করোনার সাথে যুদ্ধে বাংলাদেশ
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২০ | ২১ চৈত্র ১৪২৬

করোনার সাথে যুদ্ধে বাংলাদেশ

রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী ১:৫৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২০

করোনার সাথে যুদ্ধে বাংলাদেশ

কঠিন সময়ের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এটি পুরোপুরি যুদ্ধ অবস্থা আমাদের জন্য। করোনা এমন একটি শত্রু যাকে দেখা যায় না কিন্তু সে আমাদের ঠিকই হত্যা করার ক্ষমতা রাখে। তাই এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধটাও হতে হবে একটু অন্যভাবে। সেটা নিয়েই আজকের ভাবনা।

যেকোনো যুদ্ধে, যুদ্ধ শুরু করার আগে জানতে হয় শত্রুর শক্তি আর দুর্বলতা। সেই সাথে নিজের শক্তি এবং দুর্বলতার সম্পর্কে জেনে রণকৌশল ঠিক করতে হয়। করোনার শক্তি হলো, এটি অসম্ভব দ্রুততায় ছড়াতে পারে। ঘাপটি মেরে ১৪ দিন থাকার সময়েও সে তার সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। প্রধানত হাচি, কাশি, থুথু ও মানুষের স্পর্শ থেকে এটি ছড়ায়। বয়স্ক এবং অসুস্থদের জন্য (যারা বহুমূত্র, শ্বাসকষ্ট বা বক্ষব্যধি রোগে আক্রান্ত) এটি বেশি প্রাণঘাতি। এর দুর্বলতা হলো এটি বায়ু বা পানিবাহিত ভাইরাস না। এটির কোনো প্রতিষেধক নেই, সত্যি বলতে তেমন কোনো চিকিৎসাই নেই। প্রতিরোধই একমাত্র অস্ত্র আমাদের হাতে।

এখন বাংলাদেশের অবস্থা কি? যেহেতু যুদ্ধটা রোগের সাথে তাই এখানে মূল কমান্ডার ইন চিফ হলেন আমাদের ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত মানুষেরা। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু এটাকে এখন অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না। এর মাঝেই যুদ্ধ চালাতে হবে।

কিন্তু বললেইতো আর যুদ্ধ করা যাবে না। এমনিতেই আমাদের সৈন্য সংখ্যা (মানে ডাক্তার, নার্স) কম। তাই আমাদের খুব হিসেব করে তাদের ব্যবহার করতে হবে। এদের হাতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট অস্ত্র দিতে হবে। এখানে অস্ত্র বলে বোঝানো হয়েছে, ডাক্তার ও নার্সদের পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট) আর করোনা টেস্টিং কিট। এর মধ্যেই সরকার গণস্বাস্থ্য সংস্থাকে করোনা টেস্টিং কিট বানাবার অনুমতি দিয়েছে যেটি খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমরা দেখতে পারছি পিপিই-এর ক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চরম রকমের ব্যর্থ।

করোনাতে এখন পর্যন্ত দেশে দুজন রোগী মারা গিয়েছেন। অথচ এর মাঝে ৯ জন ডাক্তারকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হয়েছে আমাদের। এই অনুপাতে চললে ৭ দিনের মাঝে শুধু চিকিৎসকের অভাবে কতো মানুষ মারা যাবেন সেটা বলা মুসকিল। আর মনে রাখতে হবে এখন মানুষ শুধু করোনার জন্য হসপিটালে যাবে এমন নয়। অন্য রোগেও ( ডেঙ্গু, হার্ট এটাক ইত্যাদি) যাবেন এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকে মারাও যাবেন। রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো ডাক্তারই যদি না থাকে আমাদের হাতে, যদি আমরা আমাদের ডাক্তারদের রক্ষা করতে না পারি তাহলে এই মৃত্যুর মিছিল জ্যামিতিক হারে বাড়বে।

আমাদের এটা মানতেই হবে করোনার সাথে এটি আমাদের যুদ্ধ। আর যুদ্ধের সময়ে কার দোষ আর কার গুণ এটার ব্যবচ্ছেদের সময় নয়। আমাদের ডাক্তারদের পিপিই লাগবে। এক্ষনি লাগবে। এটা সরকারের দায়িত্ব যোগাড় করা। আমাদের নিজেদের টেকনোলজিতে বানাতে পারলে ভালো (পারার কথা। এটি রকেট সাইন্স হবার কথা না)। নাহলে আমদানি করতে হবে। সেটিও এক্ষনি। কোনো ‘রেড টেপ’ এর বাধা কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেনো আমাদের গতিকে ধীর করে ফেলতে না পারে। যত খরচই হোক আমাদের লাগবে। এক্ষনি।

এখানে ১৭ কোটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন। এই ১৭ কোটি মানুষের মাঝে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, অধ্যাপক, ডাক্তার, পুলিশ, সচিব, রিকশাওয়ালা সবাই আছেন। তাই আমাদের দুদিনের মাঝেই যেভাবে হোক এসব যোগাড় করতে হবে। কেনো ৩ মাস সময় পাবার পরেও থানা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পিপিই ও টেস্টিং কিট পৌঁছায় নাই। কেনো এত সময় পাবার পরেও করোনার জন্য ইমার্জেন্সি রেসপন্স কি হবে তা ঠিক করা হয় নি। আর কেনই বা শুধু আল্লাহর ওপরে ভরসা করে আল্লাহর দেয়া মহামারির বিধান না মেনে (কেউ মাহামারির জায়গায় যাবে না, সেখান থেকে কেউ আসবেও না) আমরা মনের সুখে ঘুরে বেড়িয়েছি সেসব নিয়ে দেশ এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে ভাবা যাবে। যুদ্ধের সময়ে আমরা মিনিটে হিসেব করি। দিনে কিংবা মাসে না। এক মিনিট আগে ব্যবস্থা নিলে হয়তো ১০০ মানুষ বেঁচে যাবে। ১০০ জন মানুষ। তাদের পরিবার। সংখাটা কোনোভাবেই কম না।

করনার সাথে অন্য দেশের যুদ্ধ দেখে আমরা যা বুঝতে পেরেছি সেটি হোলো এখানে জিততে গেলে লকডাউনে যেতেই হবে। চীন, ইউরোপ, ইরান, আমেরিকা, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া সবাই লকডাউনে যাবার পরেই কিছুটা যুদ্ধে জেতা শুরু করেছে। তাই লকডাউন আমাদের করতেই হবে। কথা হলো কবে? ৫০ লাখ, এক কোটি মানুষ আক্রান্ত হবার পরে? নাকি তারা আক্রান্ত হবার আগে???

অবশ্যই লকডাউনের সাথে অর্থনীতি ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। ৭০% মানুষ এখনো দৈনিক আয়ের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এটি করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় নেই। যত দেরি করবো ততই আমাদের বিপদ বাড়বে। জীবনের ওপরে এবং অর্থনীতির ওপরেও। এখন ১৫ দিনের লকডাউন হতো কোটি মানুষকে সংক্রামণ থেকে বাঁচাবে যেটি পরে ৩০ দিনের লকডাউনেও সম্ভব হবে না। সাথে সাথে বাড়তে থাকবে অর্থনৈতিক ক্ষতিও।

আমাদের সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামাতে হবে। এমন জরুরি অবস্থার জন্য তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আমাদের যে স্বল্প সম্পদ আছে তা নিয়েই আমাদের ঝাপিয়ে পরতে হবে।

করোনার সাথে যুদ্ধে মোটামোটি সমতা আনতে হলেও যা বলা হোলো তার সাথে আরো কিছু কাজ করতে হবে এখনই। পারলে আজ রাত থেকেই।

১। জরুরি বা অত্যবশ্যকীয় সার্ভিস বাদে সকল অফিস বন্ধ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

২। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। ডেডিকেটেড নম্বর থাকবে, অনেকগুলো, এলাকাভিত্তিক। সেখানে কল করে বের হবার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি মেসেজ আকারে আসবে। রাস্তাতে পুলিশ সেই মেসেজ দেখতে চাইতে পারে। না দেখাতে পারলে জরিমানা।

৩। সকল প্রকার জমায়েত (৪০ জনের বেশি) বন্ধ। বিয়ে ,জন্মদিন, চল্লিসা, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সমাবেশ, মিলাদ, দোয়া মাহফিল আগামী ১৫ দিন বন্ধ।

৪। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান বাদে সকল শপিংমল বন্ধ ১৫ দিন। এরপরে দরকারে ক্ষতিপূরণের জন্য পরের ১ /মাস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হবে।

৫। করোনা পরীক্ষা করা শুরু করতে হবে রাত দিন কম করে ১০০০০ মানুষের পরীক্ষা করার সক্ষমতা রাখতে হবে।

৬। সরকারি বেসরকারি সকল হসপিটাল, ক্লিনিক এ অন্তত পক্ষে ৩০% বেড আইসোলেসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা কঠিন কিছু না। জানি আইসিইউ এর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই মন্দের ভালোর ব্যবস্থা।

৭। ধরে নিতে হবে আমাদের অন্তত ৫০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হবে আগামী ৭ দিনে। সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে| এখনই। আজই।

আতংকের কিছু নেই। তাই বলে গাছাড়া দিয়ে বসে থাকারও কিছু নেই। একটা বিপর্যয় শুরু হচ্ছে সেটাকে কমাতে হবে। যতটা পারা যায়। চেষ্টার যেনো কমতি না থাকে।

বঙ্গন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আর একবার আমাদের জাতীয়ভাবে এক হয়ে সবাই মিলে সবার জন্য কাজ করার সুযোগ এসেছে। এখানে এককভাবে কেউই সুরক্ষিত থাকবে না। আপনার সুরক্ষা নির্ভর করছে আপনার বাসার ড্রাইভার বা আপনার কাস্টমার বা আপনার বন্ধুর সুরক্ষার ওপরে। এখানে বেঁচে থাকতে হলে সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হবে। তাই আসুন সবাই মিলে চেষ্টা করি এই যুদ্ধটি জিততে।

আমাদের একটু সচেতনতা আর সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই আমাদের যুদ্ধে এগিয়ে থাকার পাথেয় হতে পারে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও