রাজধানীতে হঠাৎ সক্রিয় দুর্ধর্ষ চোরচক্র
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

রাজধানীতে হঠাৎ সক্রিয় দুর্ধর্ষ চোরচক্র

প্রীতম সাহা সুদীপ ৪:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১

রাজধানীতে হঠাৎ সক্রিয় দুর্ধর্ষ চোরচক্র
রাজধানী ঢাকায় হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ চোরচক্র। মেট্রোরেলের মালামাল, রাজধানীর বিভিন্ন সুউচ্চ ভবনের বিভিন্ন অফিসের মূল্যবান সামগ্রী, ট্র্যাক-কাভার্ডভ্যান থেকে বিভিন্ন গার্মেন্টের পণ্য চুরি করছে চোর সিন্ডিকেট।
গত কয়েকদিনে এসব সিন্ডিকেটের কমপক্ষে ২০ জন চোরকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
 
সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার এক যুবকের মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে মেট্র্রোরেলের মালমাল চুরি করা সিন্ডিকেটের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করার তথ্য জানায় র্যািব। 

একই দিন একটি চোর চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতারের তথ্য জানায় ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। চক্রটি নারীদের মাধ্যমে বিভিন্ন সুউচ্চ ভবন-টাওয়ার রেকি করানোর পর সেখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসে চুরি করত।

যুবকের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে মিলল চুরির তথ্য

গত ১৬ সেপ্টেম্বর মো. নাজমুল (১৮) নামে এক তরুণ মিরপুরের বাসা থেকে কাজের সন্ধানে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়। ওই ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর জানা যায় ডিএমপির তুরাগ থানা এলাকায় একটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই লাশটি নাজমুলের বলে তার বাবা শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তুরাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়। আর এ ঘটনায় র্যা বের একটি দল ছায়াতদন্ত শুরু করে।

তদন্তে র্যােব জানতে পারে, মূলত তুরাগ এলাকা থেকে বিদ্যুতের তার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান নাজমুল। তদন্তের এক পর্যায়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাাব। তারা হলেন- মো. আশিক (১৯) ও মো. হারুন (৪০)। 

এ সময় তাদের কাছ থেকে চোরাইকৃত মালামালসহ একটি পিকআপ ও সিএনজি জব্দ করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে র্যা ব নাজমুলের মৃত্যু ও মেট্রোরেল প্রকল্পের মালামাল চুরি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পায়।

এ বিষয়ে গতকাল র্যালব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিচালিত হয়ে আসছে। ওই প্রকল্পগুলো চলাকালে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ সাধারণত খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়। একটি সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি দল সুকৌশলে সেই মালামাল চুরি করে। নিহত নাজমুলও এই সংঘবদ্ধ চোর চক্রের সদস্য ছিলেন। চক্রটির আরও দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার আশিক ও হারুন জানিয়েছে, মৃত নাজমুলসহ তারা তিনজন রাসেল ও শামীম নামে আরও দুজনের সঙ্গে মিলে চুরি করত। তারা বেশকিছু দিন ধরে মেট্রোরেলের মালামালসহ অন্যান্য সরকারি কাজের মালামাল এবং বৈদ্যুতিক তার চুরির কাজ করে আসছিল। চক্রটি ঢাকা মহানগরীর পল্লবী থানাধীন এলাকায় পরস্পরের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প ছাড়াও আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় লোহা, ইস্পাত, তার, মেশিন কৌশলে চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

যেভাবে মৃত্যু হয় নাজমুলের

র্যা ব জানায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর রাসেল এবং শামীম মৃত নাজমুলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ওই রাতে পরে আশিকও বরাবরের মতো তাদের সঙ্গে চুরির কাজে যোগ দেয়। যদিও সেদিন তাদের সঙ্গে হারুন যোগ দেয়নি। তুরাগে বিদ্যুতের তার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ঘটনাস্থলেই নাজমুলের মৃত্যু হয়। পরে তারা নাজমুলকে সেখানেই রেখে পালিয়ে যায়।

কয়েকটি ধাপে চুরি করত এই চক্র

র্যা ব জানায়, চোরাই চক্রটি এই চুরির কাজ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করত। তারা কৌশলে প্রকল্পের কী মালামাল কোথায় আছে তার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করত। সেই অনুযায়ী চুরির পরিকল্পনা করত। পরবর্তী সময়ে চুরি করা মালামাল একটি গোপন জায়গায় নিয়ে রাখত। আরেকটি গ্রুপ চোরাইকৃত মালামাল পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে সহজে বহনযোগ্য করত। পরবর্তীতে এসব মালামাল বিক্রি করা হতো। এই চক্রের আরও বেশ কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে এলিট এই ফোর্স।

জট খুলল উত্তরার প্যারাডাইস টাওয়ারে চুরি

এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা প্যারাডাইস টাওয়ারে চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংঘবদ্ধ চোরচক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবি উত্তরা বিভাগের উত্তরা জোনাল টিম। গ্রেফতাররা হলেন- জামাল উদ্দিন, শফিক ভূঁইয়া ওরফে বাছা, জসিম উদ্দীন, কাদের ওরফে কিবরিয়া ওরফে বাবু, মো. শাকিল, আলামিন ও শফিকের স্ত্রী মুক্তা আক্তার।

ডিবি পুলিশ জানায়, চক্রটি আগে চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকায় বড় বড় সব চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে ফাঁকা রাজধানীর সুউচ্চ ভবনে চুরির উদ্দেশে তারা ঢাকায় আসে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও চলতে থাকে তাদের অপকর্ম। পরিকল্পনা মোতাবেক প্রথমে নারী সদস্যকে দিয়ে টার্গেট করা অফিস, সুউচ্চ ভবন কিংবা টাওয়ার রেকি করাত চক্রটি। এরপর সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটিয়ে সটকে পড়ত।

গতকাল দুপুরে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১১ জুন ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার প্যারাডাইস টাওয়ারের ৮ম তলায় গোল্ডেন টাচ ইমপোর্ট আইএনসি অফিসে চুরির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলার ছায়া তদন্তকালে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় চুরির ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে জামালের বিরুদ্ধে ১৪টি চুরির মামলা রয়েছে। তারা সবাই চট্টগ্রাম বন্দর থানা এলাকা কেন্দ্রিক চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত। গত কয়েক বছরে তারা ঢাকায় চলে আসে। পরে ঢাকার সুউচ্চ ভবন, অফিস ও টাওয়ারে চুরিতে জড়ায় তারা।

ঢাকার ৭ ভবনে চুরি করেছে চক্রটি

ডিবি পুলিশ জানায়, গ্রেফতাররা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সুউচ্চ টাওয়ারে অবস্থিত বিভিন্ন নামিদামি অফিসে প্রথমে চুরির টার্গেট করে। তারা প্রথমে খোলা থাকা অবস্থায় অফিস ও ভবন ২-৩ দিন ধরে রেকি করে চুরির কৌশল রপ্ত করে। এরপর সুযোগ বুঝে টার্গেট করা বন্ধ হয়ে যাওয়া অফিসের তালা, সিকিউরিটি লক, ডিজিটাল লক ও অফিস কক্ষের ড্রয়ার ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও টাকা পয়সা চুরি করে সুকৌশলে বের হয়ে যায়।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, শুধু ঢাকাতেই এই চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্তাধীন সাতটি চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো হচ্ছে- আদাবর টাওয়ারের ৪র্থ তলার এক্সপার্ট গ্রুপ, কাকরাইল নাসির উদ্দিন টাওয়ারের ১০ম তলায় আমিন গ্রুপে, গুলশান জব্বার টাওয়ারের ১৯তলায় এসিউর গ্রুপ, বাড্ডা রূপায়ণ টাওয়ারের ৬ষ্ঠ তলায় অবস্থিত সফট লিংক কোম্পানি ও ৭ম তলায় অবস্থিত এক্সজিবল কোম্পানির অফিসে চুরির ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, যেসব অফিসে বা মার্কেটে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই কিংবা থাকলেও মনিটরিং নেই সেগুলোকেই টার্গেট করত এই চক্রটি। এজন্য সব মালিক বা ব্যবসায়ীদের সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা ও মনিটরিং নিশ্চিত করা উচিত। জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের আরও কয়েকজন সদস্যের নাম জেনেছি। তাদেরও গ্রেফতার করা হবে।

গার্মেন্ট পণ্য চুরিতে সক্রিয় আরেক সিন্ডিকেট

এছাড়া গত ২০ বছর ধরে গার্মেন্ট পণ্য চুরি করে আসছিল পৃথক আরেকটি চক্র। ডিবি সূত্র জানায়, গত মে মাসে এই চক্র আশুলিয়ার জয়ন্তী নিটওয়্যার লিমিটেডের পণ্যবোঝাই কাভার্ড ভ্যান থেকে পণ্য চুরি করে। এই ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করে জয়ন্তী কর্তৃপক্ষ। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও নেটওয়ার্ক ক্লোথিং লিমিটেডের পাঁচ হাজার পিস কাপড় চুরি হয়। নেটওয়ার্কও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করে। এই দুই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গত সোমবার ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ডিবির সাম্প্রতিক অভিযানে এই চক্রের প্রধান সাঈদ ওরফে সিলেটী সাঈদ গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা রয়েছে। তার বাড়ি মৌলভীবাজারে। সেখানে তিনি দ্বিতল ভবন, ইটভাটা ও ট্রাকের মালিক। দুই স্ত্রীও আছে তার। এক স্ত্রী লন্ডনে, অন্যজন বাংলাদেশে থাকেন। চট্টগ্রামের ছয় মামলায় দীর্ঘদিন জেল খেটে বেরিয়ে তিনি আবারও সক্রিয় হন।

কাভার্ডভ্যান থেকে হাজার কোটি টাকার পণ্য চুরি

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সাঈদ জানিয়েছেন- ২০০০ সাল থেকেই তিনি গার্মেন্ট পণ্য চুরি করে আসছেন। এই চোর চক্রে আরও ২০ থেকে ৩০ জন রয়েছেন। চক্রটি অন্তত পাঁচ হাজার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান থেকে পণ্য চুরি করেছে। এসব পণ্যের দাম কয়েক হাজার কোটি টাকা।

ডিবি কর্মকর্তা হাফিজ বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে মহাসড়কে মূলত এসব চুরির ঘটনা ঘটছে। বন্দরে যাওয়ার পথে পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান থামিয়ে চোরচক্র মালামাল নামায়। পরে এগুলো তারা ছোটখাটো বায়িং হাউসকে বিক্রি করে দেয়।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও