বছরে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২০ | ২৬ চৈত্র ১৪২৬

বছরে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার

এম এ খালেক ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০

বছরে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।

এর ফলে রাজস্বের যে ক্ষতি হচ্ছে তার বার্ষিক পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা। টিআইবি প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি কর্মরত রয়েছেন।

এদের মধ্যে পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশে বেড়াতে আসা অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার কর্মী স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান করছে। পর্যটন ভিসায় এসে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তাদের প্রাপ্ত মজুরির পুরোটাই অবৈধভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিদেশি কর্মীদের মাসিক বেতন গড়ে দেড় হাজার মার্কিন ডলার।

সব মিলিয়ে এদের পেছনে প্রতি বছর সাড়ে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ স্থানীয় খরচ বাদ দিলে তারা প্রতি বছর গড়ে ৩১০ কোটি মার্কিন ডলার বা সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। টিআইবি বাংলাদেশ থেকে অবৈধ বিদেশিদের মাধ্যমে টাকা পাচারের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তা পরিপূর্ণ বা সার্বিক তথ্য তা বলা যাবে না। আসলে পাচারকৃত টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।

একটি দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের ভিন্ন দেশে গিয়ে কর্মসংস্থান করা নতুন কিছু নয়। এদের মধ্যে সবাই যে বৈধ পথে বিদেশে গমন এবং কর্মসংস্থান করে তা নয়। অনেকেই আছেন যারা নানা প্রতিকূলতার কারণে বৈধভাবে বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থান করতে পারেন না। তাই তারা সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করেই কর্মসংস্থান করছেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিটেন্স আহরণকারী দেশ। বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থান করছেন। গত অর্থ বছরে তারা ১ হাজার ৬২০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স প্রেরণ করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স প্রেরণ করেছে।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থ বছরে রেমিটেন্স আহরণের পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারে। অর্থনীতির অন্যান্য সূচক নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও রেমিটেন্সপ্রবাহ এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কী কারণ কাজ করছে এটা প্রশ্ন উঠতেই পারে। হঠাৎ করেই কি বাংলাদেশিদের বিদেশ গমনের হার বেড়ে গেল? নাকি বিদেশে বাংলাদেশিদের উচ্চ বেতন-ভাতা প্রদান শুরু হয়েছে?

এ দুটোর কোনোটিই ঘটেনি। আগে যারা বিদেশে গিয়েছিল তাদের অনেককে বরং এখন দেশে পাঠানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোই হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য। এসব দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে। তারা নতুন উন্নয়ন কাজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ রেখেছে। তারপরও বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিটেন্স বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণ কাজ করছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈধ পথে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠানো উৎসাহিত করার জন্য ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এখন কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি ১০০ মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করলে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরো ২ ডলার বেশি অর্থাৎ মোট ১০২ মার্কিন ডলার পাচ্ছেন।

রেমিটেন্স বৈধ চ্যানেলে আনার এই যে উদ্যোগ তা বেশ কাজে দিয়েছে। আগে যারা হুন্ডি বা অন্য কোনো মাধ্যমে রেমিটেন্স প্রেরণ করতেন তারা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রেরণ করছেন। ফলে অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক পতনের ধারায় থাকলেও রেমিটেন্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগেও বাংলাদেশিরা প্রচুর পরিমাণ রেমিটেন্স প্রেরণ করতেন। কিন্তু যেহেতু এর একটি বড় অংশই অবৈধ পথে আসত না তাই সার্বিকভাবে রেমিটেন্সের পরিমাণ ততটা বেশি হতো না। বাংলাদেশ থেকে যদি বৈধ পথে আরো বেশি হারে প্রশিক্ষিত জনশক্তি এবং পেশাজীবী বিদেশে প্রেরণ করা যেত তাহলে রেমিটেন্স আয় আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হত।

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশি বাজারে কর্মসংস্থান করছেন তাদের সবাই কি বৈধ পথে বিদেশে গিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। কয়েকদিন আগে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, একটি দেশ থেকে ৮৫ হাজার বাংলাদেশিকে অবৈধ ঘোষণা করে দেশে ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে।

এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যার বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিদেশে কাজ করতে গিয়েছিলেন। আবার অনেকের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। তাই তাদের দেশে প্রেরণ করা হচ্ছে।

সৌদি আরব থেকেও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিকে দেশে ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো অনেককে ফেরৎ পাঠানো হতে পারে। কাজেই কেউ অবৈধভাবে কাজ করাটা নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশিরা অবৈধভাবে কাজ করছেন। এটা বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ প্রবণতা। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে, দেশের নিয়ম-কানুন না মেনেই কাজ করছে।

এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে অন্যত্র। বাংলাদেশ থেকে যারা অবৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গমন করেন তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ শ্রমিক। তাদের বেতন-ভাতাও খুবই সামান্য। যারা বিদেশে গমন করেন তাদের বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত শ্রমিক। তারা যে দেশে গমন করেন সেই দেশের স্থানীয় ভাষাও জানেন না। ফলে বিদেশি গিয়ে তারা নানা সমস্যায় পতিত হন।

বর্তমানে যারা বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছেন তাদের এই প্রবণতা স্বাভাবিক এবং এটা কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে তারা যে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তা বৈধভাবে স্বদেশে পাঠানো হচ্ছে না। ফলে সরকারের যে রাজস্ব পাওয়ার কথা তা পাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা দেশের বাইরে প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের কোনোভাবেই রোধ বা আগমন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

এটা বললে অনেকেই আমার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করবেন। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে প্রথমেই জানতে হবে বিদেশিরা বাংলাদেশে কাজ করতে আসছে কেন বা বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাইবা কেন তাদের কাজ করানোর জন্য আনছেন?

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। বিদেশিদের আগমনের পেছনে কাজ করছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মমুখী নয়। একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির পক্ষে কর্মসংস্থান করা বেশ কঠিন। এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতি তিনজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে একজন বেকার। স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত ব্যক্তিদের মাঝে বেকারের হার তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া যারা উচ্চ শিক্ষা লাভ করছেন তাদের অর্জিত জ্ঞানের গুণাগুণ নিয়েও সংশয় রয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ে প্রচুর সংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু এগুলো পূরণ করার মতো দক্ষ লোক পাওয়া যায় না।

সে তুলনায় যারা বিদেশ থেকে আমাদের দেশে আসছেন তাদের দক্ষতা এবং শিক্ষার কোয়ালিটি আমাদের দেশের মানুষের চেয়ে অনেকটাই উন্নত। ফলে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি উচ্চ শিক্ষিতরা পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো সংরক্ষণবাদের স্থান নেই। অর্থাৎ কোনো কাজ কারো জন্য সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। একমাত্র যোগ্যতাসম্পন্নরাই কাজের সুযোগ পাবে। যেহেতু আমরা যোগ্যতাসম্পন্ন লোকবল সরবরাহ করতে পারছি না তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে এক্সপার্ট ম্যানপাওয়ার সংগ্রহ করছে। এতে দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যারা এসব লোকবল নিয়োগ দিচ্ছেন তাদের নৈতিকতা নিয়ে। তারা কেন এদের ক্ষেত্রে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করছে? তারা কেন বিদেশে এদের পাওনা পরিশোধ করছেন? তারা দেশের প্রচলিত আইনকে কেন ফাঁকি দেবেন? অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি এক্সপার্টগণ ২৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে প্রতি বছর। এর ফলে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান যারা বিষয়টি দেখার দায়িত্বে রয়েছেন তাদের কি কোনোই দায় নেই এখানে? বাংলাদেশে টাকা খরচ করলে বাঘের চোখও কিনতে পারা যায়। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণেই বিদেশি জনশক্তি বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। যারা বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্বে রয়েছেন। এজন্য বেতন-ভাতা নিচ্ছেন তাদের কি কোনো জবাবদিহি নেই? এদের জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তারা কারখানা পরিদর্শনের জন্য গিয়ে কী করেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কারখানা মালিকদের নিকট থেকে অর্থ নিয়ে সব অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

আমরা যদি বিদেশি অবৈধ এক্সপার্টদের তৎপরতা কমাতে চাই তাহলে প্রথমেই আমাদের স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো এক্সপার্ট সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই এক্সপার্ট সৃষ্টি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার বিকাশে মোটেও সহায়ক নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

এখন একজন ছাত্র বা ছাত্রী মাস্টার ডিগ্রি লাভ করার পরও সঠিকভাবে কাজ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পরও কর্মদক্ষতা অর্জন করতে না পারে সেভাবেই তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান ত্রুটি দূর করতে না পারলে আমাদের পক্ষে বিদেশি এক্সপার্টদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। আর সেই অবস্থায় বিদেশি এক্সপার্টদের আমাদের দেশ থেকে টাকা নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক, khaleque09@yahoo.com

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও