করোনা ভাইরাস : সতর্কতা জরুরি
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২০ | ২৬ চৈত্র ১৪২৬

করোনা ভাইরাস : সতর্কতা জরুরি

শফিকুল ইসলাম ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

করোনা ভাইরাস : সতর্কতা জরুরি

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত চীন। আশপাশের দেশগুলোর অধিবাসীদের মধ্যেও বিরাজ করছে আতঙ্ক। আমি উহান শহরে অবস্থান করছিলাম ৬ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত। সে সময়েই উহান শহরে করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তখনো এত বিভীষিকা ছিলনা, ছড়িয়ে পড়েনি করোনা। অবস্থার প্রেক্ষিতে আমি দেশে ফিরে আসি ৬ জানুয়ারি রাতে।

দেশে ফেরার পর আমি খোঁজ নেই। আমার পরিচিত সহপাঠীরা ওখানে যারা আটকা পড়েছে, এমন শুনেছি তারা শুধু ডাল-ভাত খেয়েই দশদিন রুমের ভেতর থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ বের হলেই ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা। এই লেখা যখন লিখছিলাম, তখন জানতে পারলাম, এখন রুম থেকে বের হওয়া একেবারেই নিষেধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবুও খুব বিশেষ প্রয়োজনে কেউ বের হতে চাইলে অবশ্যই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

পৃথিবী ব্যাপী করোনা ভাইরাস আজ এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সর্বত্র জরুরি অবস্থা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। হাতে নিয়েছে সচেতনতা কার্যক্রম। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে সামুদ্রিক বাজারে প্রথম করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে ২০১৯-নোভেল করোনা ভাইরাস। এটি সার্স ভাইরাসের সমগোত্রীয় করোনা ভাইরাস। বিশেষজ্ঞরা মনেকরছেন, এটি সার্স ও ই-বোলার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। করোনা ভাইরাস একটি মারাত্মক মরণ-ব্যাধি ভাইরাস এবং এটি খুবই ছোঁয়াচে। এক মানব দেহ থেকে হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে অন্য মানব দেহে প্রবেশ করে। ইতোমধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭০০০ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। চীনছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, কানাডাসহ প্রায় ২৫টি দেশের মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। চীন সরকার করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য মাত্র ০৬ দিনে হাসপাতাল নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশের পক্ষেও নির্মাণ করা কঠিন। এই বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে।

অতএব, সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কোন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দায়িত্বে অবহেলা করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। কারণ বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। কোন একজন আক্রান্ত হলে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থল ও নৌ-বন্দরে আসা দেশি ও বিদেশি মানুষের স্ক্যানিং ও অন্যান্য শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা উচিত। অন্য কোন দেশের লোক পরীক্ষার পর সন্দেহ হলে বা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাকে ঐ দেশে ফেরত পাঠানো উচিত।
করোনা ভাইরাসে প্রভাবিত হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। করোনা ভাইরাসের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ০৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে ও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে প্রধান প্রধান শেয়ারবাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সোমবার ২৭/০১/২০২০ইং তারিখে ২.৩ শতাংশ কমে ০৩ তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার প্রধান ৩টি সূচকে দরপতন হয়েছে ১.৫ শতাংশের বেশি। করোনা ভাইরাস এমন সময়ে চীনে আবির্ভাব হয়েছে যার ফলে চীনসহ অন্যান্য দেশের পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

উল্লেখ্য যে, চীনে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় চার হাজার মার্কিন ডলার। এবার করোনা ভাইরাসের কারণে এর ক্ষতির পরিমাণ আরও অধিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণঃ
করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি, কাশিরমত সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও :

মূল শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হওয়া
জ্বর হলো ১০০ ফারেনহাইটের বেশি।
শুকনো কাশি, বুকে সর্দি ও কফ জমা।
বয়স্কদের জন্য হতে পারে নিউমোনিয়া।
বুকে ব্যথা অনুভব করা।
দেহের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া।

করণীয়ঃ
করোনা ভাইরাসের প্রতিকারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শ্বাসকষ্ট হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
বাহিরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা।
সংক্রমণ ছড়ায় এমন প্রাণি হতে দূরে অবস্থান করা।
মাছ, মাংস, ডিম ভালোভাবে সিদ্ধ করে খাওয়া এবং খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ভারি কাজ করা থেকে বিরত থাকা।
হাঁচি কাশির সময় নাক ঢেকে রাখা।
ঠাণ্ডা ও ফ্লু আকান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকা।
যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বা ভাইরাস বহন করছে তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
জনসমাগম স্থান পরিহার করে চলা।
প্রতিবার সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ডের বেশি সময় নিয়ে হাত ধোয়া।
বেশি বেশি করে পানি পান করা।
চোখ, নাক ও মুখ থেকে হাত দূরে রাখতে হবে। বাইরে থেকে ফিরে হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করা।
ধূমপান বর্জন করতে হবে এবং ধূমপান এলাকা থেকে দূরে থাকতে হবে।

সর্বোপরি বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আশকোনার হজ ক্যাম্পে নতুন শঙ্কায় উহান ফেরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। হজ ক্যাম্পে যে পরিবেশে প্রায় ৩১২ জন শিক্ষার্থীদের রাখা হয়েছে সেটা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে উহান ফেরত শিক্ষার্থীরা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকতে পারে। মানুষকে সতর্ক করার জন্য সরকার ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম চালানো উচিত এবং ভবিষ্যতে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে।

শফিকুল ইসলাম : সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও