করোনার আঘাতে বেসরকারি ঋণে ধস
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

করোনার আঘাতে বেসরকারি ঋণে ধস

জাফর আহমদ ১২:৩৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২১

করোনার আঘাতে বেসরকারি ঋণে ধস
সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ বড় আঘাত হেনেছে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি দুই খাতেই যে হারে ঋণ বিতরণ হয়েছে, তা আগের বছরের চেয়ে কম। বেসরকারি খাতে আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমেছে। আর সরকারি খাতে কমেছে প্রায় ৬৬ শতাংশ।

২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রোগ্রাম ঠিক করেছিল ১১ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। 

আগের বছর একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় এক শতাংশ বেশি, ৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৭ হাজার ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আগের বছর একই সময়ে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৯৫ হাজার ২০১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, বেসরকারি ঋণের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। করোনাকালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসেবি হয়েছে। বিতরণ ঋণ ফেরত আসার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় পড়ুক-এমনটা কোনোভাবেই চায়নি এসব ব্যাংক। করোনার মধ্যে ঋণ নিয়ে যে সব কোম্পানি ফিরিয়ে দিতে পারবে না বা করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে- এমন ঋণ বিতরণ করেনি তারা। বরং আমানতে সুদ হার কমিয়ে দিয়ে খরচ কমিয়েছে বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে বাড়তি তারল্য কাজে লাগিয়েছে। এ কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে।

সরকারি খাতে ঋণে প্রাক্কলিত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সরকারি খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এক বছর আগে ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৭৫৩ কোটি ২ লাখ টাকা। এ ঋণ আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।

করোনা মহামারীর কারণে মানুষের আয় কমেছে। ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। আর ক্ষয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। ফলে অনেক উদ্যোগই নিঃস্ব হয়ে গেছে, পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে বা বসার উপক্রম হয়েছে। এতে একদিকে বিনিয়োগকারী বা ঋণ গ্রহিতার দিক থেকে যেমন আগ্রহ নেই, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসেবি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি ঋণে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। পুরাতন বিনিয়োগই ভরসা।

করোনাকালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারকে টাকা ধার দিতে বেশি নিরাপদ মনে করেছে। আমানতে সুদ হার কম হওয়ার কারণে সরকারের বন্ডসহ বিভিন্ন ফর্মে বিনিয়োগ করেছে। করোনা মহামারীর কারণে বিনিয়োগে হিসাব-নিকাশ করতে হয়, ঋণ উঠে আসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। সরকারের বন্ডে বিনিয়োগে সুদ হার কম হলেও শতভাগ নিরাপদ। এ কারণে সরকারের দীর্ঘ, মধ্য বা স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ করেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ কমার এটাও একটি অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।

করোনার ঝাপটায় সরকারি খাতে বিনিয়োগ বিপর্যস্ত হয়েছে। ২০২০ সালের মূদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। করোনায় লক্ষ্যের অর্ধেকই খেয়েছে। এ সময়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে ৪৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে। মূলত সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়া ও সামাজিক নিরাপত্তার দিকে বেশি দৃষ্টি দিতে হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় কার্যক্রম চালু রাখতে অর্থ খরচ করতে হয়েছে।

সরকারি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। চলমান বড় বড় প্রকল্পগুলোতে নামেমাত্র অর্থ ছাড় করে প্রকল্পগুলো চালু রাখা হয়েছে, অন্যগুলো বন্ধ প্রায় অবস্থা। এর ফলে সরকারি খাতে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি অর্জনে লক্ষ্যের ধারে কাছে যেতে পারেনি। এ জন্য ঋণও কমেছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থান। দেশে প্রতি বছর কর্মবাজারে কাজের সন্ধানে আসে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। করোনার কারণে প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। চাকরি হারিয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ। বিদেশ থেকে ফিরে আসা মানুষের এখনো প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদেশে ফেরত যেতে পারেনি। 
করোনা সৃষ্ট এই বোঝা একদিকে যেমন চাহিদাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তেমনি উৎপাদনও কমেছে। বিনিয়োগে স্বাভাবিক অবস্থা হারিয়েছে। 

আবার প্রতি বছরের কাজের সন্ধানে আসা নতুন মুখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাজ হারানো বিপুলসংখ্যক মানুষ। কর্মস্থানে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে করোনাভাইরাসে সৃষ্ট মহামারী অর্থনৈতিক গতি প্রকৃতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

এইচআর

 

আরও পড়ুন

আরও