নীলফামারীতে থামানো যাচ্ছে না তামাকের আবাদ
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০ | ২৪ চৈত্র ১৪২৬

নীলফামারীতে থামানো যাচ্ছে না তামাকের আবাদ

নুর আলম, নীলফামারী ৩:০২ অপরাহ্ণ, মার্চ ০২, ২০২০

নীলফামারীতে থামানো যাচ্ছে না তামাকের আবাদ

তামাকের আবাদ থামানো যাচ্ছে না নীলফামারীতে। মূলত এর ভালো দাম এবং উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় তামাক চাষে আগ্রহী হয়ে রয়েছেন এই জেলার মানুষ।

তবে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে এখানে। বিভিন্নভাবে কৃষকদের সহযোগিতা করে তামাক চাষে আগ্রহী করে তুলছে এসব কোম্পানি। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে জেলার প্রায় সব ইউনিয়নে কম বেশি হয়েছে তামাকের আবাদ অথচ এই জমিগুলো বোরো-ভুট্টা কিংবা গম চাষের বেশ উপযোগী।

চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তামাকে উৎপাদন খরচ কম, ভালো দাম এবং বিক্রির নিশ্চয়তা থাকায় এই ফসল নিয়ে তেমনটা চিন্তায় থাকতে হয় না বরং ধান আবাদে খরচ বেশি, দাম না পাওয়া এমনকি বিক্রি নিয়েও ঝামেলায় থাকতে হয়।

জেলা সদরের কচুকাটা, টুপামারী, পঞ্চপুকুর, রামনগর, পলাশবাড়ি, লক্ষ্মীচাপ জলঢাকা উপজেলার খুটামারা, কাঠাঁলী, ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া, নাউতারা, ডোমার উপজেলার হরিণচড়া, পাঙ্গামটকপুর এবং কিশোরীগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা, নিতাউ ও পুটিমারী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে তামাকের চাষের দখলদারিত্ব।

পলাশবাড়ি ইউনিয়নের কানাইকাটা এলাকার কৃষক আর্জিনা বেগম বলেন, দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছি। এতে আমার খরচ হয়েছে ৮ হাজার টাকা। তামাক আবাদে টোবাকো কোম্পানি অগ্রীম ঋণে সার ও নগদ অর্থ দিয়ে থাকে এবং ক্রয়ের শতভাগ নিশ্চয়তাও দেয়।

আরেক কৃষক মুক্তা আক্তার বলেন, দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষে ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হয়। পরে বিক্রি করে ৩০-৩৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কখনও ৫০ হাজার টাকাও পাওয়া যায়। যা অন্য ফসল আবাদ করেও পাওয়া যায় না।

একই গ্রামের সুলতান আলী বলেন, তামাক আবাদে খরচ অনেক কম। সেক্ষেত্রে ধানে খরচ অনেক বেশি। আমার ৪ বিঘা জমিতে তামাক চাষে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শ্যালো মেশিন ভাড়া করে পানি দিচ্ছি। মেশিন ভাড়া নিচ্ছে এক হাজার টাকা।

সদরের রামনগর ইউনিয়নের রামনগর দোলাপাড়া গ্রামের শফিয়ার রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে তামাক চাষে খরচ হয় ৫ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘায় তামাকের ফলন হয় ৬ থেকে ৭ মন। কোম্পানিগুলো প্রতিমণ তামাক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় কেনে।

রামনগর ইউনিয়নের চড়চড়াবাড়ী গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় ক্রয় কেন্দ্র তৈরি করেছে। জমি থেকে সরাসরি সেখানেই চলে যায় কৃষকদের উৎপাদিত তামাক।

অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিগুলো বিনামূল্যে বীজ, বিনা সুদে ঋণ সার ও নগদ অর্থসহ তামাক ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিগণ প্রতিনিয়ত তামাক চাষীদের খোঁজ খবর রেখে সহযোগিতা করে আসছেন।

এছাড়াও বিড়ি এবং সিগারেট কোম্পানিগুলোর লোভনীয় আশ্বাসের কারণে তামাক চাষে প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়রা জানান, অর্থ সংকটে থাকেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকেরা। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করেন এবং তাদের মধ্যে কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে তামাকের সার ও বীজ সরবরাহ করে থাকেন। ফলে তামাক চাষ বেড়েই চলেছে।

নীলফামারীতে তামাক ক্রয়ের জন্য জাপান ইন্টারন্যাশনাল টোবাকো, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাবো, জামিল টোবাকো, ভারগো টোবাকো, আবুল খায়ের টোবাকো, নাসির টোবাকো, আকিজ টোবাকোসহ বেশ কয়েকটি তামাক কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া ছোট বড় কয়েকটি জর্দা কোম্পানি, গুল কোম্পানিতো রয়েছেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নীলফামারী সুত্র জানায়, চলতি মৌসুমে ৩০২৩ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে ৮৪ হেক্টর জমির চেয়ে বেশি। গতবার ৫৬৫৫ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও এবার ধরা হয়েছে ৬৩০৭ মেট্রিক টন।

এছাড়া ২০১৭-১৮ মৌসুমে ৩৫৬০ হেক্টরে উৎপাদন হয় ৬১৫৯ মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৩৭৬০ হেক্টরে ৬৩৯২ মেট্রিক টন এবং ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৩৮৬৫ হেক্টরে ৬৬৪৮ মেট্রিক টন।

কৃষি ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, তামাক চাষে কারগিল নামক সার প্রয়োগের ফলে চাষী ও তার পরিবারের লোকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন এবং ফসলি জমি উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে।

তামাক ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম তুহিন বলেন, তামাক থেকে বড় একটি আয় করে থাকেন এখানকার কৃষকেরা। এতে তাদের সংসারের খরচ ও ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচের যোগান হয়।

তিনি বলেন, অন্যান্য ফসলের ক্রয়-বিক্রয়ের নিশ্চয়তাসহ ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হলে তামাক চাষের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে এখানে।

রংপুর বিভাগ তামাক চাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুম ফকির বলেন, ইতোপূর্বে ২০১০ সালের আগে কিছু সংখ্যক কোম্পানি তামাক উৎপাদন বাড়ানোয় কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতো। কিন্তু এখন এরকম সহযোগিতা করে না কোনো টোবাকো কোম্পানি। বিশেষ করে বিড়ির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় অনেক কোম্পানি আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

সিভিল সার্জন রনজিৎ কুমার বর্মণ বলেন, তামাক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠকর্মীদের মাধ্যমে কৃষকদের এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, এতে শ্বাসকষ্টসহ চর্মরোগের সৃষ্টি হয়। তামাকের নিকোটিন শরীরের রক্তনালী চিকন করে দেয়। এছাড়া হার্ট ও কিডনির ড্যামেজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নীলফামারী অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, কৃষি বিভাগ এই ফসল যেন কোনো কৃষক আবাদ না করেন এজন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

তামাকের চেয়ে ভালো ফসল উৎপাদনে পরামর্শ দিয়ে আসছে বরাবরই। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতনতাও সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু থামানো যাচ্ছে না তামাক আবাদ। তবে কৃষকরা এক সময় এই আবাদে নিরুৎসাহিত হবেন।

জানতে চাইলে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার জন্য সরকার উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে বিভিন্ন দফতরের মাধ্যমে। আমরা দেখবো যদি এভাবে না হয় তাহলে প্রয়োজনে আইন করে তামাক চাষ বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হবে।

এনএ/এএসটি

 

সমগ্রবাংলা: আরও পড়ুন

আরও