ইভ্যালি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সরকার থেকে আদালতে
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ইভ্যালি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সরকার থেকে আদালতে

সাজেদ রোমেল ২:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১

ইভ্যালি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সরকার থেকে আদালতে
ইভ্যালির প্রতারণা নিয়ে সরকার থেকে আদালত-সর্বত্র ক্ষোভ বাড়ছে। সবাই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন গ্রাহকদের স্বার্থকে। এরই মধ্যে ইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তো সরাসরিই প্রাথমিক দায় চাপিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। সমালোচনায় নাস্তনাবুদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি এখন ইভ্যালির সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।
 
ইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা 

পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত বিতর্কিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট।

গতকাল বুধবার বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশিদ আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। ইভ্যালি বন্ধ করে দিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে ভুক্তভোগী মো. ফরহাদ হোসেনের করা একটি আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ আদেশ দেন।

আদেশে আদালত বলেন, ‘এই বিষয়টি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। সে পর্যন্ত কোম্পানিটির (ইভ্যালির) সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর বা অন্য কোনোভাবে নিষ্পত্তি করা থেকে বিরত থাকতে বলা হলো।’

ফরহাদ হোসেনের আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসেন বলেন, ‘আবেদনে উল্লেখ করা বিবাদীদের বেঞ্চ ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে উপস্থিত হয়ে কেন ইভ্যালি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা ব্যাখ্যা করতে বলেছেন।’

বিবাদীরা হলেন- ইভ্যালি লিমিটেড, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যুরো, নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিকাশের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, ই-ক্যাব অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য সচিব।

আদেশে হাইকোর্ট আরও বলেন যে, বিবাদীরা আদালতে হাজির হলে ইভ্যালি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের আবেদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বেঞ্চ এ বিষয়ে আরও আদেশ দিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

ই-কমার্সে প্রতারণার প্রাথমিক দায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের 

ই-কমার্সে প্রতারণার জন্য প্রাথমিকভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এ নিয়ে তিনি বলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান করার সময় কারও না কারও ছাড়পত্র নিয়েই করা হচ্ছে। এখানে ছাড়পত্র দিচ্ছে কমার্স মিনিস্ট্রি। তাদের প্রাইমারিলি দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের সঙ্গে অন্য যাদের সম্পৃক্ততা আছে, তাদের সবারই আমি মনে করি দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

গতকাল বুধবার দুপুরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

ই-কমার্সে প্রতারণা নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলব না। মূলত কাজটি এখন আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা আছে, তারা এসব বিষয় নিয়ে আসে আমাদের এখানে। আইটির বিষয় আছে, সেখানে আইসিটি মিনিস্ট্রি আছে, তারাও দায়িত্ব নেবে। 

এ প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মধ্যে তৈরি করে মানুষকে ঠকায়। এটা কিন্তু চলে আসছে। আগে যেভাবে হতো, সেটি এখন ভিন্ন আঙ্গিকে আসছে। আগে ম্যানুয়ালি করত, এখন ইলেক্ট্রিক্যালি করছে। ডিজিটালাইজড ওয়েতে করা হচ্ছে। মানুষ বিশ্বাস করে এখন, কতদিকে নিয়ন্ত্রণ করবে? সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে অবশ্যই। সরকারই দায়িত্ব নেবে। সরকার দায়িত্ব এড়াবে কেন?

দেনা পরিশোধে ইভ্যালির সঙ্গে কথা বলবেন বাণিজ্যমন্ত্রী 

ভুক্তভোগীদের দেনা পরিশোধে ইভ্যালির সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

তিনি বলেছেন, ‘তাদের (ইভ্যালি) সঙ্গে কথা বলব। তাদের কী পরিমাণ সম্পদ আছে, সেই সম্পদ দিয়ে কতটুকু অ্যাড্রেস করতে পারবে। আগামীতে যাতে মানুষ আর প্রতারিত না হয় সেটি এবং যেটা ঘটেছে, তদন্ত করে কতটুকু তারা পরিশোধ করতে পারে, কতটুকু তাদের কাছে আছে, সেটা নিয়ে এসে মানুষের দায় কতটুকু পরিশোধ করতে পারবে, সেটি শুনতে হবে।’

গতকাল বুধবার বিকেলে ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায় সাম্প্রতিক সমস্যা বিষয়ে আলোচনা সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।

টিপু মুনশি বলেন, ‘তাদের (ই-কমার্স মালিক-কর্মকর্তা) জেলে ভরে রাখলে তো গ্রাহকরা কিছু পাবে না। আবার কিছু না থাকলে বের করলেও লাভ হবে না। দেশে দুই হাজার ব্যবসায়ীও ছিল না, এখন দুই লাখ ব্যবসায়ী হয়েছে। যে সমস্যা হয়েছে, সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। ১০-১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। এছাড়া আলেশা মার্ট চেষ্টা করছে দেনা পরিশোধের, আমরা তাদের ওপর নজরদারি রাখছি।’

তিনি বলেন, ‘কিছু ঘটনা ঘটেছে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মালিক জেলে আছেন। আরও কিছু কোম্পানির কেউ কেউ পালিয়েছেন। আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক নারীও ই-কমার্সে যুক্ত হয়েছেন। তাই ই-কমার্স বন্ধ করা যাবে না। যারা চিটিং (প্রতারণা) করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটি একটি বিষয় এবং সামনে কীভাবে চলা যায়, সেটিও একটি বিষয়।’

মন্ত্রী বলেন, ‘গত ৪ জুনের আগে ছয় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এখন বাকি চার মাসে ৬০০ কোটি টাকা স্ক্রো ফান্ডে জমা হয়েছে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১২ টাকার জিনিস ১ টাকায় দেয়া যায় না। এ ধরনের বড় কোম্পানিকে এখন থেকে সতর্কীকরণ বার্তা দিতে হবে।’

‘ইভ্যালির ৫০০ কোটি টাকার দায় রয়েছে। অর্ধেক কাস্টমার, অর্ধেক মার্চেন্টদের। শুনেছি ৮০-৯০ কোটি টাকার সম্পদ আছে। তাদের চিন্তা-চেতনা কী, সেটা জানার চেষ্টা করা হবে। এগুলো আজকের আলোচনায় এসেছে। ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানের টাকা শোধের অ্যাবিলিটিই নেই। তারা প্রচারের জন্য ব্যাপক টাকা বিনিয়োগ করেছে। ক্রিকেট খেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় টাকা নষ্ট করেছে’ বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা। কিন্তু তারা যে মানুষকে লোভ দেখাচ্ছে, সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখবে না। ১০০ টাকার জিনিস তারা ৫০ টাকায় দিতে চায়, সেটা কীভাবে সম্ভব? মানুষ লোভ সামলাতে না পেরে ফাঁদে পা দিয়েছে, তাদের লোভ সংবরণ করা উচিত।’

সরকার টাকার দায় নেবে কি-না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার তো টাকা নেয়নি। যে লোকটা পাঁচটা মোটরসাইকেল কিনে লাভ করেছে, পরে আরও ১০টা অর্ডার করেছে। লাভের ভাগিদার তো সরকার হয়নি। তাদের (ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান) কতটুকু সম্পদ আছে, সেটা দেখতে হবে।’

বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘আজকের বৈঠকে বেশকিছু আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ ই-কমার্স ব্যবসা বন্ধের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়েছে কয়েকটি খারাপ প্রতিষ্ঠানের জন্য ই-কমার্স বন্ধ করা ঠিক হবে না। কিছু সুপারিশ এসেছে, সেগুলো হলো ই-কমার্স ব্যবস্থাপনার জন্য ই-কমার্স রেগুলেটরি কমিটি করতে হবে। ডিজিটাল কমার্স আইন করতে হবে।’

সচিব আরও বলেন, ‘যে অভিযোগ আসছে, সেগুলো বিভিন্নভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তাই সব কমপ্লেইন মনিটরিংয়ের কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে। যারা ইতোমধ্যে যে অপরাধ করেছে, প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেজন্য আইনে কিছুটা সংশোধনী আনতে হবে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে, নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না।’

সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পুলিশের আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও