যে গ্রামে সবাই পাঙাশ চাষে ‘স্বাবলম্বী’
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

>

যে গ্রামে সবাই পাঙাশ চাষে ‘স্বাবলম্বী’

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ০৮, ২০২২

যে গ্রামে সবাই পাঙাশ চাষে ‘স্বাবলম্বী’
১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালে দেশীয় মুদ্রা সংস্করণে দশ টাকার নোটের প্রচ্ছেদে স্থান পাওয়া চারশ’ বছরের পুরনো মসজিদটির গ্রাম টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া গ্রাম। পাশেই রয়েছে শাহান শাহ আদম (কাশ্মিরী) মাজার শরীফ। এজন্য গ্রামটির পরিচিতি দেশব্যাপী রয়েছে। এবার যোগ হয়েছে পাঙাশ চাষ। পাঙাশের গ্রাম নামে নতুন পরিচয় প্রায় আটিয়া গ্রাম। এই আটিয়া গ্রামের পাঙাশের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বাড়ি-বাড়ি পুকুর। ঘরে-ঘরে পাঙাশ চাষী। পুকুর ভরা পাঙাশ।

পাঙাশের গ্রামের সবাই এখন অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী। পুকুরের মাটি ও পানির গুনগত মান এবং পুষ্টিকর খাবারে উৎপাদিত পাঙাশ জেলার মানুষের আস্থা কুঁড়িয়েছে। জেলার নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আমিষের চাহিদা পুরণ করছে আটিয়ার পাঙাশ থেকে।

১৯৯৪ সালে আসাদুজ্জামান আসাদ নামের এক ব্যক্তি প্রথম আটিয়াতে পাঙাশ মাছ চাষ শুরু করেন। আসাদের সফলতায় উৎসাহিত হয়ে আটিয়ার ঘরে-ঘরে তৈরি হয়েছে পাঙাশ  চাষী। এই গ্রামে প্রায় দেড় শতাধিক পুকুরে এখন পাঙাশ চাষ হচ্ছে। পোনা মজুদ, পাঙ্গাস চাষ, মাছ ধরা, এমনকি বাজারে বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাঙাশ চাষের সাথে যুক্ত। দুই যুগের পাঙাশ চাষে গ্রামের অধিকাংশ পরিবার এখন অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী।

তবে গত কয়েক বছরে ধাপে-ধাপে বেড়ে খাবারের দাম দ্বিগুন হওয়ায় পাঙাশ চাষের আগাম দিনগুলো নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। খাবারের দাম কমানো, মাছ সরবরহের ব্যবস্থাসহ সরকারি পৃষ্টপোষকতা এই মুহুর্তে জরুরি বলে মনে করছেন এই গ্রামের পাঙাশ চাষীরা।

পাঙাশ চাষী আসাদ বলেন, আমি প্রথম এই গ্রামে পাঙাশ চাষ শুরু করি। গ্রামে এখন দেড় শতাধিক পুকুরে পাঙাশ চাষ হচ্ছে। বর্তমানে খাবারের দাম দ্বিগুন। ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা মূল্যের খাবারের বস্তা হয়েছে ১৭/১৮শ’ টাকা। মাছের দাম আগের মতোই রয়েছে। পাঙাশ চাষে দুইবার সেরা চাষীর পুরস্কার পেলেও বর্তমানে পাঙাশ চাষ নিয়ে হতাশায় রয়েছি।

আসাদের পর ১৯৯৯ সালে পাঙাশ চাষ শুরু করেন বায়েজিদ হোসেন জুয়েল। তার চারটি পুকুরে ১৫ থেকে ২০ হাজার পাঙাশ পালন করেন তিনি। জুয়েলও জানালেন মাছের খাবারের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধির কথা। ৩২/৩৪ টাকা কেজির খাবার হয়েছে ৫২/৫৩শ’ টাকা। প্রতি কেজিতে ১৯/২০টাকা মূল্য বেড়েছে। খাবারের দাম কমানোর দাবি জানান এই পাঙাশ চাষীও।

লুতফর রহমান ও জায়েদুর রহমানরা সাত ভাই মিলে ৬টি পুকুরে পাঙাশ চাষ করেন। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লুতফর রহমান নিয়েছেন বিকল্প পদ্ধতি। খাবারের সব ধরনের কাঁচামাল কিনে কারখানা থেকে ভাঙিয়ে নেন। ফলে মাছের খাবারের উর্ধ্বগতিতেও লাভের হিসেব আগের মতোই গুনছেন তিনি। কয়েকজন আবার বাড়িতে খাবার তৈরির জন্য ছোট আকারের মেশিন নিজেই ক্রয় করেছেন। তাদের খাবার খরচ আরও কমে এসেছে। তবে বেকায়দায় পড়েছে যেসব চাষীরা প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ায়।

খায়রুল হোসেন বাচ্চুও চারটি পুকুরে পাঙাশ চাষ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে পাঙাশ চাষ করে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনলেও বর্তমানে খাবারে দাম বেড়ে যাওয়ায় হোঁচট খাচ্ছেন তিনি।

স্বামী মারা যাওয়ার পর বিধবা নারী ঝরনাও শুরু করেন পাঙাশ চাষ। বেঁচে থাকা অবস্থায় স্বামীর কাছ খেকে শিখেছিলেন কিভাবে পাঙাশ চাষ করতে হয়। মাছ চাষ করেই দুই মেয়ের বিয়ের খরচ যুগিয়েছেন তিনি। বাকি দুজনের ভরণ পোষণের জন্য মাছ চাষ ছাড়েননি এখনও। ঝরনার মতো গ্রামের অনেকেই পাঙ্গাস চাষে ঝুঁকছেন। ফলে এ গ্রামে বেকারত্ব নেই বলেই চলে। সবাই এখন স্বাবলম্বী। প্রতি হাজার পাঙাশ চাষ করে বছরে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা উপার্জন করেছে চাষীরা। একজন চাষী ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পাঙাশ চাষ করে গ্রামের অর্থনৈতিক চাকা বদলে দিয়েছে। একদিকে নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের অর্থনীতিকে মজবুত করেছেন। 

মাছের বর্তমান পাইকারী বিক্রয় মূল্য মন প্রতি ৪ হাজার খেকে ৪হাজার ২শ’ টাকা। পাঙাশ পালনে খাবারের দাম দফায়-দফায় বেড়ে দ্বিগুন হলেও মাছের পাইকারী দাম কেজি প্রতি ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যেই থাকছে। সম্প্রতি চাষীরা ক্ষতির সম্মুক্ষিণ হচ্ছে। খাবারের দাম না কমলে পাঙাশ চাষ থেকে ছিটকে পড়বে চাষীরা এমনটাই ভাবছেন এ পেশার সাথে সম্পৃক্তরা। প্রয়োজন খাবারের দাম কমানো। প্রয়োজন সরকারি সহেযোগিতা।

এ ব্যাপারে দেলদুয়ার উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতিয়ার রহমান বলেন, আটিয়ার পাঙাশ প্রসিদ্ধ। পাঙাশ  চাষ করে গ্রামের অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমরা সাধ্যমতো পাঙাশ চাষীদের সহযোগিতা করছি। প্রশিক্ষণসহ নানা পরামর্শ দিয়ে মৎস্য অফিস সবসময় এসব মাছ চাষীদের পাশে আছে বলে তিনি জানান।

এএইচএ
 

আরও পড়ুন

আরও
               
         
close