শিক্ষকদের হৃদয় ভাঙা কান্না শুনবে কে?
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩ আশ্বিন ১৪২৭

শিক্ষকদের হৃদয় ভাঙা কান্না শুনবে কে?

প্রীতম সাহা সুদীপ, ঢাকা ৬:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০

শিক্ষকদের হৃদয় ভাঙা কান্না শুনবে কে?
'কঠিন থেকে কঠিনতর দিন আমরা পার করছি। হয়তো আমরা না পারবো কারো কাছে হাত পাততে, না পারবো কাজ করে খেতে। দিন খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে, জানি না সামনে কি হবে। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।'

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন এশিয়ান আইডিয়েল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান। অঝরে জল ঝরছিল করোনা পরিস্থিতিতে মানবেতর জীবন যাপন করা এই বেসরকারি স্কুল শিক্ষকের চোখ দিয়ে। এমন সময়ই মসজিদ থেকে জোহরের আজানের শব্দ ভেসে এলো। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে একটি গাছ তলায় বসে থাকা ওই শিক্ষক তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে বললেন, আল্লাহ জানেন তিনি কিভাবে আমাদের সামনের দিনগুলো পার করিয়ে দেবেন।

পরিবর্তন ডটকমের সাথে একান্ত আলাপচারিতার সময় এই শিক্ষক আরো বলেন, গত ১৭ মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যেহেতু আমি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রদের বেতনের ওপরই এটি নির্ভর করে। সরকারি কোন সহযোগিতা আমরা পাই না। করোনার এই সময় ছাত্রছাত্রীরা বেতন দিচ্ছে না, ফলে দীর্ঘ চারমাস ধরে আমাদের বেতনও বন্ধ রয়েছে। স্কুলের পাশাপাশি আমরা বেসরকারি শিক্ষকরা টিউশুনি বা প্রাইভেট পড়াতাম। করোনা পরিস্থিতির কারণে সেটিও বন্ধ রয়েছে। ফলে আমার মতো দেশের লাখ লাখ বেসরকারি শিক্ষকদের আয়ের পথ পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে।

হাফিজুর রহমান আরও বলেন, 'আমার পরিবারের চারজন সদস্য, আমি আমার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে থাকি। গ্রামে থাকেন আমার মা বাবা। দুই মেয়ের একজন ক্লাস থ্রিতে পড়ে আরেকজনের বয়স মাত্র দেড় বছর। তাদের তো একটা পুষ্টির ব্যাপার আছে। তাদের দিকে তাকাতেও আমার কষ্ট হয়, অপরাধবোধ হয়। আমি অপরাধ করছি, তাদের অধিকারবঞ্চিত করছি। আমার স্ত্রীরও একটা অধিকার আছে। তাকেও আমি বঞ্চিত করছি। সংসারে ৫ টাকা দরকার হলে একটাকা দিচ্ছি৷'

'গত চার মাস ধরে আমার কোন ইনকাম নেই অথচ বাসাভাড়া নিয়মিতভাবেই দিতে হচ্ছে। করোনাকালে হয়তো সামান্য কিছু টাকা কমিয়ে ভাড়া রাখছেন বাড়ির মালিক। যা সঞ্চয় ছিল তার সবটাই শেষ করে, এখন ধার করে চলছি। ধার করতে করতে এখন কেও ধারও দিতে চায় না। আমার ছোটভাই সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক তার কাছে হাত পেতে আমাকে চলতে হয়েছে। ধারের টাকা দিয়ে তো আর জীবন চলে না, এটা কোন জীবন হতে পারে না।'

সরকার যাতে এই করোনার সময় বেসরকারি শিক্ষকদের দিকে নজর দেয় এমন অনুরোধ করে ইংরেজির এই শিক্ষক বলেন, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড শক্ত না হলে কিভাবে হবে? কিভাবে দেশ ও জাতি সামনে এগিয়ে যাবে? একজন শিক্ষক জাতির নির্মাতা। তার চলার ধরণ হবে আলাদা, তিনি হবেন রোল মডেল। সরকারের সেই জায়গাটাতে স্ট্রং হওয়া দরকার। জাতির কাছে একজন শিক্ষকের কি চাওয়ার থাকে, দুবেলা দুমুঠো ভাত, সম্মান বজায় রেখে একটু সচ্ছলভাবে চলা। কিন্তু করোনার এই সময় লাখ লাখ বেসরকারি শিক্ষক সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তারা কারো কাছে হাত পাততে না পেরে করুণ ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক শিক্ষক বাসাভাড়া দিতে না পেরে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। কিন্তু যাদের গ্রামে জায়গা জমি কিছুই নেই তারা কি করবেন? এভাবে কতদিন চলবে প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়। আবার আমিও হয়তো বাধ্য হয়ে গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি৷ কিন্তু সেখানে গিয়েই বা আমি কি করবো সে প্রশ্নও কিন্তু থেকেই যায়।

বেতন নেই, নেই বিকল্প আয়ের পথওঃ

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগ গোটা বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাকে চরমভাবে ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আদায় হচ্ছে না কোন টিউশন ফি। ফলে দীর্ঘ চারমাস ধরে এসব শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে বন্ধ রয়েছে প্রাইভেট, টিউশুনিসহ তাদের বিকল্প আয়ের পথও।

রাজধানীর মুগদার আইডিয়াল প্রি-ক্যাডেট এন্ড হাই স্কুলের শিক্ষক সাব্বির আহমেদ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমি স্কুলে চাকরির পাশাপাশি দুইটা টিউশনি করতাম। যা দিয়ে আমার মেসের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে কিছুটা সহযোগিতা করতে পারতাম। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। এখন আমার আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ। অথচ আমাকে প্রতি মাসে মেসের ভাড়া বাবদ ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হচ্ছে। যা আমার বা পরিবারের পক্ষে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, আমার পক্ষে এখন আর অন‍্য পেশায় যাওয়া অসম্ভব। আমি বর্তমানে কঠিন দুঃসময় কাটাচ্ছি, সেই সাথে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। আর এই জন‍্য অপেক্ষায় আছি সরকারের সুন্দর একটি পদক্ষেপের আশায়। সরকার যদি বেসরকারি শিক্ষকদের কষ্ট লাঘব করতে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমরা এই মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি পাবো।

নিউ লাইফ প্রি-ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষিকা আল্পনা আক্তার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন,গত ৪ মাস ধরে আমাদের বেতন বন্ধ রয়েছে। স্কুলের অভিভাবকদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু কেউ ফোন ধরেন না বেতনও দিচ্ছেন না। এদিকে স্কুলের বাড়িভাড়া বাকি, আমরা নিজেদের বাসা ভাড়াও দিতে পারছি না। অন্য কোন আয়ের পথও নেই, টিউশুনি প্রাইভেট সব বন্ধ।

তিনি বলেন, আমার স্বামীও প্রাইভেট একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তিনিও বাসায় বসা। জমানো টাকা ভেঙে এতদিন চলেছি। কিন্তু এখন আর কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা তো শিক্ষক তাই না, আমরা তো টাকার জন্য কারো কাছে হাতও পাততে পারি না, ত্রাণের জন্য রাস্তায়ও নামতে পারি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা করছেন প্রণোদনা দিচ্ছে। আমি মনে করি আমাদের বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি তার নজর দেয়া উচিত, আমরা খুবই কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছি৷

বেতন বন্ধের মানসিক প্রস্তুতি রাখতে বলেছে অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষঃ

স্কুল বন্ধ থাকলেও নামি-দামি অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত ৪ মাস নিয়মিত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভিকারুননিসা স্কুল, হলিক্রস, মতিঝিল আইডিয়েল স্কুল, সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এর মধ্যে কিছু স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন আদায় করে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিয়েছে। আবার কিছু স্কুল বেতন আদায় করতে না পেরে স্কুল ফান্ড থেকে এতদিন শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করেছেন। এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে বেতন বন্ধের মানসিক প্রস্তুতি রাখার কথা শিক্ষকদের জানিয়ে দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুলের এক শিক্ষিকা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, গত চারমাস ধরে স্কুল ফান্ড থেকে আমাদের বেতন ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এই মাসে স্কুলে সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় কর্তৃপক্ষ আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলেছে। তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, এতদিন নিয়মিত বেতন দিলেও সামনে যে কোন সময় বেতন বন্ধ হয়ে যেতে পারে আমরা যেন সেই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকি। জানি না কি হবে! যা সঞ্চয় আছে তা ভেঙে চলবো, সেগুলো শেষ হয়ে গেলে কি করবো সৃষ্টিকর্তা জানেন।

অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথেঃ

করোনা কালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্ভোগ নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ কিন্টারগার্টেন এন্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ঐক্যপরিষদের মহাসচিব মো. রেজাউল করিমের।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ৪ মাস ধরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফলে আমাদের কোন আয় নেই, কারণ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভর করে শুধুই শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকার ওপর। আমরা শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না, এমনকি স্কুলের বাড়িভাড়াটা পর্যন্ত আমরা দিতে পারছি না। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অনেক কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-ক্যাডেট স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে। তারা এতটাই করুণ অবস্থায় আছেন যে স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আসবাবপত্র, চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ ইত্যাদিও বিক্রি করতে পারছেন না।

রেজাউল করিম বলেন, দেশে ৬৫ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১০ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। তারা সবাই এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন শিক্ষকরা। তারা তো লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্য নিতে পারেন না, তাদের আত্মসম্মানবোধ আছে। তারা শুধু সরকারের কাছেই সহযোগিতা চাইতে পারেন, কারণ সরকার আমাদের অভিভাবক। তাই স্কুলগুলো বাঁচাতে আমরা এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রণোদনার আবেদন করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় সব সেক্টর সরকারি সহযোগিতা পেলেও কিন্ডারগার্টেনগুলো অবহেলিত রয়ে গেছে। আশা করি সরকার তাদের জন্য সহযোগিতার ব্যবস্থা করবে, যাতে দেশে শিশু শিক্ষার প্রসার অব্যাহত থাকে।

স্থিরচিত্র- ওসমান গণি।

পিএসএস

 

: আরও পড়ুন

আরও