রাজনৈতিক সংবর্ধনায় কেন রাজনৈতিক দলে বিভক্তি?
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

রাজনৈতিক সংবর্ধনায় কেন রাজনৈতিক দলে বিভক্তি?

এখলাসুর রহমান ১২:১৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৬, ২০২০

রাজনৈতিক সংবর্ধনায় কেন রাজনৈতিক দলে বিভক্তি?
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব সাজ্জাদুল হাসানের রাজনীতিতে আগমন উপলক্ষে সংবর্ধনাকে ঘিরে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে টানটান উত্তেজনা৷ পাল্টাপাল্টি মিছিল,হামলা ও সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগে আবার বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে ৷

উপজেলা  আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের ৫০ জন সদস্যের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সংবর্ধনায় যোগ দেয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি লতিফুর রহমান রতনকে সভাপতির দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দিয়ে সহসভাপতি শামছুর রহমান মাষ্টারকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছে৷

আবার এই অব্যাহতি দানকে অগঠতান্ত্রিক ও অবৈধ বলে সভাপতি লতিফুর রহমান রতনের পক্ষ মোহনগঞ্জ সাধারণ পাঠাগারে সংবাদ সম্মেলন করেছে৷

এ নিয়ে এলাকাজুড়ে চলছে এক থমথমে বিভাজনের রাজনীতি৷ সংবর্ধনার আয়োজনকারী নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক থানা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হকের ছেলে মেহেদুল হাসান আশিকের (২৮) উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও ঘটেছে৷ এর প্রতিবাদে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের উদ্যোগে  প্রতিবাদ মিছিলও  হয়েছে।এ ঘটনায় থানায় মামলাও  হয়েছে।

সংসদ নির্বাচনের আরও ৪ বছর বাকি৷ এখনই কেন সাজ্জাদুল হাসান দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন এমন কথা প্রচার হল? তিনি একসময় ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন৷ তিনি এলাকায় আলোচিত ও পরিচিত হন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব ১ ও প্রধানমন্ত্রীর  কার্যালয়ের সচিব হওয়ার পর৷ এলাকার বেশকিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাজ্জাদুল হাসানের ভূমিকা রয়েছে৷

সরকারি বরাদ্দ ছাড়করণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব থাকার সুবাদে তিনি ভূমিকা রাখতে পেরেছেন৷ কিন্তু এই বরাদ্দগুলোর কতটা যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ৷ এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ কি রাজনীতিতে প্রবেশ?

তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব হতে অবসরে গিয়ে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন৷ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখা কিংবা বিমানের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার জন্য এলাকার মানুষ অবশ্যই সংবর্ধনা দিতে পারে৷ কিন্তু রাজনীতিতে আগমনের সংবর্ধনা কী করে হয়?

তাও আবার তিনি যে দলে যোগ দেবেন সে দলের উদ্যোগে নয় তা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও সম্মিলিত নাগরিক সমাজের আয়োজনে৷ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এখন কোন কমিটি নেই৷ এর দায়িত্বে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আর সম্মিলিত নাগরিক আন্দোলন সর্বদলীয়৷  তিনি যোগ দেবেন ১৪ দল তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অথচ সংবর্ধনায় নেই আওয়ামী ও ১৪ দলের কোন শরীক!

এক সংবর্ধনার পোস্টার হল দুই ধরনের৷ একটিতে প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক  সম্পাদক অসীম কুমার উকিল  ও প্রধান বক্তা সাংগঠনিক সম্পাদক  শফিউল আলম নাদেল৷ এমন প্রশ্নও কেউ কেউ করছেন যেখানে সাংগঠনিক সম্পাদক উপস্থিত সেখানে প্রধান অতিথি সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয় কী করে? যেহেতু বিষয়টা রাজনীতিতে আগমনের সংবর্ধনা৷  কিন্তু পোস্টারে জেলা উপজেলার নেতা কিংবা এমপির নাম ছিলো না৷ আবার আরেকটি পোস্টারে ছিল কেবল আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নাম৷ পরবর্তীতে কী ঘটলো প্রধান অতিথি ও প্রধান বক্তা আসলেন না৷ সাজ্জাদুল হাসান এলাকায় আসলেন সরকারি প্রটোকলে৷ তিনি বিমানের চেয়ারম্যান কিন্তু তার প্রটোকল চেয়ে আবেদনে স্বাক্ষর করলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা। এটা বিধিসম্মত কিনা এ নিয়েও কথা উঠছে৷ আরও কথা উঠছে সরকারি প্রটোকলে রাজনৈতিক সংবর্ধনা নিতে পারেন কিনা?

আরও কথা উঠছে একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়ে কেন এত হুলস্থূল? কেউ বলছেন একজন সজ্জন মানুষ হিসাবে ও দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকার জন্য জনগণের কাছে তার একটা ইতিবাচক ইমেজ সৃষ্টি হয়েছিল৷ তিনি রাজনীতিতে আসলে আসতেও পারেন৷ এলাকার এমপি ও যে দলে আসবেন সে দলের ঐক্যমত ছাড়া এমন বিতর্কিত ও সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সংবর্ধনার কী প্রয়োজন ছিল?

যদিও আমলাদের রাজনীতিতে আগমনকে অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না৷ তবে কেউ রাজনীতি ও জনবান্ধব হয়ে উঠলে ব্যতিক্রমভাবে আসতেও পারেন৷ সাজ্জাদুল হাসান হয়তো তেমন একজন ব্যতিক্রমই হয়ে উঠতে চাইছেন৷ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও অবসরে যাওয়া সেনা কর্মকতায় সংসদ ভরে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের জন্য এটা শুভ নয়। সংসদ হবে সমস্ত রাজনীতিবিদের জন্য, অন্য কারও জন্য এই সংসদ হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতাকর্মী যখন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন, তখন এই ব্যবসায়ী-আমলারা কোথায় ছিলেন? বরং অনেককে তখন দেখেছি আইয়ুব খানের পক্ষাবলম্বন করতে।

আমলাদেরকে রাজনীতিতে স্বাগতম জানানোর আগে তাই তাদের অতীত বিচার করা উচিত৷ আর দুয়েকটা ব্যতিক্রম বাদে ঢালাওভাবে আমলাদের রাজনীতিতে প্রবেশ রাজনীতির জন্য শুভ হতে পারে না৷ এটাও দলকে ভাবতে হবে৷ রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকাই উচিত নয় কি? কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়ও কি রাজনৈতিক দলের নয়? ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত আমলায় সংসদ ভরে যায় তখন রাজনৈতিক দল কি ঘুমায়? দলের অনুমোদন ছাড়া কি কেউ নেতা হতে পারে? আমলাকে দল নেতা মেনে নিলে কার কী এসে যায়?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিবের দায়িত্বপালনের সুবাদে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্টজন হয়ে ওঠায় সাজ্জাদুল হাসানের রাজনীতিতে আসার অভিপ্রায় জেগে ওঠে৷ গত নির্বাচনে নেত্রকোনার কলমাকান্দা দুর্গাপুর আসনের এমপি মনোনয়নটিও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্টজন হয়ে ওঠার যোগ্যতাতেই হয়৷কেউ কেউ বলছেন, মানু মজুমদারের তুলনায় সাজ্জাদুল হাসান অনেকবেশী যোগ্য সজ্জন ও জনবান্ধব৷ সাজ্জাদুল হাসানের কতিপয় অনুসারী হয়তো সেজন্যই তাকে বর্তমান এমপি রেবেকা মমিনের স্থলাভিষিক্ত ভাবতে শুরু করে৷ নির্বাচন আরও ৪ বছর পরে এত আগাম এমন ভাবনা কি সঠিক বিবেচিত হল?

রাজনৈতিক সংবর্ধনায় দলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ব্যাতিরেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি কেন গেলেন?তিনিতো এতদিন রেবেকা মমিন এমপিরই এক নম্বর ঘনিষ্টজন ছিলেন৷ তবে এখন কেন বিরোধ লেগে গেল? সাজ্জাদুল হাসান কি আওয়ামী লীগের সদস্য?

আর সদস্য হলে কোন কমিটির? ২০০৬ সালে এমপি মনোনয়ন পেতে চাইছিলেন সাজ্জাদুল হাসানের বড় ভাই ওবায়দুল হাসান৷ পরবর্তীতে তিনি বিচারপতি নিযুক্ত হলে রাজনীতি হতে দূরে সরে যান৷ বেশকিছু যুদ্ধাপরাধীর বিচারের  রায় দিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি৷  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হওয়ার আগে সাজ্জাদুল হাসান কোন আলোচনায় ছিলেন না৷

এককথায় এমন বিতর্কিত সংবর্ধনা না নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচেষ্টা ও গণসংযোগ অব্যাহত থাকলে হয়তো তিনি রাজনীতিতে আসলে আসতেও পারতেন৷ রাজনীতিতে আসতে হলে সর্বাগ্রে আস্থা অর্জন করতে হবে যে দলে আসতে চান সে দলের৷ কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টোটা৷ আগে হয়েছে গণসংবর্ধনা৷ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্ব হতে অবসরে গিয়ে মুজিব কোট গায়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয় ও টুঙ্গিপাড়ায় গেলেই কি রাজনীতিতে যোগদান হয়?

আর এতেই কিছু অতিউৎসাহী লোক তাকে বর্তমান এমপি রেবেকা মমিনের স্থলাভিষিক্ত ভাবতে শুরু করল!গণসংবর্ধনার পোস্টার ছেপে দিল৷ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়ে গেল প্রধান অতিথি ও সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে গেল প্রধান বক্তা৷ এই দুজন কি এভাবে পোস্টারে নাম লেখার অনুমোদন দিয়েছিলেন না সেটাও অতিউৎসাহীদের কাণ্ড? নইলে পরবর্তীতে তারা কেন সংবর্ধনায় আসলেন না? এভাবে গণসংবর্ধনা দিয়ে খোদ রাজনৈতিক দলকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়া কীসের ঈঙ্গিত? এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগের রাত হতেই মোহনগঞ্জের আওয়ামী লীগ বিভাজনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ পরবর্তীতে সংবর্ধনায় যোগ দেয়া উপজেলা সভাপতির বিরুদ্ধে মিছিল করে সংবর্ধনায় যোগ না দেয়া পক্ষ৷

এখানেই থেমে থাকলো না৷ সভাপতিকে পদ হতে অব্যাহতি দিয়ে জেলা ও কেন্দ্রে চিঠি দিল৷ নতুন একজনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও দেয়া হল৷ বিভক্ত হয়ে গেল শহীদ মিনারে দেয়া ফুলের তোড়াও৷ এই বিভক্তির দায় কার? এলাকাটি সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠার দায় কার? সভাপতির অব্যাহতি দানের সিদ্ধান্ত ও এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ উভয়ের আলোকেই কেন্দ্র কি পারবে এলাকাটিকে সংঘাতমুক্ত করতে? এই বিরোধ যত বেশিদিন থাকবে ততবেশি তা আরও  জটিল কুটিল ও উত্তপ্ত হবে৷ এই বিরোধ অবসানে কেন্দ্রের উচিত অতি দ্রুত গঠনতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেয়া৷ উচিত কমিটি বাতিল করে কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যবস্থাগ্রহণ৷ এই একমাত্র সমাধানটিকে কেন্দ্রের হেলাফেলা করে তাকে জিইয়ে রাখা হবে মহাভুল৷ শান্তিকামী দলীয় নেতাকর্মীর প্রত্যাশা কেন্দ্র দ্রুত এই ব্যবস্থা নেবে৷

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

: আরও পড়ুন

আরও