স্বর্ণের দোকানই ডাকাত দলের টার্গেট
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

স্বর্ণের দোকানই ডাকাত দলের টার্গেট

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১

স্বর্ণের দোকানই ডাকাত দলের টার্গেট
গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বর্ণের দোকান ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সশস্ত্র ডাকাত দল। চলতি মাসের শুরু থেকে একের পর এক জুয়েলার্সে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ সদরের চিতলিয়া বাজারে দুটি স্বর্ণের দোকানে সশস্ত্র ডাকাতি করে নদীপথে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরক দ্রব্য ছোড়ে ডাকাত দল। আশুলিয়া থানার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট বাজারে ১৯টি স্বর্ণের দোকানে একযোগে ডাকাতি করা হয়। 

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে তিনটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ডাকাতের ছোড়া গুলিতে এক পুলিশ সদস্য আহতও হন। 

একের পর এক এসব ঘটনায় তৎপর হয়ে উঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত কয়েকদিনে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ডাকাতি হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারও।
 

১৯ জুয়েলার্সে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতার ১১ 

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট বাজারে ১৯টি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় ৩০-৪০ জন সশস্ত্র ডাকাত অলঙ্কার এবং নগদ টাকাসহ ১ কোটি ২ লাখ ৩২ হাজার টাকার লুট করে। ওই ঘটনায় মামলা দায়ের হলে তদন্তে নেমে গত ১৫ সেপ্টেম্বর শাহানা আক্তার (২৪) নামে এক ডাকাতের স্ত্রীকে স্বর্ণ বিক্রির নগদ ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৪০ টাকা ও আনুমানিক ৩-৪ ভরি স্বর্ণসহ গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে আল মিরাজ মিন্টু (৩৮) ও কামাল খান (৩৯), আনোয়ার হাওলাদার (৩৯), দেলোয়ার হোসেন খলিফা (৩৬), আব্দুর রহিম (৫৫), আল মিরাজ ওরফে মিন্টু (৩৮), কামাল খাঁ (৩৯), মো. সাগর (৪০) এবং ডাকাতির মালামাল কেনার অভিযোগে সবুজ রায় (৩২) ও রহিমকে (৩১) গ্রেফতার করা হয়।

লুটের অলঙ্কার স্বর্ণের পাত বানিয়ে বিক্রি

এই ১১ জনকে গ্রেফতারের পর সিআইডি জানায়, ১৯টি জুয়েলার্সে ডাকাতির ঘটনায় ছাড়াও গ্রেফতারদের মধ্যে কয়েকজন ধানমন্ডির রাপা প্লাজার রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত।

সিআইডির দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে লুট করা স্বর্ণালংকার গলিয়ে স্বর্ণের পাত বানিয়ে রাজধানীর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে একটি সিন্ডিকেট। ডাকাতির স্বর্ণালংকার তাঁতীবাজারে অবৈধভাবে বেচাকেনার সুস্পষ্ট তথ্য রয়েছে তাদের কাছে।

গতকাল বুধবার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মুক্তা ধর বলেন, গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে শাহানা, আনোয়ার, দেলোয়ার, সবুজ রায়, আ. রহিম, আল মিরাজ ও কামাল খাঁ আশুলিয়ায় ডাকাতির ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে ঢাকার নয়াবাজার এলাকার রহিমের বাসায় অভিযান চালিয়ে আশুলিয়া থেকে লুট হওয়া ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা।

গ্রেফতারদের কয়েকজন রাপা প্লাজায় ডাকাতিতে জড়িত 

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ধানমন্ডির রাপা প্লাজার রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সে ডাকাতি করে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ লুট করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আশুলিয়ার ঘটনায় গ্রেফতার সবুজ রায় ও রহিমসহ আরও ৫-৬ জন রাপা প্লাজায় ডাকাতির কথা স্বীকার করেন। পরে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে নয়াবাজার এলাকার সবুজের বাসায় অভিযান চালিয়ে রাপা প্লাজা থেকে লুট হওয়া ১২ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

তাঁতীবাজারে অবৈধ বেচাকেনার সিন্ডিকেটের খোঁজ

এসএসপি মুক্তা ধর বলেন, ডাকাতির স্বর্ণালঙ্কার তাঁতীবাজারে অবৈধভাবে বেচাকেনার সুস্পষ্ট তথ্য রয়েছে সিআইডির কাছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লুট করা স্বর্ণের অলঙ্কার গলিয়ে স্বর্ণের পাত বানিয়ে অবৈধ ব্যবসার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে তাঁতীবাজারে। যা সবুজ রায় ও রহিমের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে। তাঁতীবাজারের খাঁজা করপোরেশন, রাজিয়া বুলিয়ান স্টোর, সুমন বুলিয়ান স্টোরের নাম প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুন্সীগঞ্জে দুই জুয়েলার্সে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতার ৯ 

এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দিনগত রাত আড়াইটার দিকে মুন্সীগঞ্জের চিতলিয়া বাজারে দুটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতদল পালিয়ে যাওয়ার সময় রজতরেখা নদীতে টহলরত পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরকদ্রব্য ছুড়ে। তারা বাজারের মনুনাগ ও নিখিল বণিক স্বর্ণ শিল্পালয় নামের দুটি স্বর্ণের দোকান থেকে আনুমানিক ১০৭ ভরি স্বর্ণ ও ৪০ লক্ষাধিক টাকা লুট করে। ওই ঘটনায় নিখিল বণিক স্বর্ণ শিল্পালয়ের মালিক রিপন বণিক বাদী হয়ে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় অজ্ঞাত ১৮-২০ জনের নামে ডাকাতির মামলা করেন।

এই ডাকাতির ঘটনায় গত ২০ সেপ্টেম্বরস্বর্ণ ক্রেতাসহ ডাকাতদলের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জব্দ করা হয়েছে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত স্পিডবোটটিও।

মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন জানান, ডাকাতির পরই অভিযানে নামে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ঢাকা থেকে এই ডাকাতদের গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ৬৯ ভরি স্বর্ণ, ১৫ হাজার টাকা, একটি ম্যাগাজিনসহ পিস্তলের গুলি, চার রাউন্ড শর্টগানের গুলি এবং একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়। ডাকাতির পরই ডাকাতদল মালামাল বিক্রি করে ফেলে এক দোকানদারের কাছে। সেই দোকানদারকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

নরসিংদীতেও ডাকাতির চেষ্টায় গ্রেফতার ৯

এদিকে গত ১০ সেপ্টেম্বর নরসিংদীতে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৯ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, নগদ ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, প্রাইভেটকার, গুলি ও দেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) ইনামুল হক সাগর বলেন, ডাকাতরা অস্ত্রসহ জড়ো হয়ে নরসিংদী সদর এলাকায় স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করার চেষ্টা করছিল। এই ডাকাত দলটি গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার আশুলিয়া উপজেলার নয়ারহাট বাজারে ও ৩১ আগস্ট রাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী বাজারে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত বলে স্বীকার করেছে।

নারায়ণগঞ্জে ৩ জুয়েলার্সে ডাকাতি, পুলিশ আহত 

এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের গোপালদী বাজারে তিনটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসময় ডাকাতদের ছোঁড়া গুলিতে আহত হন পুলিশের এক এএসআই।

আড়াইহাজার থানার ওসি আনিচুর রহমান জানান, স্বর্ণ শিল্পালয়, বিশনদীয়া স্বর্ণ শিল্পালয়সহ ৩টি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি হয়। রাতে দোকান তিনটির কারিগররা কাজ করছিলেন। এ সময় বাজারের নৈশ প্রহরীদের বেধে ২০ থেকে ২৫ জনের একদল ডাকাত অস্ত্র নিয়ে হানা দেয়। স্বর্ণের দোকানের কারিগরদের মারধর করে স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। তাদের চিৎকার শুনে পাশের গোপালদী বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যায়। 
এ সময় ডাকাতরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন গোপালদী ফাঁড়ির (এএসআই) সোহরাব হোসেন। জড়িতদের ধরতে তৎপর রয়েছে পুলিশ।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও