মুশাররফের মৃত্যুদণ্ডে ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২০ | ২২ চৈত্র ১৪২৬

মুশাররফের মৃত্যুদণ্ডে ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:২১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

মুশাররফের মৃত্যুদণ্ডে ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী

পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মুশাররফ।

গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মুশাররফের বিরুদ্ধে প্রথম মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি করতে দেশটির আদালতগুলোর পূর্ণ ছয় বছর লেগেছে। এই রায়টি পাকিস্তানে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

মঙ্গলবার সকালে মুশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনানির জন্য গঠিত বিশেষ আদালতের জারি করা এই রায় জনগণের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামরিক মহলগুলোতে বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

চারটি গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০১৩ সালে মুশাররফের উপস্থিতিতে এর বিচার শুরু হয়। অভিযোগগুলো ছিল, ২০০৭ সালে নওয়াজ শরীফের তৃতীয় সরকারের সময় জরুরী অবস্থা জারি করা এবং সংবিধান বাতিল করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান চাপিয়ে দেওয়া ও তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মুহাম্মাদ চৌধুরীকে (যিনি মুশাররফের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে নেতৃত্ব দেন, যা মুশাররফকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ত্যাগ করতে এবং এরপর প্রেসিডেন্ট পদ থেকেও সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। এরপর তার নেতৃত্বেই সাধারণ নির্বাচন দেওয়া হয়। তিনি নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোকে ক্ষমা করে দেন, যা তাদের নির্বাসন থেকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়।) বরখাস্ত করা।     

কিন্তু আদালত ২০১৬ সালে পারভেজ মুশাররফকে চিকিৎসার জন্য দুবাই যেতে অনুমতি দেয়। এর মাঝে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম চলতে থাকে, যাতে শেষ পর্যন্ত সে দোষী সাব্যস্ত হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মাধ্যমে বিচার পরিণতিতে পৌঁছে।  

 করাচিতে জেনারেল পারভেজ মুশাররফের সমর্থকরা আদালতের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন (রয়টার্স)

ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী

তিন সপ্তাহ আগে ইসলামাবাদ আদালতের আদেশে স্থগিত হওয়া এই রায়টি মঙ্গলবার অবাক করে দিয়ে প্রকাশ করা হয় সামরিক বাহিনীকে একটি ধাক্কা দেওয়ার জন্য। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল আসিফ গফুর এক সরকারি বিবৃতিতে এই রায়ের নিন্দা করেছেন। আসিফ গফুর বলেছেন, ‘বিশেষ আদালতের এই সিদ্ধান্তটি সশস্ত্র বাহিনী, সৈনিক ও অফিসারদের জন্য প্রচুর বেদনা ও শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’  

সামরিক বিশ্লেষকরা মুশাররফের সমর্থনে সেনাবাহিনীর অবস্থান বুঝতে পেরেছেন। কারণ, একজন প্রাক্তন জেনারেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায়টি মুশাররফ যে পদগুলিতে ছিলেন, সেগুলোর প্রভাব কমিয়ে দেয় এবং তার পরবর্তীতে যারা আছেন, তাদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

সে কারণেই সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মুশাররফের পদগুলি উল্লেখ করে বলেছেন, ‘একজন প্রাক্তন সেনাপ্রধান, যুগ্ম চীফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় দেশের সেবা করেছেন, এমন ব্যক্তি কখনো বিশ্বাসঘাতক হতে পারেন না।’

তিনি এই রায় প্রদানকারী বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেন, এই বিচার বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে হয়নি।

 বিচারপতি শারাফাত আলি চৌধুরী। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় একইরূপে বহাল থাকা কঠিন। (আল জাজিরা)

রায়ে উচ্ছ্বসিত জনগণ

যদিও পাকিস্তান সরকার গত ২৮ নভেম্বর সেনাবাহিনীকে খুশি করার জন্য এই রায়কে বাতিল করতে ইসলামাবাদের আদালতকে অনুরোধ করেছিল, যা ক্ষুব্ধ করেছিল আইনজীবীদেরকে; ফলে তারা দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করে। কিন্তু বিশেষ আদালত মাথা নত না করে মুশাররফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মাদ মাহদি বলেন, এই রায়কে সাধারণভাবে জনগণ ও বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। জনগণ সেনাবাহিনীর বিরোধী না, তবে তারা স্বৈরাচারকে ঘৃণা করে।

মুশাররফের নাম বেশ কয়েকটি গুরুতর মামলার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও মানবাধিকারকর্মীরা তার বিচারের দাবি করে আসছিলেন। যেমন, ১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরীফের দ্বিতীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান, নাগরিক শাসন এবং সংবিধান বিলুপ্তি, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখল।

মাহদী বলেন, ‘রায়টি যদিও এই নিশ্চয়তা দেয় না যে সামরিক অভ্যুত্থানের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, তবু ভবিষ্যতে এটি দুর্বল হৃদয়যুক্ত সামরিক বাহিনীর প্রতি দৃঢ় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।’

যদিও পাকিস্তানি যুব সংসদের সভাপতি হানান আব্বাসি মনে করতেন, বিচার বিভাগ ২০০৭ সালের জরুরী অবস্থা ঘোষণায় এবং ১৯৯৯ সালের অভ্যুত্থানে মুশাররফের সঙ্গে জড়িত নাগরিক নেতাদেরকেও অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করবে। এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ ও মুশাররফকে সমর্থনকারী বিচারপতিদের ছাড়া এই রায় খণ্ডিত ও সংক্ষিপ্তভাবে কেবল মুশাররফের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না।      

মুশাররফ ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা পাকিস্তানি জনগণের স্মৃতিতে রয়েছে। যে ঘোষণার ফলে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। যেহেতু পাকিস্তান ন্যাটো জোটের ভারি সামরিক যান চলাচলের ‘পথে’ পরিণত হয়েছিল। এবং এই যোগদানের ফলে পাকিস্তানে ধারাবাহিক সহিংসতার চক্র প্রসারিত হয়েছে।       

জেনারেল মুশাররফের মানবাধিকার রেকর্ডে তার লেখা ‘ইন দ্যা লাইন অফ ফায়ার’ বইটিতে তার স্বীকারোক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুশাররফ স্বীকার করেছেন যে, তিনি বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিককে আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের কাছে তুলে দিয়েছেন, যাদেরকে কুখ্যাত গুয়ান্তনামো বে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

শাইখ আবদুল আজিজ গাজী।

অন্যদিকে, পাকিস্তানে নারীদের জন্য প্রসিদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া হাফসার পরিচালক ও ঐতিহাসিক লাল মসজিদের (২০০৭ সালে মুশাররফের শাসনামলে সামরিক হামলার স্বীকার হয় এই মসজিদ, এতে কয়েক ডজন ছাত্রী শহীদ হয়) ইমাম ও খতীব শাইখ আব্দুল আজিজ গাজি মনে করেন, পাকিস্তানি আদালতের এই রায় তাঁর কাছে কোন বিশেষত্ব রাখে না এবং এর দ্বারা শহীদদের রক্তেরও প্রতিশোধ হয় না। তিনি আদালতকে স্বীকৃতি দেন না এবং মুশাররফের বিরুদ্ধে আদালতের কাছে বিচারের আবেদনও করেননি। তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছেন।

বিচারপতি শারাফাত আলি চৌধুরী আল-জাজিরা নেটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মুশাররফের বিরুদ্ধে রায়টিকে তার অনুপস্থিতিতে জারি করা প্রাথমিক রায় হিসেবে বিবেচনা করে এর সম্পাদনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, আদালতের এই রায়টি বাস্তবায়ন করতে এখনও অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। আপিল ও রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন থেকে দূরে থাকতে হবে এবং পাকিস্তান সরকারকে দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মুশাররফকে হস্তান্তরের আবেদন করানো সম্ভব হতে হবে।

তিনি মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় একইরূপে বহাল থাকা কঠিন। ঐতিহাসিক রায় হিসেবে তাড়াহুড়া না করার আহবান জানিয়ে অথবা এর উপর আড়ম্বরপূর্ণ লকব লাগিয়ে এর অবস্থা পরিবর্তন করা হয়।

আল জাজিরা আরবী থেকে মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ অনুবাদ

এমএফ/

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও