করোনায়ও গতিশীল কূটনীতিতে বাংলাদেশ
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

করোনায়ও গতিশীল কূটনীতিতে বাংলাদেশ

সাজেদ রোমেল ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২১

করোনায়ও গতিশীল কূটনীতিতে বাংলাদেশ
সাধারণ কূটনীতির বদলে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ মনোনিবেশ করেছিল করোনা মহামারির আগেই। সে অবস্থান থেকে এখনো অবিচল দেশ। তাতে সাড়াও মিলছে ছোট বড় নানা দেশের পক্ষ থেকে।

গতকাল বুধবারও বাংলাদেশ শিল্প খাতে রাশিয়াকে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছে। আবার একই দিন সার্কভুক্ত দেশ নেপালের একটি প্রতিনিধি দল মোংলা বন্দর পরিদর্শনকালে ভারতের হলদিয়া বন্দরের বদলের বাংলাদেশের বন্দরটি ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
 
বুধবারই ভারতের রাষ্ট্রদূত আখাউড়া থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার সঙ্গে রেলপথের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। 

তিনি আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে নিজ দেশে যাওয়ার সময় বাংলাদেশকে করোনার টিকা দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। 

যদিও ভারতের বিকল্প নানা উৎস থেকে টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, একদিকে চীন-ভারত, অন্যদিকে রাশিয়া-জাপানের সঙ্গে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। 

মহামারির মধ্যেও এক গতিশীল কূটনীতিতে আছে বাংলাদেশ। এক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ছাড়া সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সাফল্যও পেয়েছে এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যা পাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি।

শিল্প খাতে রাশিয়াকে বিনিয়োগের আহ্বান 

বাংলাদেশে সার, সিমেন্ট, চামড়া ও জাহাজনির্মাণ শিল্পে রাশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। গতকাল বুধবার বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভিকেন্তেভিক ম্যানটিটস্কির সঙ্গে বৈঠককালে মন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

শিল্প মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর অফিস কক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. গোলাম ইয়াহিয়া, মন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. আব্দুল ওয়াহেদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শিল্পমন্ত্রী রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বলেন, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া সিমেন্ট, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, সিরামিক, ওষুধ, কাগজ, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করা যায়।

বৈঠকে রাশিয়া এবং বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। রাশিয়ার প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এ চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে উভয়ে একমত প্রকাশ করেন।

শিল্পমন্ত্রী বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) এবং রাশিয়ার ফেডারেল এজেন্সি অন টেকনিক্যাল রেগুলেটিং অ্যান্ড মেট্রোলজির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ত্বরান্বিত করার জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তির খসড়া এরই মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনে তা সংশোধন করে পুনরায় পাঠানো হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশ-রাশিয়া ইন্টারগভার্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সাইন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশনের পরবর্তী সভায় দুই দেশের বিদ্যমান ইস্যুগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে বলেও তারা একমত পোষণ করেন।

সাক্ষাৎকালে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত শিল্পমন্ত্রীকে রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।

মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে চায় নেপাল 

বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অংশীদারি হয়ে এ বন্দর ব্যবহার করতে চায় প্রতিবেশী দেশ নেপাল। এ জন্য নেপালের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল বুধবার দুপুরে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) ক্যাপ্টেন এম আব্দুল ওয়াদুদ তরফদার জানান, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপাল হাইকমিশনের ডেপুটি চিফ অব মিশন কুমার রাইয়ের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দুপুর সোয়া ১২টায় মোংলা বন্দরে প্রবেশ করে। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষে বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা দীর্ঘ দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন। মোংলা বন্দর থেকে নেপালে কীভাবে পণ্য রপ্তানি করা যায় সে ব্যাপারে এ বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন নেপালের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

তিনি আরও জানান, তারা ভারতের হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করেন। এখন থেকে মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে বৈঠকে আলোচনা করেন তারা।

এর আগে ২০১১ সালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান এই চার দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার ঘটাতে ট্রানজিট চুক্তি হয়। চুক্তির পর এবারই প্রথম এ বন্দর ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক সফরে এলো নেপাল।

নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিলে মোংলা বন্দর অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে উল্লেখ করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য ক্যাপ্টেন এম আব্দুল ওয়াদুদ তরফদার বলেন, তারা এ বন্দরের জেটিসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বেলা ২টায় মোংলা বন্দর ত্যাগ করেন নেপালের প্রতিনিধিরা।

আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ চালুর অপেক্ষায় ভারত

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাই স্বামী বলেছেন, আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। ভারতের অংশের কাজ এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ অংশে কিছু কাজ বাকি আছে। আশা করছি আগামী বছরের ২/৩ মাসের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ শেষ হয়ে যাবে। 

গতকাল বুধবার দুপুরে আখাউড়া আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে যাওয়ার পথে সীমান্তের শূন্য রেখায় সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, সড়কপথ ভালো করা, রেলপথ মজবুত করা এবং নৌপথ ব্যবহারের জন্য দুই দেশের মধ্যে কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে দুই দেশই উপকৃত হবে। এটা আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্বের জন্যও ভালো হবে।

ভারতের হাইকমিশনার আরও বলেন, গত চার মাসে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য বেড়েছে। রেলের মাধ্যমে মালামাল আনা-নেওয়া চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে বেনাপোল, পেট্টাপুলের মতো আখাউড়া বন্দরের সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হবে।

ভারতের ভ্যাকসিন সরবরাহ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদন বেড়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে অক্সিজেন ও অক্সিজেন সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত ভ্যাকসিনও সরবরাহ করা যাবে।

ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা কবে নাগাদ চালু হবে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে ট্যুরিস্ট ভিসা ছাড়া সব ধরনের ভিসা চালু আছে। দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলও শুরু হয়েছে। 

কোভিড পরিস্থিতির আরও উন্নতি হলে দুই দেশের যাত্রীদের সুবিধা হবে। বিক্রম দোরাই স্বামী দুদিনের সফরে ভারতের আসাম যাবেন বলে সাংবাদিকদের জানান।

এর আগে তিনি সড়কপথে ঢাকা থেকে বেলা ১টায় আখাউড়া স্থলবন্দরে এসে পৌঁছেন। এ সময় তাকে স্বাগত জানান আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুমানা আক্তার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কসবা সার্কেল) নাজমুল হাসান, আখাউড়া থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান, ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ আব্দুল হামিদ প্রমুখ।

পরস্পরবিরোধী বিশ্বশক্তিগুলোকে উন্নয়ন সহযোগী করেছে বাংলাদেশ

চীন ও ভারতের মধ্যে দশকের পর দশক বৈরী সম্পর্ক রয়েছে। অথচ দুই শক্তিই বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বা আর্থিক বিনিয়োগ করেছে। চীন করছে পদ্মা সেতু, ভারত করছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা সুদূর অতীত থেকে। রাশিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে বাংলাদেশে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বধীন কোয়াড জোটের অন্যতম সদস্য জাপান বাংলাদেশে মেট্রোরেল, গভীর সমুদ্র কেন্দ্র থেকে শুরু করে অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। একদিকে চীন-রাশিয়া, অন্যদিকে ভারত-জাপানকে অংশীদার বানাতে পারার মতো নজির খুব কমই রয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতিতেই সফল বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায়, সামরিক পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক বিরোধে কোনো পক্ষ হচ্ছে না বাংলাদেশ। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে বড় কোনো অ্যাজেন্ডাতেও নেই। জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য ব্রিটেন, ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় কোনো প্রকল্পে নেই। আবার তাদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপও নয়, কেননা অনেক সাহায্য সংস্থা বা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা খাতে তাদের অনুদান আছে। 

তবে রাজনৈতিক কূটনীতিতে না থাকার ফলে বড় যে সমস্যাটা হয়েছে, তা হলো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। এক্ষেত্রে বড় কোনো অগ্রগতি এখনো হয়নি, বরং চীন-জাপান, রাশিয়া ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অপর তিন শক্তি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিছু বিবৃতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, ফ্রান্স তো পুরোই নীরব। 

আগামীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে রাজনৈতিক কূটনীতি শুরু করলে বা শেষ তিনটি দেশকে বড় বড় প্রকল্প দিলে তাতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতি হয় কিনা তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

এইচআর
 

আরও পড়ুন

আরও