সাকরাইন: ঘুড়ি ওড়ানো ও আকাশজুড়ে আলোর খেলা
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাকরাইন: ঘুড়ি ওড়ানো ও আকাশজুড়ে আলোর খেলা

প্রীতম সাহা সুদীপ ৮:০৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২০

চারশ বছরের প্রাচীন এই ঢাকায় এক সময় বিচিত্র সব বিনোদন আর উৎসবের প্রচলন ছিল। আর এর বেশিরভাগই ছিল পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক এবং সেই সময়কার নবাব, নায়েব-নাজিম বা প্রভাবশালী জমিদারদের হাত ধরে। এ রকমই একটি উৎসবের নাম পৌষ সংক্রান্তি, যা সাকরাইন নামেও পরিচিত৷

ঠিক কবে ঢাকায় পৌষ সংক্রান্তির আয়োজন শুরু হয়েছিল তা জানা না গেলেও ধারণা করা হয় নায়েব ই নাজিম নওয়াজিস মোহাম্মদ খানের আমল (১৭৪০-১৭৪৪) থেকেই এর শুরু। পুরোনো সেই ঐতিহ্য যত্নের সঙ্গে ধরে রেখে এখনও পৌষ সংক্রান্তি উৎসব উদযাপন করছে পুরান ঢাকার মানুষ। তবে কালের স্রোতে এখন এই উৎসবে যোগ হয়েছে আধুনিকতা।

পৌষ সংক্রান্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মূল আয়োজন ধরা হয় ঘুড়ি ওড়ানোকে। সাধারণত সংক্রান্তির দিনে পুরান ঢাকার প্রায় সব বাড়ির ছাদেই ছেলে-বুড়োদের নাটাইয়ের সাহায্যে ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যায়। ঘুড়ির কাটাকাটি খেলার জন্য আরেকটা জিনিস ব্যবহার করা হয়। সেটি হচ্ছে সুতোয় 'মাঞ্জা' বা ধার দেয়া।

সুতোয় মাঞ্জা দিতে কাঁচের মিহি গুড়ো তৈরি করে শিরিশ আঠার মধ্যে পছন্দ সই রং মিশিয়ে জাল দেয়া হয়। এরপর সুতোয় কাঁচের গুড়া ও রং লাগিয়ে তা রোদে শুকানো হয়। এরপরই ওই সুতো ঘুড়ি কাটাকাটি খেলার উপযোগী হয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জির পৌষ মাসের শেষ দিনের এই উৎসবের জন্য সারা বছর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে পুরান ঢাকাবাসী৷ প্রতি বছর ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি পুরান ঢাকায় পৌষ সংক্রান্তি উৎসব পালিত হয়।

গতকাল মঙ্গলবার পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, শিংটোলা, পাতলাখান লেন, কাগজীটোলা, রূপচান লেন, সূত্রাপুর, বানিয়ানগর, ফরাশগঞ্জ, গেন্ডারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পালিত হয়েছে পৌষ সংক্রান্তি। এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজার, কোতয়ালি, বংশালসহ কয়েকটি এলাকায় এই উৎসব পালন করা হচ্ছে।

যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের এই উৎসবে পিঠা পায়েস খেয়ে, ঘুড়ি ওড়িয়ে দিনভর আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকে সবাই। প্রতিটি ছাদে যারা এ উৎসব পালন করে তাদের দলগুলোর রয়েছে আলাদা আলাদা নাম। বাকাট্টা, কাইটারজ, রঙ-সুতা, কাইট কিং, মাঞ্জা এমন বিভিন্ন নামে ছোট ছোট দলগুলো ভোর হতে না হতেই ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রতিযোগিতা।

আর এর ফাঁকে ফাঁকেই চলে সাউন্ড সিস্টেমের গানের তালে তালে নাচানাচি-মাতামাতি, আনন্দ উল্লাস। সারাদিন চলে ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযাগিতা। কারো ঘুড়ি কাটা গেলেই বিরোধী পক্ষ বাকাট্টা বাকাট্টা (ভোকাট্টা ভোকাট্টা) বলে চিৎকার করে উল্লাস করে।

বাড়ির ছাদেই সবাই এক সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়। বিকালে শুরু হয় সংক্রান্তির সবচেয়ে মূল আকর্ষণ। আয়োজকদের কেউ তখন ব্যস্ত থাকে মুখে কেরোসিন হাতে মশাল নিয়ে আলোক প্রদর্শনীতে। কেউবা ব্যস্ত থাকে আতশবাজী ফোটানোর কাজে। সে সময় পুরান ঢাকার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে আলোর ফোয়ারা। লাইটিং ও লেজার শোতে আলোকিত হয়ে যায় পুরান ঢাকার আকাশ৷

রাতে জাকজমকপূর্ণ গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এ পৌষ সংক্রান্তি উৎসব।

 

: আরও পড়ুন

আরও