রাজা রিমান্ডে, আদালতে নারীর জবানবন্দি
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২ | ২ ভাদ্র ১৪২৯

>

চলন্তবাসে গণধর্ষণ, ডাকাতি
রাজা রিমান্ডে, আদালতে নারীর জবানবন্দি

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৪, ২০২২

রাজা রিমান্ডে, আদালতে নারীর জবানবন্দি
টাঙ্গাইলে চলন্তবাসে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সকল যাত্রীর কাছ থেকে সর্বস্ব লুট ও এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার ডাকাত দলের সদস্য রাজা মিয়ার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাদল কুমার চন্দ্র এ রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। 

এর আগে দুপুরে ডিবি পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে গ্রেফতার রাজাকে আদালতে হাজির করেন। 

রাজা মিয়া (৩২) টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা গৌরস্থান এলাকায় মৃত হারুন অর রশীদের ছেলে।

অপরদিকে ধর্ষণের শিকার ওই নারী আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ বিকেলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুন তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। 

টাঙ্গাইলের কোর্ট ইন্সপেক্টর তানভীর আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের দেওলা এলাকা থেকে রাজাকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় তার কাছ থেকে লুট হওয়া ৩টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। বাসের চালক ও হেলপারকে জিম্মির পর রাজা মিয়া গাড়ি চালিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানায়। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঈগল পরিবহনের একটি বাস অন্তত ২৪ জন যাত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে রাত ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জে জনতা নামে একটি হোটেলে খাবারের জন্য বিরতি দেওয়া হয়। সেখান থেকে সাড়ে ১১টার দিকে যাত্রা করলে ৫ মিনিট যাওয়ার পর মূল সড়ক থেকে প্রথমে ৪ জন যাত্রী উঠেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আরও ৩ জন যাত্রী উঠে। আরও ৫ মিনিট যাওয়ার পর নির্ধারিত স্টেশন ছাড়া আরও ৩ জনযাত্রী বাসে উঠেন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর আনুমানিক রাত দেড় টার দিকে যাত্রীরা ঘুমানোর এক পর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের টাঙ্গাইলের নাটিয়াপাড়া এলাকা পৌঁছালে ডাকাত দলের সদস্যরা অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে পুরো বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন। প্রথমে পুরুষ যাত্রীদের তাদের পোশাক খুলে হাত মুখ বাঁধা হয়। অপরদিকে নারী যাত্রীদের বাসের পর্দা ও সিটের কভারখুলে মুখ এবং হাত বেঁধে ফেলা হয়। পরে অস্ত্রের মুখে বাসের চালক ও হেলপারকে জিম্মি করা হয়। এ সময় ডাকাত দলের সদস্য রাজা বাস চালায়। 

তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের গোড়াই এলাকা থেকে বাসটিকে ইউটার্ন করে এলেঙ্গা হয়ে ময়মনসিংহ রোড ধরে যেতে থাকে। এরই মধ্যে যাত্রীদের কাছে থাকা মোবাইল, টাকা, কানের দুল, হাতের বালা, গলার চেইন লুট করে নেয়া হয়। পরে ৫ থেকে ৬ জন ডাকাত সংঘবদ্ধভাবে গাড়িতে থাকা এক নারীকে ধর্ষণ করে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের পাশে বালুর ঢিবির কাছে বাসের গতি থামিয়ে পালিয়ে যায় তারা। 

এ ব্যাপারে যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার হেকমত নামে ওই বাসের যাত্রী বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। 

ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে ধর্ষণের শিকার ওই নারীর টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তার সোয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই নারীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. রেহেনা পারভীনের নেতেৃত্বে এ ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। 

জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ওই নারীকে ধর্ষণের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে। ওই নারী বাঁধা দেয়ার ফলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে সোয়াব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যাবে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না। 

ওই নারী গার্মেন্টে কাজ করতে যাচ্ছিলেন

ধর্ষণের শিকার ওই নারী গার্মেস্টে কাজ করার জন্য বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন। তিনি বিবাহিতা। নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার আগেই তিনি গণধর্ষণের শিকার হন। মধুপুর থানার ওসি মোহাম্মদ মাজহারুল আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

যাত্রীদের বর্ণনা 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলীর বলেন, রাত ১২টার দিকে মহাসড়কের ওপর একটি জায়গায় চারজন তরুণ বাসের সামনে থেকে হাত তুলে ইশারা দেন। বাসচালকের সহকারী সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। দু-এক মিনিটের মধ্যে তরুণেরা বাসে উঠে পড়েন এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বাসের পেছনের দিকে গিয়ে বসেন। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক ছিল। তাদের একজনের পিঠে ব্যাগ ছিল। তারা পেছনে বসার পরপরই মোবাইল টেপাটিপি করতে থাকেন। বাস আরও ১৫ মিনিটের মতো চলে। এরপর রাস্তা থেকে আরও পাঁচজন একইভাবে বাসে উঠেন। তারাও কয়েকটি সিটে বসে পড়েন। কয়েক মিনিট পর সামনে গিয়ে আরও দুজন উঠেন। এর পরপরই বাসের চালককে বাস থামাতে বলা হয়। চালক থামাতে রাজি না হলে তাকে মারধর করে করা হয়। একজন দ্রুত তাকে সরিয়ে চালকের আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন।

তিনি আরো বলেন, কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই ১০ জন বাসের প্রতিটি সিটের পাশে পাশে দাঁড়িয়ে পড়েন। তারা ছুরি ও কাঁচি পুরুষ যাত্রীদের গলায় ধরে রাখেন। তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজন দ্রুত বাসের পর্দা কেটে পুরুষ যাত্রীদের মুখ, হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। বাসের মাঝখানের লম্বা জায়গায় মাথা নিচু করে তাদের বসিয়ে রাখেন। বাসে থাকা কয়েজন নারী যাত্রীর মধ্যে একজনের চোখ, মুখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়। বাকিদের চোখ, মুখ ও হাত খোলা ছিল। বাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। জানালার গ্লাসগুলো আটকে দেওয়া হয়। ডাকাতেরা প্রত্যেকের কাছে গিয়ে শরীর তল্লাশি করে টাকা, মুঠোফোন এবং নারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার লুট করে নেয়। 

অতীতের আরও ঘটনা

এদিকে টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকটি গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে রূপাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে বাসের চালক-হেলপারসহ অন্য সহযোগীরা। এরপর টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে রূপার মরদেহ ফেলে যায় তারা। ঘটনার দু’দিন পর ২৮ আগস্ট ময়মনসিংহ-বগুড়া সড়কে চলাচলকারী ছোঁয়া পরিবহনের বাসের হেলপার শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর এবং চালক হাবিবুর ও সুপারভাইজার সফর আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা প্রত্যেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড ও একজনের সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

অপরদিকে ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মৌচাকে কর্মরত এক পোশাককর্মী টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে ভোর পাঁচটার দিকে ‘বিনিময় পরিবহনের’ একটি বাসে কালিয়াকৈরের উদ্দেশে রওনা দেন। এ সময় বাসে যাত্রী না থাকার সুযোগে বাসটি কিছুদুর যাওয়ার পর সুপারভাইজার বাসের জানালা দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে গাড়ির চালক হাবিবুর রহমান নয়ন তাকে ভয়ভীত প্রদর্শন করে পেছনের ছিটে নিয়ে ধর্ষণ করে। পর্যায়ক্রমে বাসের সুপারভাইজার রেজাউল করিম ও হেলপার ভুট্ট পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে বাসটি ঢাকা না গিয়ে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ রোডের মধুপুরের একটি ফাঁকা জায়গায় নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ২২ মে চার পরিবহন শ্রমিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। সেই সাথে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা ধার্যও করা হয়।

অন্যদিকে ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব থানা বাসস্ট্যান্ডে এক প্রতিবন্ধী নারী বাস থেকে নামছিল। এ সময় টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পরিবহনের চালক আলম মিয়া এবং সহকারী নাজমুল হোসেন ওই নারীকে বাস থেকে নামতে বাধা দেয়। হেলপার নাজমুল গেটে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় এবং চালক আলম ওই নারীকে ধর্ষণ করে। পরে তার কান্নার আওয়াজ শুনে বাসস্ট্যান্ডের লোকজন টহল পুলিশকে বিষয়টি জানায়। তারা এসে ওই নারীকে উদ্ধার করে এবং বাসের সহকারী নাজমুলকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনার পরদিন বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করা হয়। পরে ২ সেপ্টেম্বর রাতে বাসের সুপারভাইজারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৯ নভেম্বর বাস চালক আলম খন্দকারকে গ্রেফতার করা হয়। 

এ প্রসঙ্গে গোড়াই হাইওয়ে পুলিশের ওসি মোল্লা টুটুল বলেন, মহাসড়কে ডাকাতি রোধে হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। টহল বৃদ্ধি বেশি করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় গাড়িগুলো চেক করা হচ্ছে। যাত্রীদেরকে জিজ্ঞাসাও করা হয় কোন সমস্যা হচ্ছে কি না। অনেক সময় বাইরে থেকে বাসের ভেতরের পরিস্থিতি বুঝা যায় না। 

টাঙ্গাইলের বাস কোচ মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, এলেঙ্গা থেকে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর পর্যন্ত খুব কম গাড়ি চলে। বন এলাকায় তারা অপরাধ নিরাপদ বলে মনে করছে। এই অঞ্চলে হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম চেক পোস্ট বসাতে হবে। 

তিনি আরো বলেন, উত্তরবঙ্গের গাড়িগুলো থামিয়ে চেক করা প্রয়োজন। এর ফলে অনেক অপরাধ কমে যাবে। দূর পাল্লার যে কোন গাড়ি একটি জায়গায় থামাতে পারবে বলে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সব পরিবহনই এ নির্দেশনা মানতে না। গণপরিবহনকে উন্নত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। 

টাঙ্গাইলের চলন্তবাসে একাধিক ধর্ষণের ঘটনায় কথা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি খান মোহাম্মদ খালেদের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদকে বলেন, হাইওয়ে পুলিশকে আরো সর্তক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সামাজিক অস্থিরতার কারণেই এই অপরাধগুলো বেড়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধী শাস্তির আওতায় আসে না। এই কারণেই ডাতাতির রাহাজানির মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। মাদকের সহজ লভ্যতাও কিংবা অধিক সংখ্যক মাদক গ্রহণের কারণেও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। 

তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে অনেক নারী যাত্রী রাতে বাসে যাতায়াতে শঙ্কা বোধ করছেন। 

এসবি

 

আরও পড়ুন

আরও
               
         
close