অকৃত্রিম ভালোলাগার গল্প ‘তারান্নুম’
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ১৩ কার্তিক ১৪২৮

অকৃত্রিম ভালোলাগার গল্প ‘তারান্নুম’

ওমর বিশ্বাস ১:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০১, ২০২১

অকৃত্রিম ভালোলাগার গল্প ‘তারান্নুম’
কথাসাহিত্যিক দীলতাজ রহমানের অষ্টম গল্পগ্রন্থ ‘তারান্নুম’। গ্রন্থে স্থান পেয়েছে আটটি গল্প। গল্পগুলোর বিষয়-আশয় একরকম নয়, ভিন্নতায় রচিত বৈচিত্র্যময় একটি থেকে আরেকটি। ঝরঝরে শব্দে গাঁথা বাক্যবিন্যাসে গল্পগুলো এমন এক কাব্যিক গীতলতার আবহ সৃষ্টি করেছে যা পাঠককে পাঠ শেষ না করা অবধি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে উৎসুক করে রাখে। বহুমাত্রিকতার মিশেল রয়েছে গল্পগুলোতে। বইটি পড়ে মনে হয় জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞানে সাজানো হয়েছে গল্পগুলো যা আটটি জ্বলজ্বলে নক্ষত্রসম। যা বহুদূর থেকেও দেখা যায়। বোঝা যায় তার ঔজ্জ্বল্য।

গ্রন্থের নাম মূল গল্প ‘তারান্নুম’-এর নামে রাখা হয়েছে। গ্রন্থের নাম গল্পের তারান্নুমের অনবদ্য সৃষ্টিশৈলীতে সার্থক বলতে কোনো দ্বিধা থাকে না। তারান্নুম একটি দীর্ঘ গল্প। এটি গ্রন্থের প্রথম গল্প। আর গল্পটি প্রায় দেড়শ’ পৃষ্ঠার গ্রন্থের অর্ধেক। কিন্তু দীর্ঘ অবয়বের হলেও এত বড় গল্পটি টানটান উত্তেজনায় ঠাসা। একবারের জন্যও পাঠক হিসেবে পড়তে কোনো ধরনের বিরক্তির উদয় হয় না। ঘটনাগুলো চোখের ক্যানভাসে ধরা দেয় জীবন্ত হয়ে। অন্য গল্পগুলো হলো : চোর, প্রতিদান, শালি, মমতাজ, বাবুডাইং, আব্রুছেঁড়া শীত ও আলোর সৌরভ।

কথাসাহিত্যিক দীলতাজ রহমানের সার্থকতা এখানেই যে, তিনি পাঠককে তার লেখার শক্তির মধ্য দিয়ে গল্পকে চেনাতে পেরেছেন। এক দুর্নিবার আকর্ষণ শব্দের পরতে পরতে যেভাবে লুকিয়ে থাকে তা পাঠককে মোহমুগ্ধের মতো করে রাখে। ফলে শেষ না করে ওঠা যায় না। তার গল্পের ভাষা খুবই সহজ, শব্দ প্রয়োগে কোনো ভারিক্কি নেই। কিন্তু বুননের রুচিশীল প্রয়োগে শৈল্পিক হয়ে ওঠে। বাক্যবিন্যাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রয়োগ আছে। তবে বাক্যগুলো প্রাণহীন লাগে না। সহজ, সাধারণ ভাষা প্রয়োগের এই ক্ষমতা আমাদের বাংলা গদ্যসাহিত্যে খুব সার্থকভাবে খুব বেশি দেখা যায় না। তিনি যা বলছেন তাতে একটা অদৃশ্য অনুভব সাড়া দেয়। তার আকর্ষণ ক্ষমতার কাছে পাঠককে হার মানতে হয়। এই প্রায়োগিক ক্ষমতাকে সহজাত বলেই মনে হয়। তা না হলে তার গল্পের ভিতর কৃত্রিমতা ধরা পড়ত। অথচ তার ভাব, ভাষা, শব্দ, বাক্যগুলো কোনো প্রকার কৃত্রিমতা বর্জিত। আর এটাই বুঝি তার গল্পগুলোর গল্প হয়ে ওঠার একটা প্রাণ।

আমরা তার গল্পে যে সব কাহিনিগুলো দেখতে পাই সাদা চোখে হয়তো কারওর কাছে সাদামাটা মনে হলেও হতে পারে। কিন্তু গল্প হয়ে ওঠার জন্য গল্পের কাঠামোকে বিন্যস্ত তিনি যেভাবে করেছেন তা অসাধারণ। এই অসাধারণ উপস্থাপন ক্ষমতা কি সবার আছে! সব গল্পকারের আছে? প্রথম প্রথম ধরাই যায় না তিনি গল্পে কী বলতে চান, গল্পকে কোথায় নিয়ে যেতে চান। গল্পের মাঝপথে এসে মনে হবে যে, গল্পটা বুঝি এভাবে বা ওভাবে শেষ হবে। এর জন্য নিজের মতো করে একটা পরিসমাপ্তি কল্পনা করা যায়। কিন্তু বাস্তবে তার কল্পনাশক্তি আর পাঠকের কল্পনার সমাপ্তির মিল পাওয়া যায় না। গল্পকারের কল্পনাশক্তি আরও প্রবল হওয়ায় গল্পের যে শেষটুকু তা অদ্ভুতভাবে বাঁক নেয় নতুন কোনো দিকে, যা এতক্ষণ পাঠক হয়তো ধারণাও করতে পারেনি। এটা পাঠককে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায়। গল্পকারের শক্তিমত্তার পরিচয় পাঠককে যখন ভাবায়, এখানেই তৈরি হয় একজন পাঠকের কাছে একজন গল্পকারের প্রিয়তা।

এখানে তিনি তার পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। গল্পকার হিসেবে দীলতাজ রহমান পাঠকের মনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। তিনি গল্পগুলোতে সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন, মনোবিশ্লেষণ করেছেন। চেতনা উচ্চমার্গের কথাও বলেছেন গল্পে। জীবনের কথা বলেছেন। সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। বক্তব্য সবই যে এখানে আছে। তবে তার বাড়াবাড়ি নেই। মাত্রাতিরিক্ত মেদ নেই। কথাগুলো পরিষ্কার। বক্তব্যে ঝরঝরে, গীতল। তাই তার গল্পগুলো সুখপাঠ্য এবং প্রবল আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে এখানে। সাহিত্যেও গল্প-উপন্যাসের ভিতর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানার যে প্রবল ক্ষমতা তা সব লেখকের একরকম থাকে না। অনেকেই শব্দের মারপ্যাঁচে পাঠককে অন্তঃসারশূন্য গল্প দিয়ে বোকা বানিয়ে সাহিত্যে মোহ সৃষ্টি করতে চান। অনেকে আবার পাঠককে বোকা ভাবতে চান। আবার অনেক সময় সুন্দর করে গল্প বলার ক্ষমতাও যে সবার থাকে না। দীলতাজ রহমানের গল্পগুলোতে সে রকম কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া কোনো পাঠকই খুঁজে পাবে বলে আশা করা যায় না। তার গল্পগুলোতে অন্তঃসারশূন্য কিছু লক্ষ্য করা যায় না।

গল্পের আঙ্গিকগত দিক দিয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সমাজের বাস্তবতা দিয়ে সাজানো আমাদের নিত্যদিনের চারপাশের কাহিনি। গল্পের ভিতর এমন অনেক দিক রয়েছে যা আমরা সাধারণত এড়িয়ে যাই। এর অনেক কিছুই তিনি তার গল্পের বিষয়বস্তুতে তুলে এনেছেন। তিনি জানেন মানুষ গল্পে কী চায়? তাই মানুষের কথাই নিজের গল্পের ভিতর দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

উপমা বাক্যবিন্যাসে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে তার গল্প। শব্দের দুর্বোধ্যতা নেই- তাই বাক্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত হলেও বক্তব্যগুলো পড়তে যেমন কষ্ট হয় না, তেমনি বাক্যবিন্যাসে জটিলতা লক্ষ্য করা যায় না। সুন্দর সুন্দর কথ্যভাষার একেবারে কথ্য শব্দগুলো খুব সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই তার গল্পগুলোতে। এগুলো একই সঙ্গে কাহিনি বুঝতে, গল্পের ব্যাখ্যায়, উপস্থাপনায় সাহায্য করেন তেমনি গল্পপাঠে আনন্দের খোরাক সৃষ্টি করে। উপমার মতো কাজ করে শব্দগুলো- পাঠের ক্ষেত্রে এসবকে বাহুল্য বলে মনে হয় না। গল্পের ভিতরকার সমাজচিত্রকে অনুধাবন করতে সহজ হয় সে সব শব্দের ভিতর। এটা গল্পকারের শক্তিমত্তার একটা বিশেষ পরিচয়কে তুলে ধরে এটা একজন সফল গল্পকারের সফল পরিচায়ক বলে মনে হয়।

নীতিবাক্য, নীতিকথা, উপদেশ, জ্ঞানের কথা লেখকরা নানাভাবেই বলে থাকেন। বলতে হয়। বলা উচিত অনেক ক্ষেত্রে। তবে এক্ষেত্রে উপস্থাপনায় অনেকেই সাধারণ মাত্রাজ্ঞান ধরে রাখতে পারেন বলে মনে হয় না। তাই সে সব লেখক পাঠক আকর্ষণ হারায়। তিনি এসব নীতিবাক্য জ্ঞানের কথা গল্পে দেননি কিন্তু নীতিবাক্য কি তা কৌশলে তুলে ধরেছেন। যে যেভাবে পারে বুঝে নিক। তিনি এতে কোনো লুকোচুরি বা ছলনার আশ্রয় নেননি। আঞ্চলিকতা, পরিবেশ, প্রতিবেশ, সাধুতা, চলতি কথার মিশ্রণে তার গল্পে তিনি নীতিবাক্যে ঠাসা করে গড়েননি। অথচ তার গল্পগুলো নৈতিক বলয়কে কেমন যেন চিনে নিতে সাহায্য করে। যা বলেছেন বা বলছেন গল্পের ভিতর তাতে কোনো রাখঢাক নেই। কিন্তু পাঠকের ভিতর তার চিন্তার জানালা দিয়ে অনেক কিছুই ঢুকে পড়ে তার চিন্তার ঘরে। সেখানে তার গল্পের পাঠ পর্যালোচনা করলে পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে। তার গল্পগুলোকে সাধারণত কোনো প্রকার চিন্তাসূত্র ছাড়া ফেলে দেওয়া যায় না। ফলে কেউ সেখান থেকে জ্ঞানের কথা নিতে পারে, নীতির কথা নিতে পারে জীবনের কোনো না কোনো শিক্ষার খোরাকও পেতে পারে। অথচ সেখানে তিনি শুধুই গল্প বলে গেছেন। যার যা শেখার সে তা শিখে নেবে।

এই উপস্থাপন কৌশল তার সাহিত্যকে বারবার পাঠে উদ্বুদ্ধ করে। অনেকেই যেমন নীতিজ্ঞানের বুলিতে গল্প বলে পাঠকের কাছে ভ-ামির আশ্রয় নেন, একপ্রকার ভাবকৌশলের আশ্রয় নিয়ে নিজেই ভ-ামির বলয় সৃষ্টি করেন- এখানে তার কোনোটারই দেখা যায় না। কখনো কখনো মনে হবে স্রেফ সাদামাটা শব্দ দিয়ে গল্প হয় কী করে! দীলতাজ রহমান তার প্রমাণ।

তারান্নুম মূলত অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসকালীন কাহিনি। ব্যক্তি তারান্নুম আফরীনকে ঘিরে গল্প হয়ে ওঠা এক স্মৃতিচারণা- অসম্ভব ভালোলাগা তারান্নুমকে নিয়ে চারপাশের ঘটনা যেভাবে গাঁথা হয়েছে তা গল্পে যেন অনিবার্য ছিল। গল্পের আঙ্গিক ও আবহ চমৎকার। পড়তে গেলে প্রথমটুকু পড়ে পরের টুকু না পড়ে যে আর ওঠা যায় না। যেনবা ঊর্ধ্বে ওঠার চমৎকার একটি সিঁড়ি। সবগুলো ধাপই পরিকল্পিত- একটা না থাকলে যেন গল্পের হৃদয় ভাঙা হতো। অথবা কানা হতো চোখের দৃষ্টি। বাঁধা পড়ত তাতে দৃষ্টিভঙ্গি। এই সিঁড়ি বেয়েই সাহিত্যের মনোত্তীর্ণ গল্পগুলোর ভিতর প্রবেশ করা সম্ভব হয়। এই গল্পগুলোই বাংলা সাহিত্যের ভা-ারকে সমৃদ্ধ করে বাংলা সাহিত্য হয়ে ওঠে সমৃদ্ধতর।

চোর চমৎকার একটি গল্প। হাজার পাঁচেক চুরি করা বইয়ের চোর কল্পানাতীত ব্যাপার। বিদেশে পড়ালেখা করা বিত্তবান এক চোরের সঙ্গে কথোপকথনগুলো অনবদ্য যা পাঠককে গল্পের ভিতর থেকে আরও ভিতরে নিয়ে যায়। চোর বলছে, ‘আমার কাছে অনেক বই আছে। একটাও কেনা নয়, সব চুরি করা এবং তা সংখ্যায় হাজার পাঁচেকের কম হবে না! তবে বিশ্বাস কর, আমি গরিব দোকান থেকে বই চুরি করি না!’ সত্যি চোরের বইপ্রীতি বিস্ময়কর। চোরের বক্তব্য যদি হয় এই রকম তাহলে সে চোর সম্পর্কে জানার আগ্রহ কোন পাঠকেরই বা না থাকে। চোরের সঙ্গে লেখকের সংলাপগুলো গতিময় দারুণ। প্রথম থেকেই ক্ষোভের সঙ্গে আপনি থেকে তুইয়ে নেমে আসার যে মেজাজ তা ঠিক রাখা হয়েছে। ঝগড়াঝাটির ব্যাপার। রাগ-ক্ষোভের ব্যাপার। চলছে দুই দিকে তীর্যক বাক্যবাণ। দারুণ নাটকীয় ঢঙে তুলে ধরা হয়েছে চোর গল্পটি।

জীবন্ত গল্পের উদাহরণ ‘প্রতিদান’ যেন নিজের সময়ে উপস্থিত উচ্চারণ। সংলাপে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, শব্দচয়ন করা হয়েছে তা গল্পকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে সংলাপকে। এখানেও কথার চালাচালি আছে। গ্রাম্য, গেঁয়ো শব্দগুলোই যেন গল্পের ভিতর প্রাণের ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠে। প্রতিদান একটি সুন্দর গল্প, ভালোবাসার গল্প, মনস্তাত্তিক যুদ্ধে যেখানে ভালোবাসাই জয়ী হয়। এখানে পুত্রের প্রতি প্রগাঢ়ও টান লক্ষ্য করা যায়। মাতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব আর পরনারীর পুত্রবধূ হয়ে সংসারে আগমনের পর সাংসারিক জীবন মিলে ‘প্রতিদান’ একটি টিকে থাকার গল্প।

শালি গল্পটির শুরুতেই বোঝানো হয়েছে গ্রাম আমার কেমন হবে। বলা হয়েছে, ‘গ্রাম আমাকে প্রচ- টানে। আমার স্বপ্নের বাড়িটি তা যে কোনো সবুজ গ্রামেই হতে পারে। তাতে দুই পাশে বারান্দার মাঝারি একখানা চৌচালা টিনের ঘরমাত্র। মাঝে মাঝে চালে বৃষ্টি পড়ে বুঁদ করে আনবে যত চৌকস মনুষ্যচেতনা।’ (পৃষ্ঠা ৯০)। শালি গল্পে প্রচণ্ড নাড়ির টান গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখানেও বিপরীতমুখী এক বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়, ‘এ জায়গায়টাই যেন শুধু আমার নয়, আমার ছেলেমেয়েরাও জিরো পয়েন্ট’ (পৃষ্ঠা ৯১)। গল্পের পরিণতিতে শুরুর বৈশিষ্ট্য আর থাকেনি। বাঁক খেয়েছে।

অল্পকথায় সুন্দর করেই অনেক কথা বলা হয়েছে শালি গল্পে। অথচ লেখক গল্পটির ভিতর বারবার বৈচিত্র্য এনেছেন। শালির প্রেমকে তুলে ধরে পাঠককে ঘুরিয়েছেন গল্পের ভিতর। তার গল্পগুলো সময় আর প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে মিশে আছে যেন। একটা দুর্নিবার আকর্ষণ বোধের জন্ম নেয় গল্প থেকে। সেই দুর্নিবার আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ কই? ‘কিন্তু কী এক অদৃশ্য সুতোর টান আমাকে ওখানে, ওই বাড়ি-ঘর ছুঁইয়ে জড়িয়ে রাখে।’ (পৃষ্ঠা ৯১)। এই টান যেমন গল্পকারের, এই টানের প্রবলতাও আছে গল্পকারের গল্পগুলোতে। যা পাঠককে শুধুই নিয়ে যায় শব্দের ভিতর দিয়ে গল্পের শেষ দেখা পর্যন্ত।

সত্যি এভাবে আকর্ষণ করে গল্পের ভিতর টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কয়জনের আছে। এই টান অনুভব করা যায় ব্যক্ত করা যায় না। গল্প পড়ে বুঝতে হয় একটা ভালো গল্প পড়লাম। কোনো বিরক্তি লাগেনি পাঠক অন্তরে। এই কৌশলেই তিনি একজন সার্থক গল্পকার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন। এতে কোনো ভান-ভনিতার আশ্রয় নেননি। প্রশ্রয় দেননি কৃত্রিমতাকে।

গল্প কীভাবে বলতে হয় তা দীলতাজ রহমান খুব ভালো করে জানেন। তার লেখার কুশলী কলম অল্পে অনেক কিছু বলে দেয়। বুঝে নিতে হয় পাঠককে গল্পের গূঢ় রহস্য। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার কৌশলকে। টিকে থাকার কৌশলকে। শালি গল্পে বলা হয়েছে, ‘তালা হলো ভদ্রতা রক্ষার একটি কবজমাত্র! তালা টাঙানো মানে, এখানে ঢোকা নিষেধ। এটা খোলা নিষেধ। কিন্তু তস্কর বা দুর্বিনীতের জন্য কোনো তালাই কোনো বড় বাধা নয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৫)।

মমতাজ গল্পের সিদ্দিক চরিত্র, সায়রার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গল্পে তুলে ধরা হয়েছে বাস্তবতাকে। বোঝানো হয়েছে সমাজের নিচু শ্রেণিরটা সব সময় জানাজানি হয়, তাদেরটা নিয়েই মানুষের যত সমস্যা অথচ ধনীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাদেরটা বলতে মানা জানতে মানা। তাই তাদেরটা অর্থাৎ ধনীদেরটা জানাজানি হয় না। হলেও মানুষ উপরতলার লোক বলে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। এই গল্পেও রয়েছে জীবন জটিলতা। এখানেও রয়েছে জীবনের জটিল পথের কাহিনি। এর ভিতর রয়েছে সংগ্রামে জয়ী হওয়ার প্রত্যয়। গল্পের ভিতর ফুটে ওঠে, ‘নাকানিচুবানির ভিতরে যে রসদ থাকে সেইটুকু জমা রাখি ফসল বা অর্থের অধিক করে। নাগরিক অধিকার রক্ষায় বুক চিতিয়ে চ্যালেঞ্জে নামি। সবকিছুতে এক-আধটু ঝুঁকি আমার মন্দ লাগে না।’ (পৃষ্ঠা ১০৭)।

দীলতাজ রহমানের গল্পের সৌন্দর্যবোধের যে শিক্ষা তা পাওয়া যায় তার জীবন অভিজ্ঞতার সঞ্চয় থেকে। তার গল্প কেন এত সমৃদ্ধ সে তো বোঝাই যায়, নাকানিচুবানির ভিতর যে তিনি একটু-আধটু সঞ্চয় করে রেখেছেন জীবন রসদ যা রক্ষায় চ্যালেঞ্জে নামেন আর ঝুঁকি নেন। এই নেওয়ার ক্ষমতা, এক আধটু ঝুঁকি তার জীবন অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে; যা গল্পের ভিতর দিয়ে প্রতিবিম্বিত হয়।

এসব গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে তিনি নিজস্ব ভাষাভঙ্গিও আশ্রয় নিয়েছেন। সোজাসাপ্টা করে কথা বলেছেন। ছলচাতুরির আশ্রয় নেননি। প্রশ্রয় দেননি। এভাবেই ভাব, ভাষা, শব্দ প্রয়োগে তার গল্পগুলো প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। কারণ তাতে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ছলচাতুরি নেই। যেখানে যে রকম শব্দ প্রয়োগ হলে গল্পের তেজ বাড়ে কিংবা বলা যায় শব্দের যুতসই প্রয়োগ হয় সেখানে এরকমই সাধারণ, কথ্য ব্যবহারিক শব্দ দিয়ে বোঝানো হয়েছে গল্পের প্রকৃতি আর পরিবেশ কিংবা ঘটনাকে।

এভাবে তার গল্পের ভিতর দিয়ে গল্প বলা হয় অনেক। অল্পের ভিতর দিয়ে তিনি পাঠককে অনেক দূর দেখাতে পারেন। নিয়ে যেতে পারেন অনেক ভিতরে। মনের অনেক গহিনে। তবে সে সব জায়গায় যাওয়ার জন্য চাও একটা সুন্দর পাঠক হৃদয়।

তিনি পাঠককে অল্প অল্প করে গল্পের ভিতর গল্প বলেন। সেগুলো পাঠককে উপলব্ধি করে নিতে হয়। ব্যাখ্যা করে বুঝে নিতে হয় লেখকের অভিব্যক্তি। আর সমাজ অভিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠককে বুঝে নিতে হয় গল্পের বার্তা। জীবনের বার্তা। জীবনের অনেক কিছু। তার গল্পে উপমা, উদাহরণের, আশা-নিরাশা, প্রত্যয়, অভিলাষ, প্রেম-ভালোবাসা, রাগ-অনুরাগের সে সব কথায় অনেক কথা বলা আছে। সে সব বলা হয়েছে গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের বিভিন্ন জায়গায়। এসবের মধ্যে আছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো শক্তি, তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার সাহস। এসবের ভিতর দিয়ে চিত্রিত হয়েছে নানা চরিত্র, নানান পরিবেশ, নানান প্রকৃতির সহাবস্থান। তার কয়েক এখানে তুলে ধরলেই বোধ হয় বুঝতে সহজ হয়। যেমন গল্পগুলোতে এভাবে বলা হয়েছে-

‘থোড়াই কেয়ার করি তোমাদের এখানে কবিতা পড়ার। কতজন নোবেল প্রাইজই প্রত্যাখ্যান করেন...।’ (পৃষ্ঠা ১৯); ‘একটি সচেতনভাব তো প্রত্যেকটি মানুষের ভেতর প্রহরীর মতো কাজ করে।’ (পৃষ্ঠা ৩২); ‘সত্যিকার প্রেমের স্পর্শ যারা পায়, তারা এত প্রেম প্রেম করে না। প্রেম শব্দটিই উহ্য থাকার বিষয়!’ (পৃষ্ঠা ৩৪); ‘মাতৃত্বের শক্তির চেয়ে পৃথিবীতে বড় শক্তি আর কী আছে? আর মা হয়ে উঠতে না পারলে সে শক্তি নিজেও টের পায় না কোনো নারী।’ (পৃষ্ঠা ৪০); ‘সেই থেকে আমার মনটা শালিক হয়ে উড়–উড়– করত।’ (পৃষ্ঠা ৪৬); ‘উনি, মানে তারান্নুম মানে তো ওই ভ্রমরের গুঞ্জরণই। নাকি? আসলে ওই ভ্রমরের গুঞ্জরণ এখন আমাদের প্রাণের গুঞ্জরণই হয়ে গেছে, কান পাতলে শুনতে পাই।’ (পৃষ্ঠা ৫২); ‘মানুষ পছন্দ না হলে তাকে নিয়ে কোনো দুঃখ পেতে আমার ভালো লাগে না।’ (পৃষ্ঠা ৫৪); ‘আমার ঢেলেপড়া স্বভাব, তাই ঢেলেই পড়তাম। আর ও কমকম।’ (পৃষ্ঠা ৫৬); ‘ঠাস করে পিছুটানহীন শব্দে ফোনটা রেখে দিল।’ (পৃষ্ঠা ৭৫); ‘বিষয়টা তসিরনকে ভেজা গামছার মতো চিপড়াচ্ছে।’ (পৃষ্ঠা ৭৮); ‘আমি পরের মুখের রস লাগাইন্যা কথা শুনতে চাই না।’ (পৃষ্ঠা ৮৫); ‘কপালে সেজদার সুরমা রঙের গাঢ় দাগ।’ (পৃষ্ঠা ৯৭); ‘গরিব প্রতিবেশীদের ইট-কাঠের প্রতি লোভে নিশপিশে বাড়ানো লম্বা হাতও পাহারায় রুখতে হয় (পৃষ্ঠা ৯৮); ‘রতন মিষ্টিমুখে সকালের রোদের মতো গলগল করে ওঠে।’ (পৃষ্ঠা ৯৯)।

এরকম অসংখ্য চমৎকার কথামালার উদাহরণ দেওয়া যায়। তাতে বোঝা যায় গল্পগুলো কেন সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে। দীলতাজ রহমানের গল্পে অনেক সাদামাটা শব্দের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু পড়তে গেলে সেগুলোকে প্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়। এরকম অনেক শব্দই উদারহণ হিসেবে দেওয়া যায়। শব্দগুলো সাধারণ মনে হলেও প্রয়োগের দৃঢ়তায় অর্থবহ হয়ে ওঠে। কয়েকটি প্রায়োগিক শব্দ উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায়: চরেবরে বেড়ালেন, ছলছল, বকেঝকে, প্রাণের আইডাই অবস্থা, ঢেলেপড়া গলায়, একডেগ জগাখিচুড়ি, স্মার্টঝাড়ু দিয়ে ঝেটিয়ে, আৎকা ঠাডা, বাজপড়া বিপদ, কণ্ঠে কোনো আঁঠাকষা নেই, বাড়ির আধাখ্যাঁচড়া শরিক ইত্যাদি।

ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তার পারদর্শিতা লক্ষ্য করা যায়। নিজের বাড়ি গোপালগঞ্জ বলে এই অঞ্চলের ভাষা তার জানা থাকাই স্বাভাবিক। যেমন তিনি বলেন, ‘কাজ শ্যাষ না অলি আপনি তো আবারা টাকা আটকাবেন।’ (পৃষ্ঠা ৯৮)। অথচ তিনি ফেনীর আঞ্চলিক ভাষায় গল্পে সুন্দর করে সংলাপ সাজিয়েছেন। যেমন ‘আন্নে হাইরতেন ন্য! আঁরে দ্যন...।’ (পৃষ্ঠা ৯৪)। জানি না কেমনে এত নিখুঁতভাবে আত্মস্থ হলো ভাষা। যে গল্পে যে রকম বা যে সময়ে বা পরিবেশে যে ভাষার প্রয়োগ প্রয়োজন তিনি তাও করেছেন সফলভাবে। সে ভাষাগুলো গল্পের শরীর আর অস্তিত্বে মিশে গেছে। বাস্তবে নিজের অঞ্চলের ভাষা আত্মস্থ হওয়াই স্বাভাবিক। অন্যেরটা অনেক কষ্টের। অন্যের ভাষা আত্মস্থ করা মোটেই সহজ নয়।

ভাষার ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত। এটা একটা গল্পের সুন্দর বৈশিষ্ট্যের দিক। তারান্নুমে ব্যাপার বেশ আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেখানে যে ভাষা প্রযোজ্য তা বলা লাগছে না, এমনিই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসছে। বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ আছে। যেখানে যেমন সেখানে সে রকম প্রয়োগ। ‘মুই কতা কইতে ইট্টুহানি দূরে গেছি, তাই ওনার কাজ কুইম্মা গ্যাছে! আর মুই যে হেই ফজরের ওক্তো উইড্ডা ইদিক-উদিক ফিরাই না, হেইডা মোডেও চোউহে দ্যাহে না!’ (পৃষ্ঠা ৯৯)। সংলাপগুলো যেন জীবন্ত বর্ণনা ইঙ্গিতে গল্পকারের কলমের শক্তির কথা প্রকাশ করছে।

কথাশিল্পী দীলতাজ রহমানের গল্পগুলো ভালোলাগার মতোই। পড়লে তার গল্পে একধরনের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। সেখানে পাঠ ছেড়ে ওঠা দায়। আসলে তার গল্পে এক ধরনের অব্যক্ত ভালোলাগা আছে যা সঠিকভাবে বোঝা বা বোঝানো কঠিন। পাঠের মাধ্যেই কেবল উপলব্ধি করা যায়। এই উপলব্ধি তখনই কারওর কাছে সঠিকভাবে প্রতিধ্বনিত হয় যখন কেউ তার গল্পগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে।

দীলতাজ রহমানের গল্পের একটা প্রধান আকর্ষণ দুর্বার টান। যে গল্পকার গল্পের ভিতর পাঠককে নিয়ে যেতে পারে সেই গল্পকারই তো পাঠকের হৃদয় জয় করে। আর গল্পগুলো মুগ্ধকর হয় বলেই তো পাঠক আকৃষ্ট হয়। তার গল্প শুরু করলে শেষ না করে উপায় নাই। গল্পগুলো গল্পের অস্তিত্ব ধরে টান দেয়। নিজস্বতা বলে যে কথাটি আছে তা দীলতাজ রহমানের ভিতর আছে। তার গল্প পড়লেই বোঝা যায় এটা কার গল্প। সে বলয় তার সৃষ্টি হয়েছে। গল্পে নিজস্বতা আছে, ভাষার নিজস্বতাও আছে। এই ভাষা নিয়েই তিনি সার্থক গল্পকার। এই ভাষাই তার গল্পের নিজস্ব আঙ্গিক সৃষ্টিতে তাকে সবক্ষেত্রেই সাহায্য করেছে। তার ভাষা নিয়ে তার গর্ব আছে। গৌরব আছে। সেটা তিনি নিজেই বলেছেন, কেন সেই গর্ব? তিনি জানিয়েছেন, ‘আমার মা বলেছিলেন, তোমাকে রবীন্দ্রনাথের মতো ভালো শিখতে হবে না। তোমাকে শুধু তোমার মতো লিখতে হবে। লেখার ওপরে তোমার নামটি লেখা না থাকলেও যদি পাঠক বুঝতে পারেন লেখাটি তোমার, তাহলেই তুমি লেখক হিসেবে সার্থক।’ (পৃষ্ঠা ৫২)।
তাই তার গর্ব হয়। তার গর্ব গল্পের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়। তার স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে, ‘আমার খুব গৌরব হয়, আমার এই ভাষাটি ভালোমন্দ যা-ই হোক, এ আমার মায়ের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া।’ (পৃষ্ঠা ৫৫)।

নতুন স্বাদের একটি গল্পগ্রন্থ তারান্নুম। বইটি বাংলাসাহিত্যে ভিন্নমাত্রার সংযোজন। বাংলা সাহিত্যের এই রত্নাভারটি একদিন অবশ্যই দিনের সূর্যের মতো (প্রতিদিন) আলো ছড়াবে। আমি এমনিতেই দীলতাজ রহমানের গল্পের ভক্ত। অসম্ভব ভালো লাগল তার তারান্মুম বইটি। টিকে থাকুক বইটি পৃথিবীর শেষ অবধি। তারান্নুম’র প্রকাশক প্রকাশ পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রচ্ছদ করেছেন শতাব্দী জাহিদ। মুদ্রিত দাম ২০০ টাকা, বলতে গেলে হাতের নাগালের মধ্যেই!

ওমর বিশ্বাস : সাহিত্যিক ও ব্যাংক কর্মকর্তা

এএইচএ
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও