সুন্দরবনের দুবলারচর যেন ১৪ ‘সাহেবের’ রাজ্য
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সুন্দরবনের দুবলারচর যেন ১৪ ‘সাহেবের’ রাজ্য

প্রীতম সাহা সুদীপ ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২১

সুন্দরবনের দুবলারচর যেন ১৪ ‘সাহেবের’ রাজ্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অতুলনীয় ও জীববৈচিত্র্যে অসাধারণ পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ বন যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি বাংলাদেশিদের কাছে এ যেন সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বারবার দেশকে রক্ষা করেছে এই বন। তবে যতই দিন যাচ্ছে হুমকির মুখে পড়ছে বনটি, সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলের বাসিন্দারাও। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদী-নালা খাল-বিলে ঢুকছে নোনাপানি।

এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে নানা প্রজাতির মাছ ও জীববৈচিত্র্য। ভালো নেই এখানকার জেলে-বাওয়ালীরাও। বছরের পর বছর ধরে ‘সাহেব’ নামে প্রভাবশালী একটি চক্রের কাছে জিম্মি তারা। শুধু সুন্দরবনের দুবলারচর নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভাবশালী ১৪ জন সাহেব।

মিঠাপানির সংকটে উপকূলবাসী
পশুর, শিবসা, খোলপেটুয়া, কালিন্দি, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল, ইছামতীসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর সঙ্গেই গভীর যোগাযোগ রয়েছে সুন্দরবনের। এখানকার বাসিন্দারা এসব নদীকে শুধু পৃষ্ঠা যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করতে পারেন। নোনা হওয়ায় পান করার জন্য এখানকার পানি ব্যবহার করা যায় না। ফলে উপকূলবাসীর খাবার পানির একমাত্র মাধ্যম মিঠাপানির পুকুর, সেসব পুকুরের সংখ্যাও কমে আসছে।

শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, তালা, দেবহাটা, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, মোংলা, রামপাল, চিতলমারী, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট ও শরণখোলা উপজেলায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে সর্বত্রই মিঠাপানির সংকট রয়েছে। এক জগ পানি সংগ্রহের জন্য এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে যান মহিলা ও শিশুরা। কোনো কোনো গ্রামে মিঠাপানির একটি বা দুটি পুকুর রয়েছে। তবে অধিকাংশ গ্রামেই পুকুর নেই।

শ্যামনগর উপজেলায় ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের শ্রীফলকাঠী গ্রামে একটি মিঠাপানির পুকুর রয়েছে। এই পুকুরের পানি দিয়েই শ্রীফলকাঠী, ধুমঘাট, চরারচক ও খাগড়াঘাট- এ চারটি গ্রামের মানুষের খাবার পানির চাহিদা মেটে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, উপকূলে মিঠাপানির জলাশয় দিন দিন কমে আসছে। সীমিতসংখ্যক জলাশয়ে উপকূলবাসীর খাবার পানির চাহিদা মেটানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে। এক গ্রাম থেকে মানুষ আরেক গ্রামে ছুটছে পানির জন্য। শ্যামনগরেই ৫০টির মতো পুকুর রয়েছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ এসব পুকুরের ওপর নির্ভর করে খাবার পানির চাহিদা মেটাতে।

ধুমঘাট গ্রামের বাসিন্দা শিল্পী রানী বলেন, প্রতিদিন সকালে ও বিকালে দুই বেলা হেঁটে শ্রীফলকাঠী গ্রামে আসতে হয় জল নেওয়ার জন্য। এ জল দিয়েই আমরা খাওয়া ও রান্নাবান্নার কাজ করি। চার-পাঁচ গ্রামের মানুষ এখান থেকেই খাবার জল নেয়। তাই প্রতিদিন ভিড় করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জল সংগ্রহ করতে হয়।

সাহেবদের কাছে জিম্মি জেলে-বাওয়ালীরা
সুন্দরবনের পাশেই দুবলারচর। আলোরকোল, খেঁজুরতলা, জামতলা, মাঝেরকেল্লা, অফিসকেল্লা, সেলারচর, নারকেলবাড়িয়া প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা চর। সবক’টি মিলেই হয়েছে দুবলারচর। আশির দশক থেকে দুবলারচরে চলছে শুঁটকির কারবার। এখানকার লোকজন নানা পেশায় জড়িত। কেউ সাগরে মাছ ধরেন, কেউ শুঁটকি তৈরি করেন।

দুবলারচরে কারা মাছ ধরবেন, কোন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করবেন, প্রতি কেজি মাছের দাম কত হবে- সবটাই ঠিক করে দেন প্রভাবশালী ১৪ জন। যারা ‘সাহেব’ হিসেবেই জেলেদের কাছে পরিচিত। অভিযোগ পাওয়া গেছে এই সাহেবরাই জিম্মি করে রেখেছেন দুবলারচরের ৯৮৫ জেলে মহাজনসহ প্রায় ১০ হাজার মৎস্যজীবীকে।

বন বিভাগ ও মাছ ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, বন বিভাগ থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে মাছ ধরার লাইসেন্স নিতে হয়। বছরে লাইসেন্স নবায়ন ফি ৭৫০ টাকা। চলতি বছর বন বিভাগ থেকে ১৫ ব্যবসায়ী মাছ ধরার অনুমতি পেয়েছেন। তাদের অধীনে ৯৮৫ জন জেলে মহাজন দুবলারচরে অস্থায়ী বসতি গড়ে মাছ ধরছেন।

প্রভাবশালী ওই ১৪ ব্যক্তি হলেন, কামাল উদ্দিন আহমেদ, আফিয়া বেগম, খান শাফিউল্লাহ, শেখ মইনুদ্দিন আহমেদ, আরিফ হোসেন, রেজাউল শেখ, এ বি এম মুস্তাকিন, ইদ্রিস আলী, হাকিম বিশ্বাস, জালাল উদ্দিন আহমেদ, সুলতান মাহমুদ, কামরুর নাহার, শাহানুর রহমান ও আসাদুর রহমান সরদার।

অধিকাংশ জেলের অভিযোগ, নৌকা ও জালের মালিক জেলেরা। তারা ব্যবসা করেন দাদন বা সুদে টাকা নিয়ে। পানি থেকে মাছ ধরে ডাঙায় আনার পর সব নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্থানীয় এসব প্রভাবশালীর হাতে। প্রকৃত জেলেরা বন বিভাগ থেকে মাছ ধরার লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র পান না। লাইসেন্সের নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রভাবশালীদের হাতে। তাই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না জেলেদের।

নারায়ণ বিশ্বাস নামে এক জেলে বলেন, আমরা যারা এখানে আসি, সবাই বন বিভাগকে নির্দিষ্ট রাজস্ব দিয়ে জায়গা বন্দোবস্ত করে নেই। অস্থায়ী একটি বসতির জন্য বন বিভাগকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। প্রতি বছর এ বাবদ টাকা দিতে হয়। ১৪ সাহেবের লোকেরা জেলে মহাজনদের কাছ থেকে বন বিভাগের নামে এই টাকা সংগ্রহ করেন।

বরুণ দে নামে আরেক মৎস্যজীবী জানান, চরের অনেকে দাদনের ওপর নির্ভরশীল। খুলনা, সাতক্ষীরার বড় পাইকারদের কাছ থেকে দাদন এনে মাঝারি ও ছোট মৎস্যজীবীরা দুবলারচরে পাঁচ মাস ব্যবসা করেন। দাদন চক্রের কারণে নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করতে হয় তাদের। আর ৩ শতাংশ বাড়তি কমিশনও দেওয়া লাগে।

গাছ কেটে নিচ্ছে একটি চক্র
সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছে তিন বছর। তবে এখনো বনের ভেতর থেকে একটি চক্র গাছ কেটে পাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও সমুদ্রতীরে বালুর উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মরে যাচ্ছে বড় বড় গাছ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের কটকা, জামতলা সিবিচ, অফিসপাড়া, টাইগারটিলা, ভোমরাখাল, লালকাচি, টিনেরচর, তিনকোন, আইল্যান্ড, দুবলারচর ও হিরন পয়েন্টে সমুদ্রঘেঁষা বনগুলোতে প্রায়ই গাছপালা চুরি হচ্ছে। বনরক্ষীদের সঙ্গে আঁতাত করে গাছ কেটে পাচার করছে একটি চক্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন বলেন, কটকায় আগে আরও অনেক বড় বড় গাছ ছিল, বন আরও ঘন ছিল। কিন্তু একটি চক্র সম্প্রতি গাছগুলো কেটে পাচার করছে। তাদের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বন সংরক্ষণ কর্মকর্তারা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বন বিভাগ কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্টার) আব্দুল মান্নান বলেন, ‘না এখানে কেউ গাছ কাটে না।’

২০ বছরে মারা গেছে ৫০টি বাঘ
গত সোমবার সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি রাজাখালী খালের পাশে একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ২০ বছরে সুন্দরবনে ৫০টি বাঘ মারা গেছে।

যদিও সরকারি হিসাবে চলতি বছর বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ৮টি। সুন্দরবনে এখন পর্যন্ত ১১৬টি বাঘ থাকার তথ্য রয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি। এরপর ১৯৮২ সালের জরিপে ৪২৫টি। এর দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার কথা জানানো হয়।

১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ থাকার তথ্য জানায় বন বিভাগ। পরের বছর ১৯৯৩ সালে সুন্দরবনে ৩৬২টি বাঘ রয়েছে বলে জানা যায়। ২০০৪ সালে জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। ১৯৯৬-৯৭ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩৫০টি থেকে ৪০০টি। ২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে দাঁড়ায় ১০৬টিতে। হঠাৎ করে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ৪০০টি থেকে ১০৬টিতে এসে দাঁড়ালে সারা বিশ্বে হৈ চৈ পড়ে যায়।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও