মেধার সনদ মিলছে টাকায়
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

মেধার সনদ মিলছে টাকায়

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০২১

মেধার সনদ মিলছে টাকায়
দীর্ঘ ১০ বছরের ছাত্রজীবনের অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে একজন শিক্ষার্থী অর্জন করে মাধ্যমিক সনদ। তার মেধা যাচাইয়ের পর যোগ্যতা অনুযায়ী সেই সার্টিফিকেটে ফলাফল বসানো হয়। অথচ একটি শ্রেণি কোনো ধরনের যোগ্যতা ছাড়াই টাকার বিনিময়ে জাল সনদ বানিয়ে কর্মস্থলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।

মাত্র দশ মিনিটেই এসব গ্রাহকদের নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে দিচ্ছে একটি চক্র। বিনিময়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যক্তিভেদে পাঁচ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
 
গত ৫ বছর ধরে এভাবেই যেকোনো পাবলিক পরীক্ষার জাল সনদ তৈরি করে আসছিল চক্রটি। একটি কম্পিউটার, একটি প্রিন্টার ও জাল সনদ ছাপানোর কাগজ; তাদের বিনিয়োগ এটুকুই। 

সম্প্রতি এই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের রমনা বিভাগ। পাশাপাশি নীলক্ষেত কেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ জাল সার্টিফিকেট চক্রের বিরুদ্ধেও বিশেষ অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিবি পুলিশ বলছে, নিজের ইচ্ছামতো ভালো গ্রেড পয়েন্ট বা মার্ক বসিয়ে এসব জাল সনদ তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব সনদ ব্যবহার করা হচ্ছে প্রাইভেট সেক্টরে চাকরির জন্য। আর এতে যোগ্যতা থাকার পরও আসল সার্টিফিকেটধারী মেধাবী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগের আগে অবশ্যই সনদ যাচাই করে নেয়া উচিত।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রটি তিনধাপে জাল সনদ সরবরাহের কাজ করে আসছিল। প্রথম ধাপে তারা জাল সনদ প্রত্যাশীদের খুঁজে বের করে। মাঝখানে থাকে একটি দালাল শ্রেণি, যাদের কাজ জাল সনদ বানিয়ে দেয়ার চুক্তি করা। শেষ ধাপে থাকে কিছু কম্পিউটার কম্পোজের দোকানি, যারা এসব জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে দেয়। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ের সব সনদই তৈরি করত চক্রটি। জমির জাল জমি বানাতেও দক্ষ তারা।

যেভাবে ডিবির জালে ধরা পড়লো চক্রটি

গত শনিবার ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে রাজধানীর সকামরাঙ্গীরচর ও সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে প্রতারণায় জড়িত চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা (ডিবি) রমনা বিভাগ। 

গ্রেফতাররা হলেন- মো. অহিদুজ্জামান বাবু, মো. তানভির আহম্মেদ, মো. রাজু হাওলাদার, মো. খোকন, ও মো. শহীদুজ্জামান চৌধুরী।

ডিবি রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ফজলে এলাহী জানান, চক্রটি কামরাঙ্গীরচর থানার পশ্চিম রসূলপুরের ৩নং গলির একটি ফ্ল্যাটে শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট তৈরি করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় অহিদুজ্জামান, তানভির, রাজু, ও খোকনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি সার্টিফিকেট, জাল সার্টিফিকেট বানানোর দুই প্যাকেট কাগজ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অফিসিয়াল প্যাড-০১টি, স্যামসাং মনিটর ১টি, সিপিইউ ১টি, ক্যানন-১০০০ কালার প্রিন্টার ১টি, ও ১০০ টাকার ৫টি স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়। 

গ্রেফতারদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তির সহায়তায় রমনা থানার সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে শহীদুজ্জামান নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা জানায়, প্রথমে তারা জাল সনদ বানাতে আগ্রহীদের খুঁজে বের করে। এরপর আগ্রহীদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে কম্পিউটারের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে।

প্রাইভেট চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে জাল সনদ

ডিবি পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, এই প্রতারক চক্র তিনটা ধাপে কাজ করে। প্রথমত, যারা লেখাপড়া না করে, পরীক্ষা না দিয়ে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট পেতে চায় অবৈধভাবে। এই গ্রুপটা ঢাকায় একটি দালাল গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেই দালাল গ্রুপ আবার এই চক্রটির কাছ থেকে জাল সনদ তৈরি করে। তো মাঝখানে দালালদের একটা গ্রুপ আছে, তাদের পেট্রোনাইজড করে যারা জাল সনদ বানাতে আগ্রহী এবং যারা জাল সনদ বানিয়ে দেয়, এই দুটো গ্রুপই।

তিনি আরও বলেন, অনেকটা কন্টাক্ট করে কাজটা হয়, বিশেষ করে প্রাইভেট সেক্টরে যেসব চাকরিগুলো আছে সেগুলোর জন্য এসব জাল সনদ ব্যবহার করা হয়। চক্রটি বাংলাদেশের সকল স্বনামধন্য বিশ^বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল করতে পারে। তাদের কাজের মানও প্রায় অরিজিনালের কাছাকাছি। খালি চোখে বোঝা খুবই কষ্টসাধ্য যে এটা আসল না নকল সার্টিফিকেট। তাই এ কাজের জন্য তারা বিভিন্ন সময় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিত। গ্রাহকের প্রয়োজনের ধরন বুঝে তারা টাকা ডিমান্ড করে। প্রাইভেট সেক্টরে যে ধরনের কাজগুলো আছে, যেখানে সার্টিফিকেট যাচাইয়ের সুযোগটা কম সেসব জায়গায় তারা এসব জাল সনদ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে।

নকল সনদ প্রত্যাশীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, যারা এই কাজটির সঙ্গে জড়িত তারা যেমন অপরাধী, তেমনি জাল সনদ বানানোর অর্ডার দিচ্ছেন তারাও সমান অপরাধী। এই জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে তারা হয়তো কোথাও চাকরির জন্য এপ্লাই করছে অথবা অন্য কোনো সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে। তো আমি বলবো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে নিয়োগের আগে এই সার্টিফিকেটগুলো ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। না হলে একটা ভুয়া লোক তাদের প্রতিষ্ঠানে ঢুকে যাবে। এতে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ও আসল সনদধারী ব্যক্তি বঞ্চিত হবেন।

তিনি আরও বলেন, জেনে শুনে এ ধরনের ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করা এবং এটি সংগ্রহ করা বড় ধরনের প্রতারণা। এর মাধ্যমে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই চক্রের বিরুদ্ধে আমরা বিশেষ অভিযানে যাবো। শুধু জাল সনদ প্রস্তুতকারক নয়, নকল সনদ প্রত্যাশীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও