উন্নয়ন বিপ্লবের অপেক্ষা
Back to Top

ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১ | ১০ বৈশাখ ১৪২৮



উন্নয়ন বিপ্লবের অপেক্ষা

শাহাদাত স্বপন ১১:১২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

উন্নয়ন বিপ্লবের অপেক্ষা
২০২০ সাল, বিশ্বব্যাপী এক চড়াই-উতরাইয়ের বছর। বিশ্ব যখন হাজারো প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে তরতর গতিতে এগিয়ে চলছে, ঠিক সে সময় পৃথিবীর আকাশে নেমে আসে মেঘের অমানিশা। স্বাভাবিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ দূরে থাক করোনার দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বেত ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নাস্তানাবুদ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে দেশে কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেই রূপ নেবে উন্নয়ন বিপ্লবে। বছরের আলোচিত এমন কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শাহাদাত স্বপন।

করোনাকালীন বাংলাদেশের মানুষের জীবন পরিচালনার ওপর প্রভাব কিছুটা কম পড়লেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাকা নানাভাবে কিছুটা সচল থাকলেও মুখ থুবড়ে পড়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে। দেশের বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হয় কর্মীদের, ছোট করতে থাকে তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি। প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে তাদের কর্মী ছাঁটাই করে। এভাবে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিটি মানুষের জনজীবনে পড়ে বড় ধরনের প্রভাব।

এভাবে সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে যায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনজীবন পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয় সরকারকে, অপরদিকে বিগত কয়েক বছরে হাতে দেওয়া মেগা প্রকল্পসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা সরকারের সামনে বড় হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যেই বছরের শেষ নাগাদ দৃশ্যমান হয় বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু। ৬.১৫ কিলোমিটারের এই পদ্মা সেতু মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তকে সংযোগ স্থাপন করার মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে বিরল ইতিহাস স্থাপন করে।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে পদ্মা বহুমুখী প্রকল্প সেতু প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ না হওয়ার পিছনে এমনিতেই নানা প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে প্রকল্প সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দুর্নীতিপরায়ণ মনোভাব, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অন্যতম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা। ফলে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে ফাস্টট্রাকভুক্ত মেগা প্রকল্পগুলো। ফলে যথা সময়ে শেষ করতে প্রকল্পগুলোর অনেক কাজই এখনো বাকি। এ জন্য মেয়াদ শেষে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়ে অনেকটাই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ ও ঘুমধুম সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্রাক নির্মাণের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক সভায়। অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩৩৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ সময়ে গড় অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪২.৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে গড়ে মেয়াদকাল পেরিয়ে গেছে সাড়ে সাত বছর। প্রকল্পগুলোর শতভাগ কাজ শেষ করতে হলে এখনো গড়ে ৫৭.৩ শতাংশ কাজ বাকি। এগুলো শেষ করতে প্রকল্পগুলোর সময় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অবশ্যই এসব প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধির ঝুঁকিতে আছে। সেই সঙ্গে ব্যয়ও বৃদ্ধি হতে পারে। এক্ষেত্রে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। বাস্তবায়ন শেষ করার স্বার্থে টাকা যা লাগবে তা দিতেই হবে। তবে কথা হচ্ছে, বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো শুরুতেই খুঁজে পাওয়া গেলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতো না। যেনতেনভাবে শুধু প্রকল্প নিলেই তো হবে না। প্রকল্পগুলো ফাস্টট্র্যাকে যুক্ত করার মানে তো এই নয় যে, শুধুু মেয়াদ ও টাকা বাড়ানো হবে। ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের গতি, মানসম্মত বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা সেরকমই হওয়া উচিত।

যে অবস্থায় মেগা প্রকল্প:

পদ্মা সেতু

এ প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সে হিসাবে গত ১২ বছর ৭ মাসে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮১ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগামী বছর জুনে মেয়াদ শেষ হলে আগামী ১০ মাসে বাস্তবায়ন করতে হবে ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এরই মধ্যে করোনাসহ নানা কারণে নতুনভাবে মেয়াদ বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

এটির বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। মেয়াদ শেষ হবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। গত ৪ বছরে অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। প্রকল্পটির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী ৫ বছরে বাস্তবায়ন করতে হবে ৭১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প

২০০৯ সালের জুলাই থেকে রামপাল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয়। চলতি বছরের জুনেই শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগস্ট পর্যন্ত ১১ বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে ৫০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এখনো প্রকল্পটির কাজ বাকি রয়েছে ৪৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

মেট্রোরেল

২০১২ সালের জুলাই থেকে এর বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে। কিন্তু গত ৮ বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে ৫১ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আগামী ৪ বছরে বাস্তবায়ন করতে হবে ৪৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর

এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয় ২০১৫ সালের জুলাই থেকে। শেষ হবে ২০২১ সালের জুনে। শুরু থেকে গত ৫ বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে ৭১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। শতভাগ কাজ শেষ করতে হলে আগামী ১ বছরে বাস্তবায়ন করতে হবে ২৮ দশমিক ৬২ শতাংশ।

পদ্মাসেতু রেল সংযোগ

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে। মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের জুনে। শুরু থেকে গত সাড়ে ৪ বছরে অগ্রগতি হয়েছে ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। শতভাগ কাজ শেষ করতে হলে আগামী ৪ বছরে বাস্তবায়ন করতে হবে ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ : এ প্রকল্পটির মেয়াদ শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই থেকে। আর শেষ হবে ২০২২ সালের জুনে। শুরু থেকে গত ১০ বছরে অগ্রগতি হয়েছে ৪২ শতাংশ। শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী ২ বছরে বাস্তবায়ন করতে হবে ৫৮ শতাংশ।

মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র : এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শুরু হয় ২০১৪ সালের জুলাই থেকে। শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। শুরু থেকে গত ৬ বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী ৩ বছরে শতভাগ কাজ শেষ করতে হলে আরও ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে।

আলোচনায় যেসব ক্ষেত্র

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নানা বিতর্ক লেগেই ছিল। এর সঙ্গে চলতি বছর যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নানা ব্যর্থতা। বিশেষ করে করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবাদানে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগকে। যদিও বিশে^র উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। দু-একটি দেশ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট অপারগতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে অধিকাংশ দেশকে। বাংলাদেশের স্বল্প সামর্থ্য নিয়ে সেই সে তুলনায় অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছে করোনা পরিস্থিতি।

করোনা যখন মহামারি, তখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনাভাইরাসের চিকিৎসা খরচ নিতে অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। শুরুর দিকে করোনাভাইরাস উপসর্গ পরীক্ষায় ফি বেশি নেওয়ার এক মহোৎসব শুরু হয়েছিল। যদিও পরে স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়ার পর ফি বেসরকারিভাবে করোনার চিকিৎসা ব্যয়ভার বহনের ক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা আসে।

শিক্ষা খাত নিয়ে নাস্তানাবুদ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। টানা এক বছরের কাছাকাছি সময়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘটনা এই প্রথম। কোনোভাবেই এ অবস্থান থেকে উপরে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি মন্ত্রণালয়টি। এরপরও বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেশন জট থেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারী প্রেক্ষাপটে এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ওপর মূল্যায়ন করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হবে। ফলে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা অংশ নেয়নি তারাও এ বছর সার্টিফিকেট পাবে। শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পাস করতে পারেনি। তবে এ বছর সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়া হবে। ফলে পাস না করেও সার্টিফিকেট পাওয়ায় সার্বিকভাবে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে থাকবে প্রশ্ন।

বছরজুড়ে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। বিশেষ করে চলতি বছর পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে পেঁয়াজের দাম ছিল আকাশচুম্বি। যা যে কোনো সময়ের তুলনায় ৪ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি। এ ছাড়াও হঠাৎ করে আলুর দাম বেড়ে যায়। এমনকি চালের দাম প্রতি কেজি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতি ছিল। এসব ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও; এমনকি বিভিন্ন সময় বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনার পরেও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে যেসব ভোগ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি হয়েছে তাৎক্ষণিক সেসব পণ্যের আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে কিছুটা ভারসাম্যতা আনার চেষ্টা করেছে সরকার। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাজার স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন তারা। এছাড়াও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বছরজুড়েই ছিল আলোচনায়। বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইস্যুতে এবং পদ্মা সেতুর অগ্রগতিতে গণমাধ্যমে সরব ছিল মন্ত্রণালয়টি।

বছরের শুরু থেকে চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়তে হয়েছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। মন্ত্রণালয় থেকে চালের দাম বারবার নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট মিল মালিক ও আড়ৎদাররা তা মানতে চাচ্ছিলেন না। সরকারের মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জোর মনিটরিং এবং দফায় দফায় মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসে। চলতি বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বেশকিছু ইস্যুতে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কয়েকটি জেলা প্রশাসকের নৈতিক পদস্খলনজনিত ঘটনা ছিল আলোচিত। তবে মন্ত্রণালয়ের শক্ত অবস্থানের কারণে অনেকটা সামলানো গেছে। তাছাড়া সরকারি আমলাদের উপরে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের আক্রমণের ঘটনা ছিল গণমাধ্যমজুড়ে। এ ধরনের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ বছর নিতে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু পদক্ষেপ। এর মধ্যে মা ইলিশ যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য জোর তৎপর ছিল মন্ত্রণালয়টি। বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা গেছে মন্ত্রণালয়টিকে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে পোলট্রি খাতে ব্যাপক ধস নামে। এটা যাতে সহজে কেটে উঠতে পারে এজন্য বড় ধরনের প্রণোদনা দিতে দেখা গেছে।

চলতি বছর তথ্য মন্ত্রণালয় বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে গণমাধ্যম উন্নয়নে। বিশেষ করে অনলাইন গণমাধ্যমগুলোর শৃঙ্খলা আনতে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা নিবন্ধন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের শতাধিক অনলাইন গণমাধ্যমকে নিবন্ধন দিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। মূল ধারার দৈনিক পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন ৯২টি গণমাধ্যমকে নিবন্ধন দিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রেস ইনফর্মেশন ডিপার্টমেন্টকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট এ প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রদানসহ সব ধরনের কার্যক্রমকে অত্যন্ত দ্রুতগতির করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছে।

করোনাকালীন সময়ে সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক, কলামিস্ট, অভিনেতাসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কলাকুশলীদের নানা সংকটে পাশে থাকতে দেখা গেছে তথ্য মন্ত্রণালয়কে। ই-নামজারিসহ ভূমি সেক্টর থেকে সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধে এ বছর বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর একান্ত প্রচেষ্টায় ভূমি সংশ্লিষ্ট সেবা ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। যদিও এ ধরনের সেবা প্রাপ্তিতে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। এক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। তবে এ-সংশ্লিষ্ট বিড়ম্বনা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে মন্ত্রণালয়। বছরজুড়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ও ছিল আলোচনায়।


উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হই: পরিকল্পনামন্ত্রী

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় দেশে যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে, তা দেখে আন্দোলিত হই। দেশের তুলনামূলক উন্নয়নের বাস্তব চিত্র দেখলে আমি মুগ্ধ হই। মাত্র ১০ বছর আগে হাওড়ের যে অবস্থা ছিল, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ওই এলাকার গ্রামগুলো অনেক এগিয়ে গেছে। এটা যখন দেখি আমি আনন্দিত হই। যখন আমাদের কাছাকাছি অন্যান্য দেশ তুলনা করে দেখান তখন আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের আরও অনেক উন্নয়ন করতে হবে। আমি মনে করি, এটাই সত্য। আমাদের উন্নয়নের আরও গভীরে যেতে হবে। আমাদের যে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে আমাদের যে প্রযুক্তি এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এটারও উন্নয়নে আমাদের কাজ করতে হবে। শিক্ষাখাতে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।


বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে: কাদের

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে শতবাধা অতিক্রম করে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। একজন মানবিক ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে আমরাও পারি। শুধু পদ্মা সেতু নয়, দেশের সব মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন হবে। সে সঙ্গে দেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য: ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, আমি বলব সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তিনি সব সময় আমাদের খোঁজখবর রাখেন। ফলে আমরা অনেকটাই সফলভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। ফণী, বুলবুল আম্ফানের মতো বড় ধরনের তিনটি দুর্যোগ আমরা সম্প্রতি অতিক্রম করেছি। মানুষকে আগেই কেন্দ্রে নিতে পারায় জীবনের ক্ষতি হয়নি। দুর্যোগপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব সিকিউরিটি ভলেন্টিয়ার রয়েছে; প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস রেডক্রিসেন্ট, আনসার ভিডিপি সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মী সবাই সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রত্যেকটা ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমাদের জেলা প্রশাসন বলে দিয়েছে কতজন লোককে আশ্রয় কেন্দ্রে নিতে হবে। ফলে তাদের আমরা আশ্রয় কেন্দ্রে নিতে পেরেছি এবং সামগ্রিকভাবে এ বছর দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা সফল হতে পেরেছি।

এইচআর

 

আরও পড়ুন

আরও