খেলার বাঘের জন্য এত প্রেম!
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০ | ১৮ চৈত্র ১৪২৬

খেলার বাঘের জন্য এত প্রেম!

হাসান আল মাহমুদ ৫:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০১৬

খেলার বাঘের জন্য এত প্রেম!

বাংলাদেশ এখন এক কথায় ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ জাতি। খেলা চলাকালীন রিকশাওয়ালা থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত দেশের সব শ্রেণির নাগরিক ক্রিকেটে মেতে ওঠেন। আমাদের খেলোয়াড়দের আমরা ভূষিত করেছি টাইগার হিসেবে। এই টাইগারদের জন্য আমাদের কত আবেগ, কত কীর্তিকাণ্ড!

তারা হারলে পুরো জাতি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, জিতলে আনন্দ উচ্ছ্বাসের বন্যা বয়ে যায়। হাটে-ঘাটে, ময়দানে, চায়ের দোকানে, অফিস-আদালতে সবখানে চলে টাইগারদের নিয়ে আলোচনা। গণমাধ্যমও সরব হয়ে ওঠে টাইগারদের নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রোফাইল ফটো পরিবর্তন, নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস, তর্ক-বিতর্কে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

টাইগারদের জার্সি গায়ে চাপিয়ে টিভির সামনে পুরোটা সময় বসে থাকি। টিকিট পাওয়াকে কেন্দ্র করে কখনও কখনও পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়ও নেমে পড়ি। তিন’শ টাকার টিকিট কালোবাজার থেকে তিন হাজারে কিনে নিই। তাদের জন্য আমরা দোয়া-মানত, মিছিল, মানববন্ধন এমনকি দরকার পড়লে মারামারিও করি। কারণ তারা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ আবেগের বাইরে নই।

অথচ আমাদের খেলোয়াড়রা যে বাঘের পরিচয়ে পরিচিত, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে অদূর ভবিষ্যতে সে বাঘদের আবাস সুন্দরবন হারিয়ে যাবে; এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কি অদ্ভূত দেশপ্রেম, কি অদ্ভূত বাঘ প্রীতি আমাদের!

আমরা ধরেই নিয়েছি এ দায়িত্ব আনু মুহাম্মদসহ কতিপয় বামপন্থিদের। এ ব্যাপারে তারা যা বলার বলবেন, যা করার করবেন।

ইতোমধ্যেই আমরা জানি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন ১৩ হাজার মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন পড়বে। এ জন্য প্রতিটি বড় জাহাজে ৮০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা আনা হবে। এই কয়লা সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট থেকে নামিয়ে ছোট ১০-১২টা জাহাজে (লাইটার ভেসেল) তা মংলায় আনা হবে। তাতে বছরে শুধু কয়লা পরিবহনের জন্যই প্রায় পাঁচ’শ জাহাজ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে চলাচল করবে।

এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় গড়ে উঠবে শিল্পাঞ্চল। ফলে পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনের জন্য জাহাজ চলাচল বেড়ে যাবে কয়েক’শ গুণ। ২৪ ঘণ্টা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে নদীতে কয়লা, তেল-মবিল ও বর্জ্য পড়বে, হর্নের শব্দ, রাতে সার্চ লাইটের আলো প্রাণীকুলের অভয়ারণ্য নষ্ট করবে। ইতোমধ্যেই ক্লিংকার, তেল, সার ও সর্বশেষ কয়লাবাহী জাহাজ ডুবেছে সুন্দরবন এলাকায়। সুতরাং এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে কয়লাবাহী জাহাজসহ অন্যান্য জাহাজডুবির ঘটনা বাড়বে। তাতে সুন্দরবনের ভেতরের নদীর পানি দূষিত হবে এবং জোয়ারের সাথে তা সারা সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়বে।

কয়লা পোড়ানোর ফলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ছাই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে। যা থেকে নিঃসরিত হবে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক। চিমনি থেকে ছড়িয়ে পড়বে ফ্লাই অ্যাশ ও সালফার।

এতে গাছ-গাছালি, লতা-গুল্ম, কীট-পতঙ্গ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানি দূষণের মাধ্যমে জলজ প্রাণীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। এছাড়া শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে এর অন্যান্য নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাবও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পড়বে সুন্দরবনের উপর।

ক্রিকেটাররা, যাদেরকে আমরা টাইগার বলি তারা নিঃসন্দেহে আমাদের গৌরব, কিন্তু বাঘ কিংবা সুন্দরবন শুধু আমাদের গৌরব নয় বরং অস্তিত্ব। হাজার বছরের প্রাকৃতিক বিবর্তনে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে। এমন একটা সুন্দরবন বানানো মানুষের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। সুন্দরবন না থাকলে দেশের পুরো দক্ষিণাঞ্চল অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলের ৪ কোটি মানুষের আশ্রয়স্থল এ সুন্দরবন। সুন্দরবনই তো আমাদের দক্ষিণাঞ্চলকে সাগর থেকে উঠে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের দৈত্য থেকে যতটুকু পারে বাঁচিয়ে রাখে। এছাড়া সমগ্র দেশের জলবায়ুর উপর প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সুন্দরবন।

এ তথ্যগুলো অব্যাহতভাবে পত্র-পত্রিকায় মিডিয়া টেলিভিশনে আসছে; অথচ নাগরিকদের এ ব্যাপারে সে তুলনায় কোনো চৈতন্য আছে বলে মনে হচ্ছে না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যিনি স্থপতি তার কন্যার (শেখ হাসিনা) শাসনামলে দেশের ভয়াবহ স্বার্থবিরোধী এমন একটি কর্মকাণ্ড সংগঠিত হবে তাও ভাবতে কষ্ট হচ্ছে আমাদের। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সম্ভবত ভালোভাবে জানারও চেষ্ট করেননি।

কারণ, রামপালের বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘কয়লা পানি বিশুদ্ধ করে।’ ছোটকালে তিনি দেখেছেন পানির ফিল্টারে কয়লা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী জানেনই না যে, পানির ফিল্টারে যে কয়লা ব্যবহার করা হয় তা হল কাঠ পুড়িয়ে বানানো কয়লা বা অঙ্গার যা এক প্রকার বিশুদ্ধ কার্বন। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে যে কয়লা ব্যবহার করা হবে তা আড়াই’শ থেকে তিন’শ মিলিয়ন বছর উদ্ভিদরাজী অক্সিজেন শূন্য পরিবেশে মাটি চাপা পড়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে। এ কয়লাতে থাকে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন অক্সাইড প্রভৃতি নানা জৈব-অজৈব পদার্থ। যা পানিকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তুলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়টি বিশদ জানানোর জন্য সরকারি টাকায় বিশেষজ্ঞ লোক নিয়োগ করা আছে। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি সঠিকভাবে জানাননি বলেই মনে হচ্ছে। অবশ্য এদের মধ্যে দুয়েকজন এমন আছেন যারা কিনা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও প্রতিবেশি একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দিতে সদা প্রস্তুত। ইতোপূর্বে জনসম্মুখে তাদের কিছু বক্তব্য থেকে আমরা এমনটাই বুঝতে পারি।

প্রায়শই টাইগারদের খেলা দেখার জন্য এবং অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্টেডিয়ামে ছুটে যেতে দেখি আমরা। খেলোয়াড় টাইগাররা সুন্দরবনের যে টাইগারদের পরিচয়ে পরিচিত তাদের রক্ষায়ও প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা মনে করি, ধ্বংসকারিতা বিবেচনায় শেষতক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাদ দেবেন কিংবা স্থানান্তর করবেন।

এ প্রকল্পটি বাদ দিতে ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিকরা যদি সরকারকে বাধ্য করতে না পারেন তাহলে প্রমাণিত হবে খেলার মাঠের বাঘের প্রতি যে আবেগ-ভালোবাসা সেটা এক ধরনের উদ্বায়ী এবং হুজুগে দেশপ্রেম বৈ কিছুই নয়।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও