করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের করণীয়
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০ | ২২ আষাঢ় ১৪২৭

করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের করণীয়

রবীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য ৭:১৬ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০

করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের করণীয়
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে আমাদের দেশের সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ এর পরিসমাপ্তি ঘটবে তাও নির্ধারণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। কারণ এ সময়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সকলের জন্য একান্ত অপরিহার্য। সরকারের এই নির্দেশনা সত্যিকার অর্থে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য।

অথচ এই বিষয়ে জনগণই লকডাউনের জন্য সরকারের নিকট দাবি রাখার কথা। সেখানে সরকারই বারংবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ইউরোপ-আমেরিকার দেশ যেখানে করোনা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশ এবং সরকার যদি প্রথম থেকে সতর্ক না থাকত তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতো। এজন্য সরকার অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। এমনকি বিশ্বের অনেক বড় বড় নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। এখন আমাদের যেটা সবচাইতে বড় বিষয় সেটা হলো জনগণকে সচেতন হওয়া। সরকার যেখানে দুই কোটি নিম্ন আয়ের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে সেক্ষেত্রে জনগণের সচেতন হওয়াটা অবশ্যই সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যাইহোক, আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো করোনাকালীন সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করা।

১। যেহেতু সারাদেশে সকল পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, সেকারণে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে হচ্ছে বিধায় এ মুহূর্তে অভিভাবকরাই অর্থাৎ পিতামাতাই তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষক উভয়ই। তাই অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজ-খবর রাখা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে আমাদের অভিভাবক যারা শহরে বসবাস করেন তাদের সন্তানদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই যথাযথ দায়িত্ব পালনে বেশি সচেতন থাকে। যদিও শহরের অবস্থা গ্রামের তুলনায় খুবই কম। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ অভিভাবক গ্রামে বসবাস করেন। গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও শহরের তুলনায় অনেক বেশি।

গ্রামের অভিভাবক এতদিন সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নেননি। কারণ তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন যেহেতু সন্তানরা বাড়িতে থাকছে, তাই অভিভাবকদের সন্তানদের সার্বক্ষণিক লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতে হবে। আমি জানি এমনকি আমি দেখেছি উত্তরবঙ্গে যখন ধান কাটা ও ধান বোনা ও মরিচ পাড়ার সময় হয়, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। বলা বাহুল্য, শিক্ষকদের অনেকেই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জমিতেই সময় দেন। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষা বিস্তার তৃণমূলেই ভেঙে পড়বে।

তাই গ্রামের অভিভাবকদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আপনারা নিজেরা শিক্ষিত হোন, আর নাই হোন না কেন, সন্তানের ভবষ্যতে উন্নতির কথা ভেবে তাদের প্রতি আরো আন্তরিক হোন। সার্বক্ষণিক তাদের খোঁজখবর নিন। কারণ আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করছে সন্তানের ভবিষ্যৎ।

২। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারণে ইতোমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম, তবুও তা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে আমি নিজেও ব্যাকরণের ওপর কয়েকটা অনলাইন ক্লাস ছেড়েছি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা কতটুকু উপভোগ করছে, তাও বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু তুলনামূলক অনেক কম।

এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রতি আমার বিশেষ আবেদন থাকবে, প্রতিষ্ঠান প্রধান শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষকদের গ্রুপ করে ভাগ করে দিবেন, যাতে করে শিক্ষকরা তার গ্রুপের শিক্ষার্থীদের মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে নিয়মিত খবরাখবর নিতে পারেন। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে বাড়িতে বসে শিক্ষকরা এ দায়িত্বটুকু সহজেই পালন করতে পারবেন। এখন প্রশ্ন হলো গ্রামের অভিভাবকদের অনেকেরই মোবাইল নাই। কিন্তু এ কথাটি আমি সর্বতভাবে গ্রহণ করছি না। আমাদের দেশে মুঠোফোনের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় মোট বিশ কোটি। এছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীরা যখন ভর্তি হয়, তখনই অভিভাবকদের মোবাইল নম্বর নেওয়া হয়। এর বাইরেও যাদের মোবাইল থাকবে না, এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা প্রধান সার্বিক সহযোগিতা করতে পারেন।

৩। অনলাইন ক্লাসে ফিডব্যাক গ্রহণ করতে হবে। তা কীভাবে করতে হয় সেটা হলো সংশ্লিষ্ট ক্লাসগুলো শিক্ষার্থীদের মনে কী প্রভাব বিস্তার করল বা তার কাছে কেমন লাগল সে মতামত/মন্তব্য মোবাইলে মেসেজ করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের নিকট প্রেরণ করবে। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক তাদের নিজের মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন।

এ বিষয়ে আমার নিজের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরতে চাই, যা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। আশা করছি পাঠকদেরও ভালো লাগবে। তা হলো আমি কোনো প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে ৪০ মিনিট কথা বলেছিলাম। কথা বলার সময় শিক্ষার্থীদের চোখের চাহনি ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হয়েছি। কথা শেষে আমি তাদেরকে একটা দায়িত্ব দেই। সেটা হলো এই, আমার এই ৪০ মিনিটের আলোচনা প্রথমে তোমরা বাড়ি গিয়ে তোমাদের বাবা-মার সাথে শেয়ার করবে। পরদিন যখন ক্লাসে আসবে তখন ক্লাসের অবসরে তোমার বন্ধু দের সাথে আবার শেয়ার করবে। এতে করে আমার কথাগুলো তোমাদের মনের মধ্যে আরো গভীরভাবে আকর্ষিত হবে এমনকি জীবনে কখনো তোমাদের মন থেকে এ কথাগুলো হারিয়ে যাবে না। দুই দিন পর অনেকগুলো ম্যাসেজ আমার মোবাইলে চলে আসলো। মেসেজগুলো পড়ে আমার খুবই ভালো লেগেছে এবং দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এত সুন্দর মেসেজ লিখতে পারে দেখে আমিও বেশ উৎসাহ বোধ করেছি। তাদের ৩-৪টি ম্যাসেজ আপনাদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করলাম:-

ক) আমার শুভেচ্ছা নিবেন। অসংখ্য ধন্যবাদ এমন ১টা সেশন উপহার দেওয়ার জন্যে। সত্যি আপনি যা শিখিয়েছেন তা কখনো ভুলবার নয়। ম্যাথে ভালো লাগায় এটা জানতাম যে সবকিছুর একটা ভিত্তি আছে। তাই বলে বর্ণমালারও এমন ভিত্তি আছে, সত্যিই কখনো চিন্তা করিনি। গ্রামে বাসা হওয়ায় অনেক কাঁকড়া ধরেছি, মেরেছি কিন্তু কখনো জানতাম না তারা এতোটাই ত্যাগী। অনেক আগে থেকেই স্বপ্ন দেখি আর আপনি সেটাতে যোগ করেছেন এক নতুন মাত্রা। সত্যিই ওই ৪০টা মিনিটের কথা এক সেকেন্ডও যে ভুলে যাবার নয়। ত্রুটি মার্জনীয়।

খ) শ্রদ্ধেয় স্যার, প্রথমে আমার সালাম নিবেন। আশা করি আপনি ভালো আছেন। গত ১৬-০৭-২০১৯ ইং তারিখ রোজ মঙ্গলবার বিদ্যালয় পরিদর্শনকালীন দশম শ্রেণিতে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তাতে আমি খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছি। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি দুটি ত্যাগী জীব মাকড়সা ও কাকড়া - এর জীবন বৃত্তান্ত। এই জীব দুটির মাধ্যমে জানতে পেরেছি আমার বাবা-মায়ের আমার প্রতি ত্যাগ স্বীকারতা। এই দুটি জীবের কথা মনে করে আমার বাবা-মায়ের প্রতি যতটুকু ভালোবাসা ছিল তার থেকে আরও লক্ষ্যগুন বেড়ে গেছে ।আমি আমার পাড়া-প্রতিবেশী ও সহপাঠীদের মাঝে যতটুকু পেরেছি আপনার বার্তাগুলো পৌঁছে দিয়েছি এবং যতদিন বেচে থাকব আপনার কথাগুলো অনুসরন করব এবং অন্যদেরকেও অনুপ্রানিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনার শেখানো সেই বিন্দু,রেখা ও অর্ধবৃত্ত দিয়ে আমি খুব নিখুতভাবে ছবি অঙ্কন করতে পারি । যাদের কাছে আমি আপনার বার্তা পৌঁছে দিয়েছি তারা সবাই অবাক হয়েছে এবং আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং আমিও আপনার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ ।

গ) আমি বিরল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। মোঃ মিনহাজুল ইসলাম।শুনেছি আপনি আমাদের স্কুলে এসেছিলেন।আমার মা অসুস্থ থাকায় আমি সেদিন স্কুলে যেতে পারিনি। কিন্তু আমার এক বন্ধু আমাকে আপনার কথা বলেছে। আপনি ক্লাসে যাযা শিখিয়েছেন তা সে আমাকেও শিখিয়েছে।সেই কথাগুলো শুনে আমি নতুন ভাবে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। আমার দূর ভাগ্য যে আমি আপনাকে দেখতে পারলাম না।কিন্তু আমার জন্য দয়া করিয়েন স্যার।আমি যেনো আমার নতুন করে দেখা এই স্বপ্নে সফল হতে পারি।

পরিশেষে করোনাকালীন সময়ে আমি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমার ছোট একটি Idea উদ্ভাবনী বিষয় তুলে ধরতে চাই। সেটি হলো একটা বিন্দু, যেখান থেকে পৃথিবীর সকল ভাষার সকল বর্ণ বেরিয়ে আসল- অর্থাৎ 'বিন্দু থেকে সিন্ধু'।

বিন্দু. Point
রেখা - Line
অর্ধবৃত্ত ( Semi Circle

একটি বিন্দু থেকে একটি রেখা ঐ বিন্দু থেকে আরেকটি অর্ধবৃত্ত। এই তিনটি চিহ্নের মধ্যেই পৃথিবীর সকল ভাষার সকল বর্ণ নিহিত আছে। তা কিভাবে দেখুন:

ব-৪টি রেখা
ক-৪টি রেখা ও ১টি অর্ধবৃত্ত
র-৪টি রেখা, ১টি বিন্দু
ঝ-৬টি রেখা
ধ-৪টি রেখা,১টি অর্ধবৃত্ত
ঋ-৬টি রেখা, ২টি অর্ধবৃত্ত
ঙ-৩টি অর্ধবৃত্ত, ১টি বিন্দু
A-৩টি রেখা
B-১টি রেখা,২টি অর্ধবৃত্ত
C-১টি অর্ধবৃত্ত, ১টি বিন্দু।

শর্ত হলো- বিন্দু কখনো ছোট হবে আবার কখনো বড় হবে। রেখা কখনো ছোট হবে কখনো বড় হবে, এমনকি কখনো এঙ্গেলে হবে। অর্ধবৃত্ত কখনো ছোট, কখনো বড়, কখনো হালকা এঙ্গেলে হবে। সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, তোমরা সহজেই দেখতে পারছ যে, বর্ণ যেভাবেই লেখা হোক না কেন, এই ৩টি চিহ্নের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই তোমরা বাংলা, ইংরেজি, আরবি সবকয়টি বর্ণ লিখবে আর এই তিনটি চিহ্নকে মনে মনে ভাববে। দেখবে জীবনে কখনোই তোমাদের মন থেকে এই উদ্ভাবনী বিষয় হারিয়ে যাবে না। তোমরা যদি এই সূত্রকে গভীরভাবে ভাব, তাহলে তোমাদের মনের মধ্যে একটা ভিন্ন চিন্তা বা চেতনার বিকাশ ঘটবে। এই চেতনা থেকেই তোমরা লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে উৎসাহ পাবে। তোমরা মনে রাখবে, মুখস্তবিদ্যা ক্ষণস্থায়ী বিদ্যা আর বুঝার বিদ্যা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যা। এই বিদ্যা থেকে অন্যান্য বিষয়গুলো তোমরা সহজে আয়ত্ত্ব করতে পারবে।

তোমরা নিশ্চই ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম স্যারের নাম শুনেছ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন; তার মধ্যে একটি কথা তোমাদের উদ্দেশ্যে না বলে পারছি না। তিনি বলেছেন, “স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না”। তাই আমি আমার এই ছোট আইডিয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে এই স্বপ্নটুকু তুলে ধরছি মাত্র।

প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, সত্যই তোমাদের এখন ঘরে বসে অবসর সময় কাটানোর কথা নয়। তোমরা তোমাদের নিজের স্বার্থে, তোমাদের ভবিষ্যৎ উন্নতি তথা মঙ্গলের স্বার্থে তোমাদের অবশ্যই লেখাপড়ায় ব্রতী হতে হবে। তাই আর কাল ক্ষেপন না করে তোমরা মনের ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করো। দেখবে, সুন্দর ভবিষ্যৎ আর বেশি দূরে নয়।

“পারিব না এ কথাটি বলিও না আর
একবার না পারিলে দেখ শতবার”।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।

 

: আরও পড়ুন

আরও