ধুরন্ধর সাহেদের যত কুকীর্তি
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

ধুরন্ধর সাহেদের যত কুকীর্তি

প্রীতম সাহা সুদীপ, ঢাকা ২:৩৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২০

ধুরন্ধর সাহেদের যত কুকীর্তি
কোভিড-১৯ পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা করে দেশজুড়ে সমালোচিত হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক। গ্রেফতার হওয়া থেকে বাঁচতে নানা ধরণের পন্থা অবলম্বন করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। বুধবার সকালে সাতক্ষীরায় র‍্যাবের জালে ধরা পড়েন এই অপরাধী।

সাহেদকে গ্রেফতারের পর হেলিকপ্টারে বুধবার সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর তাকে প্রথমে র‍্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে নিয়ে উত্তরার একটি বাসায় অভিযানে যায় র‍্যাব।

জানা গেছে, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর ওই বাড়িটির নাম সিএইচএল বায়তুল এহসান। ওই বহুতল ভবনের পাঁচ তলায় সাহেদ করিমের একটি গোপন অফিস আছে।

বাড়ির দারোয়ান গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় রাতেই হুটহাট করে সাহেদ বিভিন্ন সহযোগীসহ এখানে আসতেন।

গ্রেফতার এড়াতে কী না করেছেন ধুরন্ধর সাহেদ!

এদিকে সাহেদকে গ্রেফতারের পর র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতার এড়াতে ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন ধুরন্ধর সাহেদ। নিজের চেহারা পরিবর্তনের জন্য চুলে রঙও করেছিলেন তিনি। কেটে ফেলেছিলেন গোঁফ।

কালো রঙের বোরকা পরে নৌকায় করে নদী পার হয়ে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। র‍্যাবের বিশেষ টিম পৌঁছানোর পর পালানোরও চেষ্টা করেন। র‍্যাবের টিম দেখে নৌকার মাঝি সাঁতরে পালিয়ে যান। কিন্তু মোটা হওয়ায় আর দৌঁড়ে কিংবা সাঁতরে পালাতে পারেননি প্রতারক সাহেদ। আটকের পর দেখা গেছে, তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লেগে ছিল কাদা। কোমরে ছিল গুলিসহ একটি পিস্তল। নীল রঙের শার্টের ওপর কালো বোরকা পরে ছিলেন সাহেদ।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সাহেদ করিম খুবই চালাক ও ধুরন্ধর। তিনি বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্মগোপনের চেষ্টা করছিলেন। তার বাড়ি সাতক্ষীরা হলেও তিনি বাড়ি না গিয়ে বিভিন্ন গাড়ি পরিবর্তন করে আশপাশে ঘুরছিলেন। অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী দেশেও তিনি অনুপ্রবেশ করা চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, সাহেদকে গ্রেফতারের জন্য আগে থেকেই সীমান্ত এলাকাগুলোতে র‌্যাবের নজরদারি ছিল। বুধবার (১৫ জুলাই) ভোরে তার অবস্থান নিশ্চিত হলেই আমরা অভিযান চালাই।পরে বোরকা পরিহিত অবস্থায় নৌকায় করে পাশের দেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাহেদকে গ্রেফতার করা হয়। চেহারা পরিবর্তন করার জন্য সে তার চুল কালো করে ফেলেছিল।

কে এই সাহেদঃ

রিজেন্ট গ্রুপ ও ঢাকা রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিম ওরফে সাহেদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায়। সাহেদ ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার দাদার বাসায় থাকতেন তিনি। পিলখানায় রাইফেলস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর আর লেখাপড়া করেননি সাহেদ।

সাহেদের বাবার নাম সিরাজুল করিম। মা সাফিয়া করিম ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাহেদ করিমের ঠগবাজি, প্রতারণা, মিথ্যাচার এবং নানা অপকর্মে অতিষ্ঠ ছিলেন তার মা। ধীরে ধীরে চাপাবাজি আর প্রতারণা লিপ্ত হন সাহেদ। নানা প্রতারণার মাধ্যমে কয়েক বছরেই কোটি টাকার মালিক হন সাহেদ। ২০১০ সালে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে সাহেদ করিমের মা মারা যান। সম্প্রতি সাহেদের বাবা সিরাজুল করিমও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

টেলিভিশন টকশোতে নিজেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে জাহির করতেন বহুমুখী প্রতারণায় অভিযুক্ত সাহেদ। তিনি আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য হিসেবে সব জায়গায় পরিচয় দিতেন। সেই পরিচয় দিয়ে সাহেদ বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতেও অংশ নিতেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাহেদ দুই বছর জেলে ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ২০১১ সালে ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডে শুরু করেন এমএলএম কোম্পানি। অভিযোগ আছে, বিডিএস ক্লিক ওয়ান নামের ওই কোম্পানির শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এছাড়াও প্রতারণার টাকায় তিনি উত্তরা পশ্চিম থানার পাশে গড়ে তুলেছেন রিজেন্ট কলেজ ও ইউনির্ভাসিটি, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি। এর একটিরও কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই বলে অভিযোগ আছে। আর অনুমোদনহীন আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটির ১২টি শাখা করে হাজার হাজার সদস্যদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ আছে সাহেদের বিরুদ্ধে। প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিতে নিজের কার্যালয়ে একটি টর্চার সেল গড়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

সাহেদের বিরুদ্ধে শুধু ঢাকায়ই ৩২ মামলাঃ

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে রাজধানীর ধানমন্ডি, উত্তরাসহ বিভিন্ন থানায় ৩২টি মামলা রয়েছে। মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড থেকে ছয় কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার নথিতে নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল মুহাম্মদ শহীদ বলে পরিচয় লেখা রয়েছে। এ বিষয়ে আদালতে দুটি মামলা চলছে রয়েছে, যা এখনও চলমান। ব্যাংকিং সেক্টরেও তার প্রতারণার চাল ছিল। কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি টাকাও পরিশোধ করেননি এই প্রতারক। সারাদেশ প্রতারক সাহেদের নামে অন্তত অর্ধশত মামলা রয়েছে।

কোভিড-১৯ টেস্টের নামে ভয়ংকর প্রতারণাঃ

বিনামূল্যে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরীক্ষার অনুমোদন নিয়ে প্রতিবার নমুনা সংগ্রহের জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা করে নিত সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল। এখান থেকে ১০ হাজারের বেশি করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদফতরে সঙ্গে চুক্তি করেছিল যে করোনা আক্রান্ত রোগীদের ফ্রি-তে চিকিৎসা দেবে। এভাবেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতাল। এছাড়াও উত্তরায় রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য অনুমোদনহীন কোভিড-১৯ টেস্টিং কিট পায় র‌্যাব। এভাবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে মোট তিন কোটি টাকা হাতিয়েছে রিজেন্ট গ্রুপের মালিক সাহেদ। এছাড়াও ২০১৪ সালের পর থেকে রিজেন্ট হাসপাতলের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।

গত ৬ জুলাই (সোমবার) নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট ও সার্টিফিকেট দেওয়া ও রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে রিজেন্ট গ্রুপের দুটি হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম।

অভিযানে গিয়ে প্রতারণার সত্যতা মেলে, সেসঙ্গে পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। পরদিন ৭ জুলাই (মঙ্গলবার) রিজেন্ট গ্রুপের মূল কার্যালয় এবং রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরের দুটি হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়। হাসপাতালটি প্রতারণা করে ১০ হাজারেরও বেশি করোনা পরীক্ষার সার্টিফিকেট দিয়েছে। অভিযানের সময় রিজেন্ট হাসপাতালের পরিচালক ও ব্যবস্থাপকসহ আট জন কর্মীকে আটক করে র‌্যাব। আটক কর্মীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ৯ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম শিবলীকে গ্রেফতার করা হয়।

গতকাল ১৪ জুলাই রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদের প্রতারণা কাজের অন্যতম সহযোগী রিজেন্ট গ্রুপের এমডি এবং মামলার ২ নং আসামি মাসুদ পারভেজকে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

এরপর সর্বশেষ বুধবার (১৫ জুলাই) ভোরে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর গ্রামের লবঙ্গবতী নদীর তীর সীমান্ত এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

পিএসএস
আরও পড়ুন...
সাহেদের উত্তরা অফিস থেকে প্রায় দেড় লাখ জাল টাকা উদ্ধার!
উত্তরায় সাহেদের গোপন অফিসে র‍্যাবের অভিযান
র‍্যাব সদর দপ্তরে সাহেদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে
গ্রেফতার সাহেদকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়েছে
অবৈধ অস্ত্রসহ রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ গ্রেফতার

 

: আরও পড়ুন

আরও