতা এবং টাকার জোরে থাকলে এরকম একটা মামলা এতদিন ধরে চলতে পারে। মোট ৬০ জন বিশেষজ্ঞ এবং ১২০ জন সাক্ষীর বিবৃতি, রিপোর্ট এবং বিভিন্ন প্রমাণ পরীক্ষা করে গ্রুয়েন্থালকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।