বিদায়ী বছরের আলোচিত দশ ঘটনা
Back to Top

ঢাকা, শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১ | ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

বিদায়ী বছরের আলোচিত দশ ঘটনা

প্রীতম সাহা সুদীপ ৮:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০

বিদায়ী বছরের আলোচিত দশ ঘটনা
২০২০ সালটি ক্যালেন্ডারের পাতার অন্যান্য বছর থেকে একেবারেই অন্যরকম ছিল। করোনা পরিস্থিতির কারণে বছরটি মহাকালের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। করোনাভাইরাসের উৎপত্তি, মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া, মৃত্যুর মিছিল, ভ্যাকসিনের প্রত্যাশা ইত্যাদি ছিল এ বছরের আলোচিত বিষয়। চলুন দেখে নেয়া যাক বিদায়ী এ বছরটির আলোচিত শীর্ষ ১০টি ঘটনা।

১. করোনায় বিপর্যস্ত গোটা বিশ্ব:

বিশ্বব্যাপী চলছে কোভিড-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ। নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করোনাকে মহামারি ঘোষণা করে। এর আগে ২০ জানুয়ারি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে সংস্থাটি। এদিকে গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়।

সবশেষ ২৭ ডিসেম্বর রোববার সকালে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় (জেএইচইউ) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৮২০ জনে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ৯২১ জন। এদিকে বাংলাদেশে ২৬ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৪২৮ জনে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ৯৯ জন।

২. করোনায় প্রাণ গেছে বিভিন্ন পেশাজীবীর:

গত ১৩ জুন রাতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ মারা যান। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হয়। সেখানেই তিনি মারা যান। পরে কোভিড-১৯ পরীক্ষায় তার ফলাফল পজিটিভ আসে।

এছাড়া করোনায় মারা গেছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, সাবেক এমপি আলহাজ মকবুল হোসেন, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রমুখ।

এছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জুন প্রাণ হারান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ জুলাই প্রাণ হারান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব নরেন দাস।

এছাড়া ২০২০ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ১ হাজার ১১ জন কর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে করোনায় মারা গেছেন ২৯ জন সাংবাদিক। আর করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরো ১২ জন।

বিদায়ী এই বছরটিতে বাংলাদেশে ১২১ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী।

মহামারি করোনায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছে পুলিশ। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত, ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া, লাশ দাফনসহ নানা কাজ করে প্রশংসিতও হয়েছে বাহিনীটি। এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে ৭৬ জন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্যে।

৩. মহামারিতে ৬৬ দিনের দীর্ঘতম ছুটি:

চলতি বছরটিই ছিল টানা দীর্ঘতম ছুটির বছর। করোনা মহামারির কারণে চলতি বছর ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন ছুটি থাকে।

করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলে ২৩ মার্চ সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন। পরে বন্ধ করে দেয়া হয় সব ধরনের গণপরিবহনও। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় দফায় দফায় ছুটি বাড়তে থাকে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন শর্ত পালন ও নির্দেশনা মানা সাপেক্ষে আবার ৩১ মে থেকে অফিস খুলে দেয় সরকার। ধীরে ধীরে খুলে দেয়া হয় গণপরিবহনও।

৪. টানা বন্ধ স্কুল-কলেজ, শিক্ষাখাতে অনিশ্চয়তা

করোনা পরিস্থিতিতে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মুখে গত ১৮ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর ধাপে ধাপে বাড়ে সেই ছুটির মেয়াদ। সর্বশেষ ১৮ ডিসেম্বরের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২১ সালের ১৬ জানুযারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এমন পরিস্থিতিতে স্থগিত রয়েছে খুদে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা। এরইমধ্যে অনেক চেষ্টা করেও স্থগিত করতে হয় এইচএসি পরীক্ষা। অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা নিয়েও। রেডিও-টেলিভিশনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ রয়েছে এই সুবিধাবঞ্চিত। অ্যাসাইনমেন্টে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিলে সেখানে উঠেছে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। খুদে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্ধ হয়ে গেছে ব্যেক্তি মালিকানাধীন অনেক কিন্ডারগার্টেন। এইচএসসি ফল প্রকাশ না করায় আটকে আছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। এছাড়া কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার শেষ নেই।

৫. বছর জুড়ে আলোচনায় ছিল নানা দুর্নীতি

২০২০ সালে ঘটেছে বেশ কিছু আলোচিত দুর্নীতির ঘটনা। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ছিল বছর জুড়ে আলোচনায়।

গত ২০ সেপ্টেম্বর অবৈধ অস্ত্র, জালনোটের ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক আবদুল মালেককে গ্রেফতার করে র্যা ব। পরে তদন্ত করতে গিয়ে র্যা ব জানতে পারে, স্বাস্থ্য অধিদফতরে বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন দফতরে তদবির করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন মালেক। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণে অর্থ গচ্ছিত করেছেন তিনি।

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ছিল রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের মালিক সাহেদ করিম। করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট প্রদান, অর্থ আত্মসাতসহ নানা প্রতারণার অভিযোগে ১৫ জুলাই বুধবার সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকায় নৌকায় পলাতক অবস্থায় অস্ত্রসহ সাহেদকে গ্রেফতার করে র্যা ব। এর আগে ৬ জুলাই ওই হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেয়া হয়। র্যা ব জানায়, করোনার ভুয়া রিপোর্ট প্রদানসহ নানা অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাহেদ।

এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি জাল টাকা বহন ও অবৈধ টাকা পাচারের অভিযোগে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র্যা ব। এরপর পাপিয়ার বাসা থেকে অস্ত্র, মদ, নগদ টাকা ও বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।

গত ৬ জুন কুয়েত থেকে গ্রেফতার হন লক্ষ্মীপুর ২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুল। অর্থ ও মানবপাচার এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে পাপুলকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশ। গত ১১ নভেম্বর অবৈধ সম্পদ এবং ১৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এতে তার স্ত্রী সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিন প্রধানকেও আসামি করা হয়।

এছাড়া সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমকে গ্রেফতারের ঘটনাটিও বিদায়ী বছরের আলোচিত ঘটনা ছিল। গত ২৫ অক্টোবর রাজধানীর কলাবাগানে নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধরের ঘটনায় আলোচনায় আসেন ইরফান সেলিম। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। পরদিন পুরান ঢাকার বড় কাটরায় হাজী সেলিমের বাড়িতে দিনভর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদক এবং অবৈধ ওয়াকিটকি ও ভিভিআইপি সরঞ্জামাদিসহ ইরফানকে গ্রেফতার করে র্যা ব। র্যা বের ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক রাখার দায়ে ইরফান সেলিমকে এক বছর কারাদণ্ড দেন। পরে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এরপরই একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করে ইরফানের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও জমি দখলের তথ্য।

বছরের শেষ দিকে এসে মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের গ্রেফতারের বিষয়টিও চাঞ্চল্যেও সৃষ্টি করে। গত ২০ নভেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর বাড্ডায় মনিরের বাড়ি ঘিরে রাখে র্যা ব। ২১ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে ওই বাসা থেকে ৬০০ ভরি সোনার গহনা, বিদেশি পিস্তল-গুলি, মদ, ১০টি দেশের বিপুল পরিমাণ মুদ্রা ও নগদ এক কোটি নয় লাখ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। তিন মামলায় ২৭ দিনের রিমান্ড শেষে গোল্ডেন মনিরকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়, হু-ি ব্যবসা, স্বর্ণ চোরাকারবার ও ভূমিদস্যুতা করে এক হাজার ৫০ কোটি কালো টাকার মালিক হয়েছিলেন গোল্ডেন মনির। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ২৪ টি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ৯৩০ কোটি ২২ লাখ টাকার লেনদেন করে তিনি।

৬. বেড়ে গিয়েছিল ধর্ষণ, আনা হয় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই হঠাৎ সারাদেশে বেড়ে যায় ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় প্রকাশ হতে থাকে একের পর এক ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের খবর। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের খবর গোটা দেশ তোলপাড় করে তোলে। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর রাতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন চালানো হয়। তবে ঘটনার ৩২ দিন পর ৪ অক্টোবর দুপুরে নির্যাতনের ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হলে সেটি নিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে।

এরপরই সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে রাস্তায় নামে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা। সচেতন মহলের এই আন্দোলন চলে টানা কয়েকদিন।

চলমান আন্দোলনের মধ্যেই ১৩ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে সংশোধিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অধ্যাদেশটি জারি করেন। এরপর ৮ নভেম্বর জারি করা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করতে সংসদে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২০ তোলা হয়।

৭. মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড

বিদায়ী বছরের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড। গত ৩১ জুলাই রাতে মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ১৩ ডিসেম্বর আলোচিত ওই হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে র্যা ব।

১৫ জনকে অভিযুক্ত করে দাখিল করা ওই চার্জশিটে র্যা ব জানায়, সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ইয়াবা বাণিজ্য। পুলিশের এই কর্মকর্তার ইয়াবা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপকর্মের কথা জেনে যাওয়ায় সিনহাকে হত্যা করা হয়।

৮. আলোচনায় ছিল আরও দুই হত্যাকাণ্ড

এছাড়া বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আনিসুল করিম শিপন হত্যার ঘটনাটিও বেশ আলোচিত ছিল। গত ৯ নভেম্বর রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে এএসপি আনিসুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আনিসুলের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাইজুদ্দিন আহমেদের দায়ের করা হত্যা মামলায় হাসপাতালটির ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এছাড়া গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআন শরীফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে আবু ইউনুস মো. শহিদুন্নবী জুয়েল নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ছাই করার ঘটনাও বেশ আলোচিত হয়েছিল।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, ধার্মিক ছিলেন জুয়েল। তিনি নিয়মিত মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। গুজব ছড়িয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা হয় পাটগ্রাম থানায়। পরে মামলা হস্তান্তর করা হয় ডিবিতে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৪৫ জন আসামিকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে।

৯. রাজপথে হঠাৎ সক্রিয় হেফাজত

ফরাসি সাময়িকীতে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর তা কেন্দ্র করে রাজপথে সক্রিয় হয়েছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আর এর মধ্য দিয়েই বাকি ইসলামী দলগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা দেখা যায়।

এর মধ্যে হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। পরবর্তীতে কাউন্সিল করে তার জায়গায় নতুন আমির হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা হয় হেফাজতের মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে। মহাসচিব হন মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী।

বছরের শেষ ভাগে এসে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতায় সরব হন হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন নেতা। তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাদ-প্রতিবাদের ঝড় তোলে। ওই ঘটনায় কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। শফি হুজুরের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আলোচনার মধ্য দিয়ে এই বিরোধিতার অবসান ঘটাতে চাইছে; অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ আলোচনায় হেফাজত নেতাদেরও নরম সুর শোনা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে মারা যান মহাসচিব মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী। তার মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও ঢাকা খিলগাঁও জামিয়া ইসলামিয়া মাখজারুনুল উলূম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা নূরুল ইসলামকে এই সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়।

১০. ভাস্কর্য ইস্যুতে উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন

বছরের শেষের দিকে এসে ভাস্কর্য ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। রাজধানীর দোলাইরপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতায় মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করা হেফাজত ও তাদের বন্ধুপ্রতিম কিছু সংগঠন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক কর্মসূচি পালনের পর নড়েচড়ে বসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসর্গে থাকা বেশ কিছু ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন। ভাস্কর্য নির্মাণের পক্ষে তারাও পাল্টা মাঠে নামে।

এই ‘অরাজনৈতিক’ দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিতে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে শুরু করে রাজনীতির মাঠ। আওয়ামী লীগসহ সরকারপন্থি দলগুলো যেমন সরাসরি ভাস্কর্যের পক্ষে কথা বলেছে, অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো আপাত মৌনব্রত পালন করলেও সরব ভূমিকায় ছিল হেফাজতে ইসলাম।

খেলাফত মজলিশ ও হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সরে না এলে তিনি আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটাবেন এবং ওই ভাস্কর্য ছুড়ে ফেলবেন।

অন্যদিকে কোনো ভাস্কর্য তৈরি হলে তা টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেয়া হবে বলে হুমকি দেন হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী।

অপরদিকে হেফাজত ইসলামের এমন কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল সমাজ। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রতিদিনই বক্তব্যে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মামুনুল হক চট্টগ্রামে মাহফিল করতে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের বাধার সম্মুখীন হন।

এছাড়া হেফাজতের এই নেতাদের গ্রেপ্তার দাবীতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের ৬০ সংগঠন। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনও এর প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের হয়। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার নির্মাণাধীন এক ভাস্কর্য ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। কুষ্টিয়া পৌরসভার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ডান হাত, পুরো মুখ ও বাম হাতের অংশ বিশেষ শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় ভেঙে ফেলা হয়।

এর কয়েকদিন যেতে না যেতেই কুষ্টিয়ায় ব্রিটিশ বিরোধী নেতা বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় এক যুবলীগ নেতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ জানায়, ওই যুবলীগ নেতার সঙ্গে কয়া মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও কলেজের অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জের ধরে ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে।

পিএসএস 

 

আরও পড়ুন

আরও