বিদ্যুৎ চাই, কিন্তু জীবনের বদলে চাই না
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০ | ১৮ চৈত্র ১৪২৬

বিদ্যুৎ চাই, কিন্তু জীবনের বদলে চাই না

আতিক রহমান পূর্ণিয়া ৭:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৪, ২০১৬

বিদ্যুৎ চাই, কিন্তু জীবনের বদলে চাই না

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও সুন্দরবন রক্ষা কমিটির সদস্য শরীফ জামিল। সুন্দরবনের অনতিদূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদ ও সুন্দরবন রক্ষার ধারাবাহিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য তিনি। সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন ও রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে এর প্রভাবে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে সেসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই পরিবেশ আন্দোলনকারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি আতিক রহমান পূর্ণিয়া

কেন আপনারা রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না? সমস্যাটা কোথায়? একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দেশের মানুষ উপকৃত হবে আম-জনতার কাছে বোধগম্য সাধারণ উত্তরটা জানতে চাই
প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে সুন্দরবন আসলে কী। এর গুরুত্ব কী। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কী? কোনটা কী জানা দরকার। প্রথমেই আসি সুন্দরবনের কথায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুন্দরবনের মতো বনের পাশে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীও রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে যুক্তি দেখান। দেখুন, সুন্দরবন পৃথিবীতে বিরল। জাতিসংঘ একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। জানতে হবে সুন্দরবন বিরল কেন? এর যে ইকোসিস্টেম, এর যে প্রাকৃতিক গঠন তার একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক রয়েছে। এর একটা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে বাকিটাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি সুন্দরবনের সামান্য প্রজাপতি বেঁচে থাকার ওপর সুন্দরবনের অস্তিত্ব নির্ভর করে। পুরো সুন্দরবনে পরাগায়ণের জন্য প্রজাপতির বেঁচে থাকা লাগে।

ভারত বাংলাদেশ দুই অংশ মিলিয়ে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের সুন্দরবনে পাঁচ হাজার ছোট বড় খাল রয়েছে। সুন্দরবনের বাতাস-পানি সেখানকার জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বনের পাঁচ হাজার খাল একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম এই খালগুলোর মাধ্যমে টিকে থাকে। শুধু তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র না, অন্য কোনো কারণেও এই ইকোসিস্টেমের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এবার প্রশ্ন আসতে পারে সুন্দরবন ধরে রাখার দরকার কী? এই সুন্দরবন আগামী দিনে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার একটি ঢাল। জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ অনুমান বলে সামনের দিনে সাগর অস্বাভাবিক আচরণ করবে। সিডরের চেয়েও বড় ঝড় আসবে। এক সিডরেই এই সুন্দরবন না থাকলে কী হত? আর সামনের দিনে সুন্দরবনের ক্ষতি হলে মানুষের ক্ষতি তো হবেই। এক ফারাক্কার কারণে গত ৪০ বছরে সুন্দরবনের লবণাক্ততা দ্বিগুণ বেড়েছে। যার প্রভাব উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত পড়েছে। আমরা বিদ্যুৎ চাই, কিন্তু জীবনের বদলে বিদ্যুৎ চাই না।

এখন আসি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। দূষণের কারণে বেইজিংয়ের আশেপাশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চীন আগামী ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাদের সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ স্থগিত করেছে।

সুন্দরবনে যে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে সে কয়লা শুধু কয়লা না। এই কয়লায় সালফার থাকে। এই কয়লা পোড়ালে সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইড তৈরি করে। মানুষের চুলের ত্রিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ পার্টিকেলস তৈরি হয়। ছাই তৈরি হয়।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র যে প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে তা নিয়েও মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

এই আধুনিক যুগে কি এসব ক্ষতিকর দিকের প্রতিকারের কোনো প্রযুক্তি নেই? রামপালে কী ক্ষতিকর দিকগুলো প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না?
সারাবিশ্বে প্রতি বছর আট লাখ প্রি-ম্যাচিউরড (অপরিণত) শিশুর মৃত্যু হয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে। সুন্দরবনের পাশের পশুর নদীর মাছ যে মা খাবেন তার শিশু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রজনিত দূষণের কারণে অটিস্টিক (প্রতিবন্ধী) হিসেবে জন্ম নেবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুদূরপ্রসারী প্রভাব খারাপ। সম্প্রতি দূষণের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ডিউক এনার্জিকে একশত ২০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে আদালত।

আপনি যেসব দূষণের কথা বলছেন সেগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নাই?
বিজ্ঞান এ দূষণ কমানোর চেষ্টা করে। সালফার ডাই অক্সাইডকে শতকরা ৯৮ ভাগ কমানো যায়। এটা করতে হলে তিন থেকে চার’শ কোটি টাকা লাগবে। আমাদের রামপাল টেন্ডার ডকুমেন্ট অনুযায়ী শতকরা ৭০ ভাগ সালফার ডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নাইট্রাস অক্সাইডকে এসসিআর প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রণ করার কথা। এটা প্রতি ইউনিটের জন্য খরচ পড়বে তিনশত মিলিয়ন ডলার। একশ ভাগও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু এ জন্য টেন্ডার ডকুমেন্ট চাওয়া হয় নি। টেন্ডারে সব পুরোনো হয়ে যাওয়া (ব্যাকডেটেড) টেকনোলজি চাওয়া হয়েছে। ব্যয়বহুল অনেক দূষণরোধী প্রযুক্তি টেন্ডার ডকুমেন্টে চাওয়া হয়নি। ওনারা যে চিন্তা করেছিলেন তা ২০১৫ সালেই বাস্তবসম্মত না।

কয়লা পোড়ালে নিকেল, আর্সেনিকসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ বের হবে। এগুলোও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রযুক্তি আছে। কিন্তু তারা এজন্য কোনো ব্যবস্থা নেন নি। কার্বন উৎপন্ন হবে। কয়লা যে পরিবহন করবে, এক জায়গায় মজুদ করে রাখা হবে তখনও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি রয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি ন্যূনতম ক্ষতি সয়ে বড় সুবিধা এনে দেয়? কিছুদিন আগে সুন্দরবনের পাশে তেলবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ায় হৈ চৈ পড়ে গেল। আপনারাও বলেছেন সুন্দরবনের বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল পর্যন্ত এল। কিন্তু সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি দেখা যায় নি। রামপালের তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও কী এমন কিছু হচ্ছে?
সুন্দরবনের ক্ষতি হয়নি কে বলল? আপাতদৃষ্টিতে হয়ত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এতে সুন্দরবনের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের গবেষকরা গবেষণা করে এ সম্পর্কে কিছু ধারণা পেয়েছেন। এগুলো গবেষণার বিষয়। সুন্দরবনের নদীতে ডলফিনের অভয়াশ্রম ছিল। তা এখন গেল কোথায়?

পশুর নদীর পাশে চিমনি বসানো হয়েছে। এই চিমনির ধোঁয়া সুন্দরবনে যাবে। বছরে চার মাস বাতাস সুন্দরবনমুখী থাকে। আমি আপনি হয়ত ট্যানারিতেও বেঁচে থাকতে পারি। কিন্তু প্রজাপতিতো দূষণে বাঁচতে পারবে না। পশুর নদীতে যদি মার্কারি দূষণ হয়? তাহলে? নদীতে ড্রেজিং করবে? তাতে ডলফিন থাকবে?

আপনার কাছে একটি সাহসী উত্তর চাই। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপক্ষে আছেন। তাহলে বলুন, কার স্বার্থে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র?
যে ৯৯৬ মিলিয়ন ডলার কর সুবিধা দিচ্ছেন তার সুবিধা কে পাবে? ড্রেজিংয়ের জন্য পশুর নদীতে টাকা লাগবে প্রায় ২৪ কোটি ডলার। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অংশিদার ভারতের এনটিপিসি নামক প্রতিষ্ঠান। যাদের বিনিয়োগ শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ। আর লাভ নিবে শতকরা ৫০ ভাগ। পুরো বিদ্যুৎটাই এনটিপিসি বিক্রি করবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে। বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ শতকরা ৭০ ভাগ। শতকরা ১৫ ভাগ সরাসরি মানুষের টাকা। এ দিয়ে বাংলাদেশ একশ ভাগ ঝুঁকি নিচ্ছে।

কিন্তু দেখুন। এরমধ্যেই ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী পীযুষ গয়াল বলেছেন, তাদের কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের থেকে সৌরশক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ কম। আসলে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র একশভাগ ঝুঁকিপূর্ণ।

তাহলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র কার স্বার্থে হচ্ছে বলে আপনি মনে করছেন?
এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হতে পারে। শুধু ভারতের স্বার্থ নয়। শুধু ভারতের স্বার্থ হলে অন্য দেশগুলো চুপ করে আছে কেন?

দেশীয় কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ? আপনারা প্রায়ই বলে থাকেন ‘তেল কোম্পানির দালাল’, এমন কিছু?  
শুধু তেল কোম্পানির দালাল না। ভূমির দালালরা পর্যন্ত ভিড়েছে। ওখানে এলপি গ্যাসের ব্যবসা হবে, ভূমির দালালরা এরই মধ্যে ওখানে জায়গা কেনা শুরু করেছে, প্লটের ব্যবসা হবে, হাউজিং হবে, বিমানবন্দর হবে।

আপনাদের আন্দোলন কী একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ? যে কারণে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনে জনগণকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে পারছেন না?
এই আন্দোলনতো ওইখানকার কৃষকরাই শুরু করেছিল। আন্দোলন কিন্তু আমরা শুরু করিনি। কৃষকরা জমি হারিয়ে যে আন্দোলন শুরু করেছিল তাতে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন নেমে এসেছিল। রামপালে কৃষি জমি রক্ষার ওই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুশান্ত দাস তাদের একজন। সুশান্ত রামপালে কৃষি জমি রক্ষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী।

আমরা শান্তিপ্রিয়। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। আজকে যারা রামপালের বিরুদ্ধে কথা বলছে তারা আসলে সরকারের বন্ধু। পৃথিবীর যত জায়গায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে সে জায়গার মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকারী সরকারকে শেষ বিচারে ধিক্কার দিয়েছে। আমরা চাই না কয়েক বছর পর এই সরকারকেও মানুষ ধিক্কার দিক।

আপনি কিসের বিনিময়ে এই প্রোজেক্ট করছেন? যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে তা উন্নয়ন না। আমরা রামপালের পক্ষে। তবে আপনি যেকোনো নিরপেক্ষ বিজ্ঞানভিত্তিক সর্বজনগ্রহণযোগ্য পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা করে করবেন। তাতে দেশের উপকার হলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করবেন, না হলে কেন করবেন? আমি বলব প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ আপডেট তথ্য দিন।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ

এআরপি/ডব্লিউএন/এইচএসএম

 

সাক্ষাৎকার: আরও পড়ুন

আরও