সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই করোনা টেস্টিং সেন্টারগুলোতে
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই করোনা টেস্টিং সেন্টারগুলোতে

প্রীতম সাহা সুদীপ ৫:২৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২০

সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই করোনা টেস্টিং সেন্টারগুলোতে
দীর্ঘ লাইন, মানুষগুলো একে অপরের গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনও বোধ করছেন না কেউ। অথচ তারা সবাই এসেছেন করোনা ভাইরাসের টেস্ট করাতে। এমন চিত্র প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিভার ক্লিনিক ও করোনা টেস্টিং সেন্টার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার বিভিন্ন কেন্দ্রে।

সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ-আনসার, ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা টেস্ট করাতে আসা রোগীদের বোঝাতে বোঝাতে বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। বার বার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার আহ্বান জানানো হলেও তা মানা হচ্ছে না। এতে পরীক্ষা করাতে আসা মানুষগুলোর মধ্যে, যাদের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নেই তাদেরও নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘ লাইন ঠেলে এসব মানুষ যখন পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করছেন, সেখানে নমুনা দেয়ার জন্য আবারো দাঁড়াতে হচ্ছে লাইনে। গাদাগাদি করে দাঁড় করিয়ে নেওয়া হচ্ছে নমুনা। ঢাকা মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি কক্ষে দীর্ঘক্ষণ ধরে গায়ে গা ঘেঁষে বসিয়ে রাখা হচ্ছে নমুনা দিতে আসা ব্যক্তিদের। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে সম্ভাব্য পজিটিভ-নেগেটিভ সবাইকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্বাস্থ্যকর্মী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এখানে করোনা টেস্ট করাতে আসা রোগীদের প্রতি মুহূর্তে সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড়ান। বলতে বলতে আমরা বিরক্ত হয়ে গেছি। নিজেদের মধ্যে সতর্কতা না থাকলে আমরা জোর করতে কতক্ষণ তাদের নিয়ম মেনে দাঁড়াতে বাধ্য করবো?

এদিকে করোনা টেস্ট করাতে আসা এক রোগী বলেন, আমি সচেতন, তাই নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু সামনের পেছনের লোকজন এক রকম গায়ের উপরে এসে পড়ছে। সময় যাচ্ছে, মানুষের ভীড় বাড়ছে, লাইনও দীর্ঘ হচ্ছে। ক'জনকে বলবো ভাই আমার দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াই। আসলে আমরা কেউই সতর্ক নই।

এসব প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া জানান, হাসপাতালটির করোনা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশ পরীক্ষা করা হয়। তাদের পিসিআর মেশিন আছে দুটি। একটি সরকার দিয়েছে, আরেকটি বিএসএমএমইউর। তিনি বলেন, এখানে পরীক্ষার চাপ অনেক বেশি। যাদের লক্ষণ নেই তারাও আসছে পরীক্ষা করাতে।

টেস্ট করাতে পারছেন না মুমূর্ষুরাঃ

করোনা টেস্ট করানোটা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠছে তাদের জন্য, যারা গুরুতর অসুস্থ এবং করোনার উপসর্গগুলো যাদের মধ্যে প্রকট আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। মুমূর্ষ সেসব রোগী ভীড় ঠেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে পরীক্ষা করানোর ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। যার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম।

তিনি তিন দিন ধরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছে ঘুরেও করোনা টেস্ট করাতে পারেননি। গত ২৩ এপ্রিল ওই কর্মকর্তা মারা যাওয়ার পরও তার নমুনা নিতে আসেননি আইইডিসিআরের কেউ।

সংশ্লিষ্ট কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ না দেখে তাই দাফনের আগে নিজেরাই নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। মহানগর জেনারেল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক এনে দাফনের আগমুহূর্তে আনা হয় নমুনা। পরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আইইডিসিআরের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে সরকারের কাছে অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

মিল্লাতুলের মতই আরেকজন দুর্ভাগা রাজারবাগের বাসিন্দা সুপন পোদ্দার। গত কয়েকদিন ধরে করোনার উপসর্গ থাকায় গত ২৫ এপ্রিল তিনি যোগাযোগ করেন আইইডিসিআরের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানের ই-মেইলে মেইলও পাঠান। কিন্তু কোনো উত্তর পাননি এখনো।



টেস্ট করানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে কয়েকগুণঃ

এদিকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ চতুর্থ ধাপের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের চতুর্থ ধাপটি হলো ‘মহামারী’। এই ধাপে অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হয়। বাহক ও আক্রান্তের নির্দিষ্ট হিসাব রাখা সম্ভব হয়ে উঠে না।

করোনা সংক্রমণের তৃতীয় পর্যায় ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে , যা মহামারী ধাপের পূর্ব মুহূর্ত। কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শেষ পর্যায়ে এসে দৈনিক করোনা টেস্ট করার সক্ষমতা বর্তমান অবস্থার চেয়ে অনেক গুণ বাড়ানো না হলে দেশের করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া না গেলে করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও সঠিক পথে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করবে, যা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালর ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ধাপের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। সংক্রমণের বর্তমান অবস্থাকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ক্লাস্টার বলে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। সংক্রমণের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন অনেক আগেই শুরু হয়ে ক্লাস্টার অতিক্রম করে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। ইউরোপের করোনা আক্রান্ত প্রতিটি দেশে শত শত নমুনা টেস্ট সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। ইউরোপের কথা বলতে হবে না, দক্ষিণ কোরিয়াতেই রয়েছে প্রায় ৬শ’টি নমুনা টেস্ট ল্যাবরেটরি। আগামী ১০ দিনের মধ্যে ন্যূনতম ৫০ হাজার নমুনা টেস্ট করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করতে পারলে দেশের করোনা পরিস্থিতির আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র বেরিয়ে আসবে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে সংস্পর্শে আসা সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। আইইডিসিআর এ কাজটি করতে পারেনি। পরীক্ষা তো পরের কথা, তারা কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজটাই একেবারে দায়সারা গোছের করেছেন। এমনকি লক্ষণ প্রকাশের পরও তারা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের পরীক্ষা করতে গড়িমসি করেছেন। এখন ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় নমুনা পরীক্ষায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে ব্যাপক হারে নমুনা পরীক্ষার বিকল্প নেই।

পিএসএস

 

: আরও পড়ুন

আরও