জ্যান্ত মানুষগুলো মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে গেল!
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

জ্যান্ত মানুষগুলো মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে গেল!

প্রীতম সাহা সুদীপ ৭:৫১ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

জ্যান্ত মানুষগুলো মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে গেল!
'ঘাটে ঢুকছিল আমাদের লঞ্চটি (মর্নিং বার্ড), এর মধ্যে বড় একটি লঞ্চ (ময়ূর-২) বাঁকাভাবে বের হয়ে যাচ্ছিল। ওই লঞ্চটি আমাদের লঞ্চের মাঝ বরাবর সজোরে ধাক্কা দিলে সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটা কাত হয়ে ডুবে যায়। এ সময় আমরা ৩০-৪০ জন মানুষ সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছি, বাকি জ্যান্ত মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেল। এরপর একের পর এক লাশ ভেসে উঠতে শুরু করলো। হায় আল্লাহ আজ যা নিজের চোখে দেখলাম সেটা যে কতোটা কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না।'

পরিবর্তন ডটকমের কাছে এভাবেই নিজের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছিলেন লঞ্চ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রী মো. মাসুদ।

মাসুদ বলেন, আমি পুরান ঢাকার ইসলামপুরের গুলশান আরা সিটি মার্কেটে কাপড়ের ব‌্যবসা করি। প্রতিদিন সকালেই মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে দোকান করি। গতকাল ময়মনসিংহ থেকে আমার দুই মামা আমার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। আজ সকালে তাদের নিয়েই লঞ্চে ঢাকায় দোকানে আসছিলাম। ঘাটের কাছে এসেই এই দুর্ঘটনা ঘটলো। বিকট শব্দ শোনার পর দেখলাম লঞ্চটি ডুবে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তখন কেবিনের গ্লাস খুলে কোনোমতে পানিতে লাফ দেই। ভেতরে আমার আপন দুই মামা আফজাল শেখ ও বাচ্চু শেখ ছিলেন। তারা আর বের হতে পারেননি। এখন তাদের খোঁজ করছি।

জাহাঙ্গীর হোসেন নামের আরেক যাত্রী মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বেঁচে ফিরেছেন। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার এনায়েত নগরে। রাজধানীর বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। আট বছর ধরে মুন্সিগঞ্জ থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন।

জাহাঙ্গীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, প্রতিদিনের মত সোমবার সকালেও মর্নিং বার্ড লঞ্চে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। আমার সাথে আমার এলাকার পরিচিত কমপক্ষে আরও ১০ জন লোক ছিলেন। গল্প করতে করতে আমরা সবাই আসছিলাম। সোয়া ৯ টার দিকে আমাদের লঞ্চটি ফরাশগঞ্জ ঘাটের সামনে আসে। এ সময় লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয় ময়ূর-২ নামের আরেকটি লঞ্চ। এতে আমাদের লঞ্চটি মুহূর্তেই এক পাশে কাত হয়ে যায়, আর যাত্রীরা ছিটকে পানিতে পড়তে থাকে। আমিও পানিতে পড়ে যাই। চোখের সামনেই অনেক মানুষকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখি। আমি ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠি আর কোন রকমে সাঁতরে তীরে উঠি।

নাজমা আক্তার নামে আরেক যাত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছি। সকালে মর্নিং বার্ড লঞ্চটিতে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। সোয়া ৯টার দিকে লঞ্চটি যখন ঘাটে ঢুকবে ঠিক এমন সময় বিকট শব্দ হয়, তাকিয়ে দেখলাম বড় একটি লঞ্চের ধাক্কায় আমাদের লঞ্চটি এক পাশে কাত হয়ে গেল আর মানুষ ছিটকে পানিতে পড়তে লাগলো। যে পাশ কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল, আমি ছিলাম এর ঠিক বিপরীত পাশে। কোন রকমে জানালা দিয়ে বের হয়ে তীরে এসে নিজের প্রাণ বাঁচাই। চোখের সামনে কতগুলো মানুষ যে লাশ হয়ে গেল, এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বলে বোঝানো যাবে না।

উল্লেখ্য, সোমবার সকালে এমএল মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি এলাকা থেকে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। সদরঘাটের কাছেই ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকায় নদীতে ময়ূর-২ নামের অপর একটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় 'মর্নিং বার্ড' লঞ্চটি ডুবে যায়।

এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও অনেকে এখনও নিখোঁজ আছেন। তাদের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট, নৌবাহিনীর ডুবুরি দলের সদস্য ও স্থানীয়রা।

সোমবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের ডিউটি অফিসার রোজিনা আক্তার পরিবর্তন ডটকমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী ও শিশু রয়েছে।

পিএসএস

 

: আরও পড়ুন

আরও