ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন, অনলাইনে জুয়ার আসর
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন, অনলাইনে জুয়ার আসর

প্রীতম সাহা সুদীপ ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১

ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন, অনলাইনে জুয়ার আসর
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন ও ক্লাবে ক্যাসিনোবিরোধী বিশেষ অভিযানের পর প্রকাশ্যে জুয়া খেলার প্রবণতা কমে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে জুয়া পরিচালনাকারী সিন্ডিকেটগুলো ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও এ সুযোগে অনলাইনে জুয়া খেলার প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে।

ঘরে বসে আয়ের ছুতোয় বিদেশ থেকে পরিচালিত ওয়েবসাইট এবং অ্যাপসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জনপ্রিয় ফুটবল-ক্রিকেট লিগ চলাকালে টাকার ওপর টাকা বাজি লাগাচ্ছেন তারা। 

এ নেশা গ্রাস করছে দেশের তরুণ সমাজকে। প্রতিনিয়ত দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অবাক করার বিষয় হলো দেশের প্রধান কয়েকটি অনলাইন লেনদেন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েই জুয়াড়িরা এসব লেনদেন করছেন।
 
খোঁজ মিলেছে হাজারো বাংলাদেশি জুয়াড়ির 

সম্প্রতি অনলাইন বেটিং সাইটের তিন জুয়াড়িকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। এরপর হাজারো বাংলাদেশির নেটওয়ার্কের খোঁজ পান তারা। বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ কেউ এসব বেটিং সাইটের লোকাল এজেন্ট, মাস্টার এজেন্ট কিংবা সুপার এজেন্ট। তাদের একেকজনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শত শত সাধারণ জুয়াড়ি। এসব বেটিং সাইটের অ্যাডমিন অবস্থান করছেন দেশের বাইরে।

যেভাবে চলছে জুয়ার আসর

ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ইমেইলে নিবন্ধনের পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লোকাল এজেন্টকে টাকা দেন জুয়াড়িরা। সেই টাকার কমিশন কেটে রাখেন লোকাল এজেন্ট, মাস্টার এজেন্ট ও সুপার এজেন্ট। ধাপে ধাপে বাকি টাকা ডলারে রূপান্তর করে দেশের বাইরে থাকা সুপার অ্যাডমিনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ক্রিকেট-ফুটবলসহ প্রায় সব ধরনের খেলা নিয়ে এসব সাইটে জুয়া চলছে।

এসব সাইটে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গ্রেফতারদের একজন গোয়েন্দা পুলিশকে জানান, অনলাইনে জুয়া খেলতে আগ্রহীদের প্রথমে ফেসবুকের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়, তিনি একটি আইডি নিতে চান। তখন গ্রুপ অ্যাডমিন তাকে একটি এজেন্ট দেন। ওই এজেন্টের মাধ্যমেই জুয়া খেলা শুরু হয়।

সূত্র আরও জানায়, জুয়া খেলতে প্রয়োজন পড়ে পার বেটিং ইউনিট বা পিবিইউ। বর্তমানে এক ইউনিট পিবিইউ-এর দাম একশ টাকা। সুপার অ্যাডমিন নিয়োগ দেন লোকাল, মাস্টার ও সুপার এজেন্ট। তারপর জুয়াড়িদের কাছে পিবিইউ বিক্রি করেন তারা। সেই টাকার পাঁচ শতাংশ হারে কমিশন পান এজেন্টরা। বাকি টাকা ডলারে রূপান্তর করে সুপার অ্যাডমিনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। জুয়ায় জিতলে পিবিইউ জমে জুয়াড়ির অ্যকাউন্টে। পরে তা এজেন্টদের মাধ্যমে টাকায় রূপান্তর করে নেওয়া যায়।

অনলাইন সাইটগুলোতে দেদার চলছে জুয়া

বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিনিয়ত অনলাইনে জুয়া খেলছে। অনুসন্ধানে বাংলাদেশে জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি অনলাইন বেটিং সাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব বেটিং সাইটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক ও ক্লাব পর্যায়ের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসে। 
সাইটগুলো হলো- বেট থ্রি সিক্সটিফাইভ, নাইন উইকেটস, প্লেবেট ৩৬৫, লগ১০ ডট লাইভ, ৯ক্রিকেট, বিডিটি১০ডটকম, বেটবি২ডট লাইভ, বেটস্কোর২৪ ডটকম, টাকা৬৫ ডটকম, উইনস৬৫ ডটকম, বেটভিক্টর.কম ইত্যাদি। এসব ওয়েবসাইটে জুয়া খেলেন- এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি ওয়েবসাইটই এক বা একাধিক অ্যাডমিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারাই জুয়া পরিচালনা করেন। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের এক বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ হয় খোলা কাগজের। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এসব ওয়েবসাইটে জুয়া খেলতে প্রথমে নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে আইডি খুলতে হয়। তারপর টাকা পাঠিয়ে কয়েন কিনতে হয়। ওয়েবসাইটগুলোতে এক বা একাধিক বিকাশ, রকেট ও নগদ নাম্বার দেওয়া থাকে। সেসব নাম্বারে টাকা পাঠালে সমপরিমাণ কয়েন দেওয়া হয়। এছাড়া এক জুয়াড়ি অন্য জুয়াড়ির কাছ থেকেও প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে কয়েন সংগ্রহ করেন। 

সদরঘাটের আরেক অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী বলেন, রেজিস্ট্রেশন করার পর নতুন খেলোয়াড় প্রতি খেলায় সর্বনিম্ন ২০ কয়েন, সর্বোচ্চ যে কোনো পরিমাণ বেট বা বাজি ধরতে পারে। বাজি ধরার পর জয়ী হলে বিজয়ীর অ্যাকাউন্টে কয়েন জমা হয়। পাঁচশ কয়েন জমা হলে তা উইথড্র অপশনের মাধ্যমে তুলতে পারেন জুয়াড়িরা। এক্ষেত্রে অ্যাডমিনের কাছে রিকোয়েস্ট করে বিকাশ, রকেট বা নগদ নাম্বার দেওয়ার ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা পাঠিয়ে দেন ওয়েবসাইট অ্যাডমিনরা।

ব্যবহার হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক দেশীয় লেনদেন মাধ্যম

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুয়ার অর্থ লেনদেনের জন্য অ্যাডমিনদের কাছে ১০ থেকে ১৫টি করে বিকাশ, রকেট ও নগদ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার নাম্বার রয়েছে। বিকাশ, রকেট ও নগদের এজেন্ট সিম নিতে ভুয়া তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করছেন এসব ওয়েবসাইট পরিচালকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এলেই এ ধরনের ওয়েবসাইট বাংলাদেশে বন্ধ করে দিচ্ছে বিটিআরসি। তবে বন্ধের অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়েবসাইটের ডোমেইন নাম পরিবর্তন করে পুনরায় তারা ফিরে আসছে। ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেও জুয়াড়িদের জমা রাখা টাকার নিশ্চয়তা দেয় অনেক ওয়েবসাইট। নতুন ডোমেইন নিয়ে ফিরে এসে জুয়াড়িদের জমা থাকা কয়েন ফেরত দিচ্ছে তারা। আবার জুয়াড়িদের বেটিংয়ের জন্য জমা বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ওয়েবসাইটের সংখ্যাও কম নয়।

প্রশাসন যা বলছে

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, ঘরে বসে আয়ের প্রলোভনে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আকৃষ্ট করছে জুয়াড়িচক্র। জুয়াড়িদের এসব সার্কেলের মধ্যে একশ লোক থাকতে পারে। কোথাও এক হাজার বা বড় সার্কেল হলে ১০ হাজার লোকও থাকতে পারে। তাদের এজেন্ট ও সাব এজেন্ট রয়েছে। তারা বসে বসে খেলে এবং পয়েন্ট জেতে। সেই পয়েন্টকে পরে তারা কারেন্সিতে রূপান্তর করে। বেটিং সাইটে জড়িত বাংলাদেশিদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও