জামানতবিহীন ডিজিটাল ঋণের নামে প্রতারণা
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ১৩ কার্তিক ১৪২৮

জামানতবিহীন ডিজিটাল ঋণের নামে প্রতারণা

প্রীতম সাহা সুদীপ ১২:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৮, ২০২১

জামানতবিহীন ডিজিটাল ঋণের নামে প্রতারণা
অনলাইনে জামানত ছাড়া সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একাধিক অ্যাপস। এসব অ্যাপসের পরিচালনাকারীরা স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের নামে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হয়েই মোবাইলে সেসব অ্যাপস ইনস্টল করেন অর্থ সংকটে থাকা স্বল্প আয়ের লোকজন এবং বেকার ছাত্রছাত্রী। এভাবেই তারা লোন গ্রহণ করার পর স্বল্প সুদের পরিবর্তে উচ্চহারে সুদ প্রদানের মাধ্যমে প্রতারিত হন। শুধু তাই নয়, এতে গ্রাহকের মোবাইলে থাকা ব্যক্তিগত ডাটাগুলোও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যায়।

বাংলাদেশে বেশ কয়েকদিন ধরেই সহজ শর্তে ঋণ প্রদানকারী এমন একাধিক অ্যাপস পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতারিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগও করেছেন অনেক গ্রাহক। তিন হাজার টাকা ঋণের জন্য আবেদন করলে একজন গ্রাহক পেতেন ২১৯০ টাকা আর ৮১০ টাকা কেটে রাখা হতো প্রসেসিং ফি বাবদ। অথচ গ্রাহককে এক সপ্তাহের মেয়াদ শেষে পরিশোধ করতে হতো তিন হাজার ১৮ টাকা। সে হিসাবে ২ হাজার ১৯০ টাকা ঋণের বিনিময়ে সাত দিনে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হতো প্রায় ১ হাজার ৬৩৮ টাকা। আর মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে আরও সুদ প্রদান করতে হতো। ঋণের পরিমাণ যত বেশি হতো, টাকা কেটে রাখার প্রবণতাও ছিল তত বেশি। তিন হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন দিত এসব অ্যাপস। ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হতো।

গত মঙ্গলবার ও বুধবার রাজধানীর শহরের ধানমন্ডি, বনানী এবং মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিজিটাল মাইক্রোফাইন্যান্সের নামে অবৈধ সুদের কারবারে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। গ্রেফতাররা হলেনÑইমানুয়্যাল অ্যাডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান, শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব, শুভ গোমেজ ও মো. আকরাম। তাদের কাছ থেকে একটি এলিয়ন গাড়ি, ৯টি মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড, চারটি ল্যাপটপ ও চারটি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই উদ্ধার করা হয়।

ছয়টি অ্যাপসে লেনদেন, চীন থেকে পরিচালনা :

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। তিনি বলেন, গ্রেফতাররা ছয়টি অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে জামানতবিহীন লোন দেওয়ার নামে চলে মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। অ্যাপসগুলো হলোÑটাকাওয়ালা- পার্সোনাল লোনস অনলাইন, ক্যাশম্যান, র্যা পিড ক্যাশ কুয়িক অনলাইন ই-লোনস অ্যাপ, আমার ক্যাশ পার্সোনাল লোনস অনলাইন, ক্যাশকাশ ফার্স্ট লোনস অনলাইন এবং আই ক্যাশক্যাশ। এসব অ্যাপস প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ মানুষ ডাউনলোড করেছে। সবাই ব্যবহার না করলেও বিশাল একটা অংশ এসব অ্যাপসের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে।
অ্যাপসগুলোর সার্ভার চীনে অবস্থিত এবং যেগুলো মূলত চায়না থেকে পরিচালিত হয়। কিছু চাইনিজ নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকের সহায়তায় এসব অ্যাপস পরিচালিত হতো। ফলে কত টাকা কিংবা কতজন এ ব্যবসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেÑতা আমরা এখনো জানতে পারিনি। এসব কাজ চক্রটি মূলত দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে করে থাকে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি। আর চীনের নাগরিক যারা আমাদের দেশে আছেন, তাদের ধরার চেষ্টা করব। এর সঙ্গে যদি আরও কেউ জড়িত থাকেন তাদেরও আমরা গ্রেফতার করব।

যেভাবে প্রতারিত হচ্ছে গ্রাহক:
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রতারণার শিকার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়। এ মামলার তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। তদন্তের এক পর্যায়ে এই চক্রের পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, ফেসবুক-ইউটিউবে ক্ষুদ্র, জামানতবিহীন ঋণ ও চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুদের ব্যবসায় করত চক্রটি। তারা মূলত অর্থ সংকটে থাকা স্বল্প আয়ের লোকজন এবং বেকার ছাত্র-ছাত্রীদের টার্গেট করে। গ্রাহকরা অ্যাপস ডাউনলোড করে ইনস্টলের পর জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নম্বর, পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোন নম্বর, ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতেন। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি নিয়ে এবং উচ্চ হারে সুদ নির্ধারণ করে স্বল্প সময়ের জন্য ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ঋণ প্রদান করা হতো। গ্রাহক ৩০০০ টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা রেখে গ্রাহককে মাত্র ২ হাজার ১৯০ টাকা দেওয়া হতো।

৭ দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হতো ৩ হাজার ১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ প্রদান করতে হয়। এছাড়াও অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ টাকা এবং সুদ বাবদ ৫ টাকা কেটে রাখা হয়। তবে ঋণের পরিমাণ যত বেশি, টাকা কেটে রাখার প্রবণতাও বেশি। এ ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারকদের এ লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে অনেক গ্রাহক সর্বস্ব হারান।

নিরাপত্তা হুমকিতে গ্রাহকের ডিভাইস:
ডিবি পুলিশ জানায়, গ্রেফতাররা সরকারি অনুমোদন ছাড়া থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড, নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। আইনগত অনুমোদন ছাড়া তারা গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে। গ্রাহকরা এসব অ্যাপস ইন্সটল করার মাধ্যমে নিজেদের অজান্তেই তাদের মোবাইলের ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, দূর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি-ভিডিও ধারণ, মোবাইলের কন্টাক্টস পড়া, লাইভ লোকেশন দেখা, ফোনের স্ট্যাটাস এবং তথ্য সংগ্রহ, মেসেজ পড়া, পরিবর্তন করার অনুমতি দিয়ে দিচ্ছেন। আর অ্যাপস পরিচালনাকারীরা পরে সেখান থেকে গ্রাহকের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করে।

ব্যবহারকারীদের জন্য পুলিশের সতর্কবার্তা:
এ ধরনের অ্যাপস ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে ডিবি কর্মকর্তা হাফিজ আক্তার বলেন, যে কোনো অ্যাপস ইন্সটল করার পর অথবা কোনো লিংকে প্রবেশ করার পর ব্যক্তিগত তথ্যাদি প্রদান করার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য যত্রতত্র শেয়ার না করা যাবে না। আমরা চাই না আমাদের দেশে কেউ অবৈধভাবে সুদের ব্যবসা করবে এবং এর মাধ্যমে কেউ প্রতারিত হবে। এরা মূলত গ্রামের মহাজনদের মতো সুদের ব্যবসা করে আসছে। মহাজনরা যেভাবে টাকা প্রদানের আগেই সুদের টাকা কেটে রাখত। এরাও একই রকম কাজ করছে।


 

আরও পড়ুন

আরও