অপ্রতিরোধ্য অবৈধ অস্ত্র সিন্ডিকেট
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮

অপ্রতিরোধ্য অবৈধ অস্ত্র সিন্ডিকেট

প্রীতম সাহা সুদীপ ১১:২২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১

অপ্রতিরোধ্য অবৈধ অস্ত্র সিন্ডিকেট
সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সীমান্তরক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় বিভিন্ন সময় অবৈধ অস্ত্রের চালান আটক এবং বহনকারীরা গ্রেফতার হয়েছে। তবে আড়ালে থেকে যাচ্ছে এসব অস্ত্রের চোরাকারবারিরা।

সম্প্রতি ভারত থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে বাংলাদেশে বিক্রির অভিযোগে ঢাকার মিরপুর দারুস সালাম এলাকা থেকে শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আকুল হোসাইনসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে আটটি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগাজিন ও আট রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

সাত বছরে ২০০ অস্ত্র বিক্রি, সংগ্রহ হতো ভারত থেকে জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশকে আকুল জানান, গত সাত বছরে তিনি অন্তত ২০০ অস্ত্র বিক্রি করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে কারা সেসব অস্ত্র ক্রয় করেছেন, তাদের তালিকা করছে পুলিশ।

গ্রেফতাররা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, তারা ২০১৪ সাল থেকে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা করেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ২০১৬ সালের আগে যে অস্ত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় কেনা হতো, সেগুলো দেশে এনে বিক্রি করা হতো ৫০ হাজার টাকায়। বর্তমানে ভারতে ৫০ হাজার টাকায় কিনে দেশে এনে সেগুলো বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ভারতের চোরাকারবারিরা একটি ৯ এমএম পিস্তলের জন্য ৬১ হাজার রুপি, ৫ ইঞ্চি ব্যারেলের ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের জন্য ৫১ হাজার রুপি ও ৩ ইঞ্চি ব্যারেলের ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের জন্য ৪১ হাজার রুপি রাখে। আকুল এসব অস্ত্র বাংলাদেশে যথাক্রমে এক লাখ ২০ হাজার, ৯০ হাজার ও ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন।

ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, অস্ত্র কারবারি চক্রটির মূলহোতা আকুল সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সেগুলো সরবরাহ করছিলেন। আকুল ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক অবৈধ অস্ত্র নিজে বিক্রি করেছেন। অস্ত্র চোরাচালান ছাড়াও এই চক্রের সদস্যরা তক্ষক প্রতারণা, সীমান্ত পিলার, সাপের বিষ, স্বর্ণ চোরাচালান, প্রত্নতাত্ত্বিক মূর্তি, ইয়াবা ও তুন মাদক আইস কারবারেও জড়িত ছিলেন।

সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আনার অভিনব কায়দা

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, আকুলের সিন্ডিকেটটি ভারতের তিনজন অস্ত্রের ডিলারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতেন। অস্ত্র ক্রয়ের পর সেগুলো সংগ্রহ করে ভারত থেকে দেশে ঢোকানো হতো অভিনব কায়দায়। ডিলারের লোকজন বিক্রি করা অবৈধ অস্ত্রগুলো প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় মাটিতে পুঁতে রাখতেন। এরপর ডিলারের পক্ষ থেকে হোয়াটস অ্যাপে খবর দেওয়া হতো আকুলকে। আকুলের লোকজন গিয়ে মাটি খুঁড়ে সেসব অস্ত্র বের করে দেশে আনার ব্যবস্থা করতেন। এসব অস্ত্র ও গুলির টাকা পরিশোধ হতো হুন্ডির মাধ্যমে।

তালিকা হচ্ছে চোরাকারবারিদের 

ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, চক্রটিকে গ্রেফতারের পর আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশি চোরাকারবারি ও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তালিকা পেয়েছি। তাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। সবাইকে গ্রেফতার করা হবে।

সীমান্তের ৩০ রুট দিয়ে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র 

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকার অন্তত ৩০ রুট দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত, যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, দর্শনা, হিজলা, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর, দৌলতপুর এবং দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টারের (বিডিপিসি) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে অবৈধ অস্ত্র আমদানির শতাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের মালিকরা অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন একশ্রেণির সন্ত্রাসীদের কাছে। খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি টেন্ডারবাজিসহ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আধিপত্য বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেও অনেক সময় দলীয় ক্যাডাররা অস্ত্রের মহড়া দেয়।

সাত বছরে সীমান্তে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ভয়ঙ্কর চিত্র 

দেশের সীমান্তগুলোর প্রহরায় নিয়োজিত থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এই বাহিনীটি ২৭টি পিস্তল, চারটি রিভলবার, অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র ২৫টি, গোলাবারুদ ১৮২ রাউন্ড, ম্যাগজিন ১১টি, মর্টারশেল ৩২টি এবং ৯১৮ কেজি ৮৫২ গ্রাম বিস্ফোরক উদ্ধার করে। 

এছাড়া গত আগস্ট মাসে সীমান্তরক্ষী এই বাহিনী একটি পিস্তল, সাতটি বন্দুক, দুটি দেশি পাইপ গান, একটি ম্যাগাজিন, ১৬ রাউন্ড গুলি এবং ছয়টি হাত বোমা উদ্ধার করে। সে হিসেবে চলতি বছরের গত আট মাসে সীমান্ত থেকে ৬৬টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ৩২টি মর্টারশেল, প্রায় ২০০ রাউন্ড গোলাবারুদ, ১২টি ম্যাগজিন ও প্রায় এক হাজার কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে বিজিবি।

এটা গেল গত আট মাসের তথ্য। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিজিবির পরিসংখ্যানের চিত্র আরও ভয়াবহ। এত বিপুল পরিমাণ চালান জব্দ করার পরও সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিজিবি ৩৪টি পিস্তল, ৭২টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৫টি ম্যাগজিন, ৯ হাজার ৪৭১ রাউন্ড গুলি, ৫৩টি ককটেল, ছয়টি আর্টিলারি সেল, ৪৪টি ডেটোনেটর, তিনটি আইইডি, ৬২টি নিউজেল ৯০ এবং ১.৭৫ কেজি গান পাউডার উদ্ধার করে।

২০১৮ সালে দেশের সীমান্তগুলো থেকে ৭৭টি পিস্তল, আটটি ওয়ান শুটার গান, একটি একে ৪৭, তিনটি রিভলবার, ১১টি এয়ারগান, তিনটি পাইপগান, আটটি ওয়ান শুটার পিস্তল, একটি দোনলা বন্দুক, ৭৬টি ম্যাগাজিন, ৩৭২ রাউন্ড গুলি, ৫৬টি ককটেল, ১২টি বোমা, ৫০৪ কেজি সালফার, ১০টি নিউজেল ৯০, ১৭টি ডেটোনেটর এবং ২৮ কেজি ১০০ গ্রাম গান পাউডার উদ্ধার করা হয়।

২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৯৪টি অস্ত্র, ৪ হাজার ৫৯৩ রাউন্ড গুলি, সাতটি গ্রেনেড, একটি মর্টারশেল, ৭১টি বোম্ব, ৩৪ কেজি বিস্ফোরক, ১০৪টি ককটেল, ১৬৭টি ম্যাগজিন ও ৪৮ কেজি গান পাউডার উদ্ধার করে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

এক বছরে প্রায় ৮০০ অস্ত্র উদ্ধার করেছে র্যা ব

২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক বছরে র্যা ব ৭৯০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ সময়ে বাহিনীটি ৬৫টি বিদেশি রিভলবার, নয়টি দেশি রিভলবার, ২৫১টি বিদেশি পিস্তল, ছয়টি দেশি পিস্তল, একটি একে ২২, ২৪৮টি শুটার গান, ৪২টি এয়ারগান, ৩টি ২২ বোর রাইফেল, ৬১টি এসবিবিএল, দুটি ডিবিবিএল, ৯৯টি এলজি/পাইপগান এবং তিনটি বন্দুক/কাটা রাইফেল উদ্ধার করে।

র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, র্যা বের ১৫টি ব্যাটালিয়ন অবৈধ অস্ত্রের মালিক, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নজরদারি শুরু করেছে। গত আগস্ট মাসেও অবৈধ অস্ত্র পাচার ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

অস্ত্র উদ্ধারে পিছিয়ে নেই কোস্টগার্ডও

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পিছিয়ে নেই কোস্টগার্ডও। বাহিনীটি ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৯ রাউন্ড গোলাবারুদ, সাত রাউন্ড ব্ল্যাংক কার্টিজ এবং ৫৫টি রামদা-কুড়াল-চাপাতি উদ্ধার করেছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪ রাউন্ড গুলি, ৯ রাউন্ড ব্ল্যাংক কার্টিজ এবং ৯৬টি রামদা-ছুরি উদ্ধার করে কোস্টগার্ড।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও