করোনায় ডায়াবেটিস রোগীর প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতাঃ অধ্যাপক ডাঃ মো ফরিদ উদ্দিন
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

করোনায় ডায়াবেটিস রোগীর প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতাঃ অধ্যাপক ডাঃ মো ফরিদ উদ্দিন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ৮:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১

করোনায় ডায়াবেটিস রোগীর প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতাঃ অধ্যাপক ডাঃ মো ফরিদ উদ্দিন
মহামারী করোনাভাইরাস নাস্তানাবুদ করেছে বিশ্ববাসীকে। যদিও প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর বর্তমানে করোনা দমে এসেছে,তারপরও সাবধান হতে হবে মানুষকে। প্রস্তুতি নিতে হবে অনাগত ঢেউয়ের।

বিশেষ করে করোনা সংক্রমণে যাঁরা  বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁরা হচ্ছেন- ডায়াবেটিস রোগী, হার্ট ফেইলিউরের রোগী, কিডনি  ফেইলিউরের রোগী, হাঁপানি বা ক্রনিক ব্রংকাইটিসের রোগী। এ ছাড়া যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, যেমন কেমোথেরাপি নেওয়া রোগী ইত্যাদি। 

মোটকথা শারীরিক ভাবে দুর্বল এবং বিভিন্ন রোগ  ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের করোনা মোকাবেলায় সাবধানতার বিকল্প নেই।

এ সময় হরমোন ও ডায়াবেটিস রোগীদের প্রয়োজন বাড়তি সচেতনতা। হরমোন ও ডায়াবেটিস রোগীদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে Association of Clinical Endocrinologist & Diabetologist of Bangladesh (ACEDB) বিশেষ গুরুত্ব সহকারে জনস্বার্থে কিছু পরামর্শ দিয়েছে।  

সংগঠনটির  প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডাঃ মো ফরিদ উদ্দিন,প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ, ডায়াবেটিস,এন্ডোক্রাইন মেডিসিন বিভাগ,বিএসএমএমইউ মন্তব্য করেন-  

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য করোনাভাইরাস আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে, তা প্রমাণিত। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা করোনা আক্রান্তদের বিপদ আরও বাড়াচ্ছে। যদিও অন্যান্যরাও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তবে ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরে করোনার প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। 

ডায়াবেটিস রোগীরা যে জন্য বেশি ঝুঁকিতেঃ 
আমাদের দেশে ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের অনেকেরই ডায়াবেটিস আছে। তার ওপর আমাদের ডায়াবেটিসের রোগীদের একটি বিরাট অংশের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ডায়াবেটিসের কারণে রোগীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। যেকোনো জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করার সক্ষমতা হ্রাস পায়। আবার ডায়াবেটিসের রোগীদের একই সঙ্গে কিডনি জটিলতা, হৃদ্ রোগ  ইত্যাদি থাকে। ডায়াবেটিস রোগীদের বড় ধরনের ঝুঁকি আছে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষেত্রে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিসের রোগীদের একটু বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।

 শরীরে ইনসুলিন কম থাকলে এবং রক্তে সুগার বেশি থাকলে  এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। এ ছাড়াও শরীরের রক্তের গতি কমতে শুরু করে। তাই ডায়াবেটিস রোগীর পক্ষে কোভিডের সঙ্গে লড়াই করা কষ্টকর। এর প্রভাবে শ্বাসযন্ত্র, ফুসফুস এমনকি হৃদযন্ত্রও কার্যক্ষমতা হারাতে বসে। 

তাই ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন; তারা অবশ্যই কিছু লক্ষণের দিকে নজর দিন। না হলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। 

জেনে নিন লক্ষণসমূহ-
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ডায়াবেটিস রোগীর অনেকেরই ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি ও অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এ ছাড়াও হাত-পায়ের নখের লাল দাগ আরও বেশি করে দেখা দেয়। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে এমনটি হয়ে থাকে। তাই এমন লক্ষণ দেখলে অবহেলা করবেন না।

রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে ডায়াবেটিস রোগীর শরীরের ক্ষত সহজে শুকায় না। তাদের ত্বক খুব রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ে যায়। এমন লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।

কোভিড নিউমোনিয়ার কারণে বিপদ আরও বাড়তে পারে। নিউমোনিয়া খুব ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে। ব্লাড সুগার বাড়ন্ত থাকায় রোগীর শ্বাসকষ্ট হয়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে করোনাকালে।

ডায়াবেটিস রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কম থাকে। তার উপরে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। সেই সঙ্গে হাইপোক্সিয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সবসময় রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে।

করোনা আক্রান্তদের শরীরে এখন আবার ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে রোগী মাথাব্যথা, দুর্বল ও চোখ ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। যাদের শরীরে উচ্চ মাত্রায় ব্লাড সুগার আছে এবং যারা উচ্চ মাত্রার স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেন তাদের জন্য ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ঝুঁকি বেশি।

কি করবেন ? 
যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁরা নিজেরা কোয়ারেন্টিনে থাকুন। বাজার, শপিং মল, জনবহুল জায়গা, সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতে হবে। বাড়িতে থেকে করোনা প্রতিরোধের নির্দেশগুলো মেনে চলতে হবে। বাইরের কারও সঙ্গে হাত মেলানো যাবে না, কোলাকুলি করা যাবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে যে কারও থেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্বে থাকতে হবে।  

যদি উপসর্গ দেখা দেয়, করোনা নিশ্চিত না হলেও, নিজেকে আলাদা করতে হবে।অর্থাৎ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে প্রথমেই বয়স্ক আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করে ফেলতে হবে। শরীর বেশি খারাপ না হলে হাসপাতালে না যাওয়াই ভালো। তবে চিকিৎসকের সঙ্গে বা সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় দ্রুত। 

অন্য সবার মতই করোনাকালীন সময় মোকাবেলায় সঠিক নিয়মে আপনিও মাস্ক পরিধান করুন। 

সাবান পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন টাকা-পয়সা, খবরের কাগজ, পার্সেল ইত্যাদি জিনিস স্পর্শ  করলে হাত ধুয়ে নিতে হবে। কাপড় লন্ড্রিতে ইস্ত্রি করতে না দিয়ে বাড়িতেই ধুয়ে পরতে হবে।।

বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে প্রথমেই বয়স্ক আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করে ফেলতে হবে।

জ্বর,সর্দি বা কাশি হলে যথাসম্ভব বাড়িতে অবস্থান করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া। 

হাঁচি-কাশি হলে টিস্যু ব্যবহার করা এবং শুষ্ক বদ্ধ বিনে ফেলে দেয়া  অথবা পুড়িয়ে ফেলা। প্রয়োজনে হাতের কনুই এ মুখ আড়াল করে হাঁচি দেবেন। 

অতিসত্বর টিকা নিন।

কি করবেন নাঃ 
জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। 

বাইরে থেকে আনা কোনো খাবার না খাওয়া ভালো হবে।

এ সময় পার্কে বা বাইরে হাঁটতে যাওয়ার দরকার নেই। শর্করা নিয়ন্ত্রণে বাড়িতে, বারান্দায় বা করিডরে হাঁটতে হবে এবং হালকা ব্যায়াম করতে হবে। 

হাত না ধুয়ে চোখ,নাক,মুখ স্পর্শ করবেন না।  

আক্রান্ত ব্যক্তির আসবাবপত্র,কাপড় ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। 

অসুস্থ লোকজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। 

যত্রতত্র হাঁচি-কাশি দেবেন না। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণের সামান্যতম লক্ষণ দেখা দিলে যেমন-জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি  দেখা দিলে কালক্ষেপণ করা যাবে না। চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

অধ্যাপক ডাঃ মো ফরিদ উদ্দিন
প্রফেসর ও চেয়ারম্যান,এন্ডোক্রাইন মেডিসিন বিভাগ,বিএসএমএমইউ।
President,Association of Clinical Endocrinologist & Diabetologist of Bangladesh (ACEDB)  

অনুলিখনঃ সীমান্ত বাধন চৌধুরী  

এসবিসি 
 

আরও পড়ুন

আরও