ভাষাসৈনিকের কবর দখল করে কেন ট্রেনিং সেন্টার?
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২০ | ২৬ চৈত্র ১৪২৬

ভাষাসৈনিকের কবর দখল করে কেন ট্রেনিং সেন্টার?

এখলাসুর রহমান ২:৩৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০

ভাষাসৈনিকের কবর দখল করে কেন ট্রেনিং সেন্টার?

ভাষাসৈনিকের জায়গা দখল, ওয়াকফকৃত মাজারের জায়গা দখল, ভাষাসৈনিকের পরিবারকে হুমকি, পরিচালনা বোর্ডের স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাবলম্বীর এক কর্মীর রহস্যজনক আত্মহত্যা প্রভৃতি বিষয়ে তথ্যানুসন্ধানের সত্যতা যাচাই করতে দেয়া তথ্য অধিকার আইনে দেয়া চিঠির উত্তর দিলো না স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি৷

গত বছর ১২ ডিসেম্বর তথ্য অধিকার আইনে বাংলাদেশ গেজেটের ফরমে স্বাবলম্বীর নির্বাহী পরিচালক বরাবরে আমার স্বাক্ষরিত এই চিঠিটি প্রেরিত হয়৷ ১৫ ডিসেম্বর চিঠিটি তারা পান৷

চিঠিটিতে নিচের তথ্যগুলো জানতে চাওয়া হয়:

(১) ২৬ অক্টোবর,২০১৬ দৈনিক খবরপত্র পত্রিকায় একটি সংবাদের শিরোণাম হয়েছেঃনেত্রকোনায় দরবারে খাজা গরিবে নেওয়াজ মাজার দখল করে স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির ট্রেনিং সেন্টার৷ এই সংবাদ সূত্রে নেত্রকোনা সদরের পশ্চিম মালনী গ্রামের ভাষা সৈনিক আব্দুল গনির ছেলে ফরিদ মিয়ার সাথে কথা বললে তিনি বলেন, স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি তার ৬০ শতক জায়গা দখল করে ফেলেছে৷ দখলকৃত জায়গার মধ্যে ভাষা সৈনিকের কবরস্থান ও খাজা গরিবে নেওয়াজের নামে ওয়াকফকৃত ভূমিও রয়েছে৷ সংবাদপত্রে লিখেছে নেত্রকোনা পৌরসভার অনুমতি ছাড়াই নির্মিত হয়েছে এই ট্রেনিং সেন্টার৷ এ প্রসঙ্গে স্বাবলম্বীর বক্তব্য কি?

(২) ভাষাসৈনিক আব্দুল গনির কবরস্থানে তার পরিবারকে যেতে দেয়া হয় না বলে পরিবারের অভিযোগ৷ কবরস্থানে বেড়া দিতে গেলে স্বাবলম্বীর কর্মকর্তা কাজী ছুহুল আহমদ দিলু ও আব্দুল কুদ্দুস তাকে বাধা প্রদান করেছে বলে অভিযোগও রয়েছে৷ এই দুই কর্মকর্তা ফরিদ মিয়ার বসতভিটা দখলেরও চেষ্টা চালিয়েছে পরবর্তীতে এলাকাবাসীর হস্তক্ষেপে ফরিদ মিয়া তার বসতভিটা ফিরে পায়৷ এর সত্যতা ও অসত্যতা সম্পর্কে স্বাবলম্বীর  বক্তব্য কি?চিঠিটিতে আরও জানতে চাওয়া হয়।

(৩) ভাষাসৈনিক আব্দুল গনির ছেলে ফরিদ মিয়ার কাছ থেকে স্বাবলম্বী কোন ভূমি ক্রয় করেছে? ক্রয় করলে এর পরিমাণ কত ও কত সালে? পরবর্তী ক্রমিকে চাহিত তথ্য ছিল (৪) ২০০৫ সালে স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির  জান্নাত নামের একজন কর্মী মোহনগঞ্জ অফিসে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল৷ জানা গেছে, নেত্রকোনা অফিস হতে বদলী হয়ে মোহনগঞ্জ অফিসে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে৷ এই আত্মহত্যার পেছনের কারণ সম্পর্কে স্বাবলম্বীর বক্তব্য কী?

(৫) স্বাবলম্বীর পরিচালনা বোর্ডের কতজন সদস্য?

নির্বাহী পরিচালকের অনুপস্থিতিতে স্বপন কুমার পাল স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে৷ জামালপুর শাখায় অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করতো আব্দুল হালিম অপু৷ স্বপন পালের নির্দেশে সেখানকার ম্যানেজার সাবিনা ইয়াসমিন তাকে অফিসে যেতে নিষেধ করে৷

অতঃপর আব্দুল হালিমের ভগ্নিপতি স্বপন পালকে ফোন দিয়ে বিষয়টা বুঝতে চাইলে তিনি বলেন,এটা একটা সাময়িক সিদ্ধান্ত৷ দায়িত্বেতো আমিই আছি সমস্যা নেই তাকে পাঠান৷ তার কথা মত আব্দুল হালিম হেড অফিসে গেলে কাজী ছুহুল আহমদের উপস্থিতিতে স্বপন পাল আব্দুল হালিমকে বলেন তুমিতো বড় বড় লোককে দিয়ে ফোন করাও৷ রুক্ষ রুক্ষ কথা বলে কোন ফায়সালা না দিয়েই তাকে বিদেয় করে দেয়া হয়৷ নির্বাহী পরিচালক দেশে এলে আবার তাকে চাকরিতে যোগ দিতে বলা হয়৷

এ সম্পর্কে স্বাবলম্বীর কী বক্তব্য? আর মৌখিক কথার ভিত্তিতে কি কারও চাকরি চলে যেতে পারে? আব্দুল হালিমের চাকরি কি আছে না নেই? চিঠিটিতে চাহিত আরও তথ্য ছিল।

(৬) সম্ভাব্য সাল ২০০৮ সাল৷ স্বাবলম্বী কর্তৃক একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়৷ এতে একজন আবেদনকারী বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন দাখিল করে৷ অতঃপর তাকে ইন্টারভিউ বোর্ডেও ডাকা হয়৷

এরপর বোর্ডে স্বপন পাল আবেদনকারীকে বলেন, এটাতো স্নাতক পাশের পোস্ট আপনিতো এইচএসসি পাশ৷ অতঃপর আবেদনকারীকে চলে যেতে বলা হয়৷ এখন কথা হলো স্নাতক পাশের পোস্ট হলে তাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে ডাকা হল কেন?কেন স্ক্রুটিনিতেই তাকে বাদ দেয়া হলোনা?এটা কি একজন বেকারকে অহেতুক বিব্রত করা নয়?এ প্রসঙ্গে স্বাবলম্বীর বক্তব্য কি?

বাংলাদেশ গেজেটের ফরম অনুযায়ী আবেদন করেও তথ্য ও তথ্য সরবরাহের অপারগতার নোটিশ কোনটাই দেয়নি স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি৷ এই চিঠিটি আমার স্বাক্ষরিতই প্রেরিত হয়েছিল৷ সরকার যেহেতু দেশে তথ্য অধিকার আইন পাশ করেছে সেই সূত্রেই এই চিঠি প্রদান করেছিলাম৷ কিন্তু স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি নামক এনজিওটি এই চিঠির নূন্যতম কোন গুরুত্ব দেয়নি৷ 

তথ্য না দিতে পারলে তথ্য সরবরাহের অপারগতার নোটিশ দেবে সেটাই আইনী রীতি নয় কি? বাংলাদেশ গেজেটে সেই আবেদনের ফরমও দেয়া আছে৷ তবে কি ভাষা সৈনিকের জায়গা দখলের অভিযোগ সত্যি?সত্যি ভাষা সৈনিকের পরিবারকে বাস্তভিটা করার অভিযোগ?জান্নাত নামক যে মেয়েটি আত্মহত্যা করল তার রহস্য কি?নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রে জনশ্রুতি রয়েছে নির্বাহী পরিচালকের এক নিকটাত্মীয় কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছিল এই জান্নাত৷

আসলে নারীর অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের নামে কী ঘটছে স্বাবলম্বীতে৷ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নামে স্বেচ্ছাচারিতা ও বেকার হয়রানি তাও কি সত্যি?সত্যি কি পরিচালক স্বপন পালের স্বেচ্ছাচারিতা?সত্যি কি পরিচালক কাজী ছুহুল আহমদ দিলুর ভাষা সৈনিকের পুত্র ফরিদ মিয়াকে হুমকির অভিযোগ?

সত্যি কি খাজা গরিবে নেওয়াজের মাজারের নামে ওয়াকফকৃত জায়গা দখলের অভিযোগ? সত্যিই কি নেত্রকোনা পৌরসভার নির্দেশ অমান্য করে মাজারের জায়গা দখলের অভিযোগ? চাহিত তথ্যগুলো অসত্য হলে স্বাবলম্বী কেন তবে তার জবাব দিলো না?

ভাষার জন্য জীবনদানকারীরা পৃথিবীব্যপী সম্মানিত৷ এ দিবসটি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে৷ অথচ নিজ দেশেই ভাষাসৈনিকের কবরস্থানে হলো ট্রেনিং সেন্টার৷ এলাকাবাসীতো নয়ই তার কবরে ফুল দিতে যেতে পারে না তার পরিবারও৷  আর এতে নির্বিকার থাকে সচেতন মহল ও প্রশাসন! স্বাবলম্বীর এত খুঁটির জোর কোথায়?

২০/২/২০২০ তারিখে তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক বরাবরে৷ তিনি কি পারবেন আইন অনুযায়ী তথ্য অধিকার আইন লংঘনের বিষয়ে স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করতে?তিনি কি পারবেন ভাষাসৈনিকের কবরস্থান হতে ট্রেনিং সেন্টার সরিয়ে সরকারি উদ্যোগে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করতে?

তিনি কি পারবেন ভাষাসৈনিকের পরিবারকে তার পৈত্রিক ভূমি ফিরিয়ে দিতে?তথ্য অধিকার আইন ও তথ্য কমিশনের কী ধরনের  ভূমিকা নেয়ার কথা রয়েছে সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তথ্য প্রদানে অনুপ্রাণিত করতে?

স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির হেড অফিস নেত্রকোনাতেই৷ জনশ্রুতি রয়েছে নির্বাহী পরিচালকের আত্মীয়-স্বজন দিয়েই গঠিত হয়েছে এর পরিচালনা বোর্ড৷ এখানে যোগ্যতার চেয়ে আত্মীয় প্রীতির স্বজন সিন্ডিকেটের হাতেই ক্ষমতার মূল৷ পরিচালনা বোর্ডে কারা আছে তাও জানা সম্ভব হল না৷ অথচ তা জানা জরুরি৷ বেসরকারি সংস্থা বলে তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘন করবে? স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভাকে অমান্য করবে?

ভাষার মাসেও ভাষাসৈনিকের পরিবারটি এই সংস্থাটির জন্য  কবরে যেতে পারবেনা এটা কেমন কথা হল?

আমাদের দাবী অবিলম্বে ভাষাসৈনিকের কবরস্থান দখলমুক্ত করে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হোক৷ প্রতিকার করা হোক ভাষাসৈনিকের পরিবারকে হুমকির৷

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও