করোনা সংকট এবং ব্র্যাক ও গার্মেন্টস শিল্পের মুনাফামুখীতা
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

করোনা সংকট এবং ব্র্যাক ও গার্মেন্টস শিল্পের মুনাফামুখীতা

ড. মারুফ মল্লিক ১:২৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০২০

করোনা সংকট এবং ব্র্যাক ও গার্মেন্টস শিল্পের মুনাফামুখীতা
করোনা কঠিন এক সংকটময় পরিস্থিতির মুখে দাড় করিয়েছে সময়কে। জীবন রক্ষা না অর্থনীতির চাকা সচল রাখা; এটাই এখন গুরুত্বপূণূ প্রশ্ন। করোনা দমাতে সামাজিক দুরত্বই সর্বশেষ কার্যকর সমাধান। তবে সমস্যা করছে মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আর বসে থাকার পক্ষে না। এরা লক ডাউনের বিরুদ্ধে সরব। জীবনের সঙ্গে পুঁজি ও মুনফার লড়াই প্রকট হচ্ছে। চরম পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতেই মূলত এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইদানিং নিউ নরমালের কথা বলছেন অনেকেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎপাদনও অব্যাহত থাকবে এবং এই সংকটের সঙ্গে মানিয়েও নিতে হবে। কিন্তু নিউ নরমাল মানেই অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য ঝাপিয়ে পড়তে হবে না। বরং করোনোর প্রকোপকে যথা সম্ভব নিয়ন্ত্রনে এনে শিল্প কারখানা পুনরায় চালু করতে হবে। এতে করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমবে আবার অর্থনীতিও সচল থাকবে। জীবন ও জীবিকা দুটোই রক্ষা পাবে। জার্মানীসহ বিভিন্ন দেশ এই নীতি অবলম্বন করেই করোনার রাশ টেনে ধরেছে।

করোনা কালে অনেক দেশে নিউ নরমাল মানে জীবন রক্ষা করে জীবিকার নিশ্চয়তা অনুসন্ধান করা। আমাদের দেশে নিউ নরমাল হচ্ছে জীবন বিলিয়ে দিয়ে জীবিকা রক্ষা করা। বস্তুত এই জীবিকার আড়ালে আছে মালিক শ্রেণীর মুনাফার নির্মম লোভ। নিউ নরমালের নামে মুনাফার পিছু ছুটছে পোশাক শিল্প মালিকরা। তবে বিস্ময়কর হচ্ছে শিল্প মালিক শ্রেনীর সঙ্গে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাও এই মুনাফার মিছিলে যোগ দিয়েছে। রোজার ঈদের আগে সীমিত আকারে বিপনীবিতান ও মার্কেটগুলো খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বড় বড় মার্কেট ও বিপনী বিতানগুলো জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে খুলতে রাজি হয়নি। কিন্তু ওই সময় জরুরি সেবাখাত বাদে শুধু গার্মেন্টস, ব্র্যাকের আড়ং ও ক্ষুদ্র ঋনের কিন্তি তোলার কাজ চালু ছিল।

এতে করে ব্র্যাক ও গার্মেন্টস মালিকদের মুনাফামুখী চরিত্র ফুঁটে উঠেছে দুর্যোগের সময়ও। সাধারণ ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভ সংবরণ করতে পারলেও বিশ্বের সব থেকে বড় এনজিও ব্র্যাক পারেনি। আর গার্মেন্টস মালিকরা যে পারবে না তা বলাই বাহুল্য । বাস্তবতা হচ্ছে পুঁজি ও মুনাফার লোভে ব্র্যাক ও গার্মেন্টস মালিকরা একই কাতারে নেমে এসেছে। বরং দুর্যোগের মধ্যে ব্র্যাকের এক ধরনের রূপান্তর আমরা দেখতে পাই। ব্র্যাকের আচরনে উন্নয়ন সংস্থা থেকে পুঁজিবাদী মুনাফামুখী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিনত হওয়ার প্রতিফলন স্পষ্ট।

করোনা নিয়ে ব্র্যাকের অবস্থান শুরু থেকেই পরিস্কার ছিল। ল-নের ইমেপেরিয়াল কলেজকে উদ্ধৃত করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানিয়েছিলেন দেশে কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ মারা যাবে। পরে ওই শিক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। করোনা নিয়ে অনুমান ভিত্তিক প্রতিবেদন বিশ্বে প্রতিদিন শত শত প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের আগাম মন্তব্যের জন্য এক মাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আরা কোনো দেশে কারন দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই।

কার্যত ব্র্যাক ও পোশাক শিল্প মালিকদের মধ্যে আচরনগত কোনো পার্থক্য নেই। উভয়পক্ষই লক ডাউনের বিপরীতে গিয়ে কৌশলে হার্ড ইমিউনিটির পক্ষে উপকালতি করেছে। হার্ড ইমিউনিটিকে মোকাবেলা করার মত আমাদের সামর্থের বিবেচনা না করেই তারা অদ্ভুত সব যুক্তি দাড় করিয়েছে। ব্র্যাকের নিবার্হী পরিচালক আসিফ সালেহ নিজেই বিভিন্নভাবে বর্নিল আঞ্চলিক লক ডাউনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। গার্মেন্টস শিল্প মালিকরা বিদেশি ফরমায়েশ ছুটে যাওয়া, হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার যুক্তি দিয়ে গার্মেন্টস খোলা রাখার যুক্তি দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় যেখানে সারাদেশে কঠোর লক ডাউন করা উচিত সেখানে ব্র্যাক বা পোশাক শিল্প মালিকদের সরসারি আঞ্চলিক লক ডাউন বা পক্ষান্তরে হার্ড ইমিউনিটির প্রচারনা করা কতটুকু যুক্তি সঙ্গত। গনহারের করোনা ছড়িয়ে পড়ার দায় অনেকের সঙ্গেই কি ব্র্যাক বা পোশাক শিল্পের মালিকরা এড়াতে পারবেন।

ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ নিজেই এই প্রচরানার অগ্রভাগে ছিলেন। তার ফেসবুক স্টেটাস পর্যবেক্ষণ করলেই ব্র্যাকের অবস্থান পরিস্কার হয়ে যাবে। আসিফ সালেহ ৯ মে ফেসবুকের এক স্টেটাশে বলেন, করোনা ঝুঁকির মধ্যেও আড়ং খুলে দেওয়া হবে। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ, করেছেন আড়ং এর ৪৫ শতাংশ বিক্রি হ দুই ঈদ ও নববর্ষের সময়। বলা বাহুল্য নববর্ষে এবার আড়ং এর বেচাকেনা হয়নি। ঈদেও বিক্রি না হলে আড়ং এর সরবরাহকারীরা বিশাল বেকায়দায় পড়ে যাবে। কারণ ইতিমধ্যে আড়ং এর বিশাল স্টক জমেছে। স্টক খালি না করতে পারলে নতুন পন্য নেওয়া যাবে না। আসিফ সালেহ আড়ং এর মুনাফার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন। আড়ং ব্র্যাকের একটি সফল লাভজনক বানিজ্যিক উদ্যোগ। আড়ং এর নিজস্ব সরবরাহকারীর সংখ্যা ৮০০। এদের সঙ্গে কাজ করেন ৩০ হাজার গ্রামীন নারী। আর আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের আছে ৩৫ হাজার সরবরাহকারী। ব্র্যাক এদের শিল্পী বলে উল্লেখ করে। মোট ৬৫ হাজার নারী শ্রমিক আড়ং এর পন্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত আছেন। করোনা সংকটের মধ্যে ব্র্যাক আড়ং এর সব সরবরাহকারীদের লভ্যাংশ বা বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারতো। এতে হয়ত আড়ং এর লাভ কমে যেত। কিন্তু ব্র্যাক বা আড়ং তো লাভ ছাড়তে রাজি না। তাই ইনিয়ে বিনিয়ে আড়ং খোলার পক্ষে যুক্তি দাড় করিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী। অন্য সব দোকান মালিকরা যখন নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঈদের আগে দোকান পাঠ বন্ধ রাখলেন, আড়ং এর বিক্রয় কর্মীরা মাস্কের আড়ালে বেশ হাসি হাসি মুখে পন্য বিক্রি করতে লাগলেন। মুনাফার কাছে হারেিয় গেল উন্নয়ন সংস্থার নীতি মূল্যবোধ।

শুধু আড়ংই খোলা রাখা হয়নি। করোনা কঠিন সময়েও ব্র্যাক ক্ষুদ্র ঋনের কিস্তি সংগ্রহ শুরু করে। ব্র্যাকের হিসাব মতে তাদের ৭০ লাখ ক্ষুদ্র ঋনের গ্রাহক আছে। ক্ষুদ্র ঋন নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাব মতে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এসব গ্রাহদের মধ্যে ৩১৭.৮১ বিলিয়ন টাকা ক্ষুদ্র ঋন হিসাবে বিতরণ করেছে। ব্র্যাকের ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে ৪ বিলিয়ন ডলার ২০১৮ সালে। এনজিওগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ঋন বিতরনে ব্র্যাকের অবস্থান শীর্ষে। এই মুহূর্তে বিভিন্ন দেশে ঋন মওকুফ করে আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। জার্মানীতে ব্যবসার জন্য ঋন নিলে আগামী দুই বছর কোনো কিস্তি প্রদান করতে হবে না। ব্র্যাক ঋন মওকুফ করতে না পারুক অন্তত ঋনের কিস্তি সংগ্রহ স্থগিত রাখতে পারত এক বছরের জন্য। এতে করে গ্রামীন অর্থনীতি ঘুরে দাড়ােনর সুযোগ পেত।

এখানেই ব্রাক ও গার্মেন্টস মালিকদের মধ্যে নীতিগত নৈকট্য লক্ষ্য করা যায়। দুই পক্ষই দরিদ্র শ্রেনীর দুর্দশার কথা বলে নিজেদের মুনাফার পিছনে ছুটেছে। আমরা বছরে গার্মেন্টস শিল্পের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গল্প শুনি। বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসে এই খাত। এর আবার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বিদেশে চলে যায় এলসি খুলতে। এরপর প্রনোদনা, আমদানী শুল্কে ছাড়, স্বল্প সুদে ঋন নানাবিদ সুবিধা তাদের দেওয়া হয়। এত কিছু দেওয়ার পর এ শিল্প নিজের পায়ে এখানো দাড়াতে পারেনি। স্বাভাবিক সময়েও শ্রমিকদের বেতনভাতা নিয়মিত দেওয়া হয় না। প্রতি ঈদের আগেই বেতনভাতার জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়। এত বৈদেশিক মুদ্রা কোথায় যায়? মালিক শ্রেনীর উন্নতি হয়। শ্রমিকরা আরো দরিদ্র হয়। এ খাতের উন্নতির গ্রাফ বিপরীতুমখী। পোশাক শিল্পের উন্নয়ন সবই ফাঁকা বুলিতে পরিনত হয়েছে। শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দেওয়ার সামর্থ নেই এদের। তাই করোনার শুরুতেই তাদের ৫ হাজার কোটি প্রনোদনা দিয়েছে সরকার। এই টাকায় আদৌ শ্রমিকদের কোনো উপকার হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। বরং শ্রমিক ছাটাই করছে। মালিকশ্রেণী ফরমায়েশ ছুটে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে করোনার মধ্যেই শ্রমিকদের একরকম জোর করেই রাজধানীতে নিয়ে এসেছে। রাজধানীতে এসে শ্রমিকরা আবার ফিরে গিয়েছে। এতে করে করোনা বিস্তারের শংকা আরো বেড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পের ফরমায়েশ এমনিতেই বাতিল হওয়ার কথা। ইউরোপের বড় বড় পোশাক আমদানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আউটলেট বন্ধ করে দিচ্ছে। শ্রমিক ছাঁটাই করছে। এমনিতেই ফরমায়েশ কমে যাবে বা বাতিল হবে। ৫ হাজার কেন ১ লাখ হাজার কোটি টাকা প্রনোদনা দিলেও ফরমায়েশ কিছু বাতিল হবেই। তাই পোশাক খাতে প্রনোদনা না দিয়ে সরকারের অন্য খাতের মনযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

সরকার ব্র্যাক ও গার্মেন্টস শিল্প মালিকরা সরকারকে ভুল পতে পা দিতে উৎসাহিত করেছে। সরকারের উচিত ছিল কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মাঠে গত দুুমাসে কম বেশি ৪ লাখ মে. টন ফসল ছিল। এর মধ্যে ২ লাখ মেট্রিক টন ধান ও ২ লাখ মেট্রিক টন অন্যান্য ফসল। যেমন আম, সবজি। অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি ও কৃষিজাত পন্য পরিবহণ ও বাজারজাত করার উদ্যোগ নিতে পারত সরকার। আর পোশাক শ্রমিকসহ দরিদ্রদের সরাসরি আর্থিক অনুদান দেওয়া দরকার ছিল। ফলে জনসাধারনের ক্রয় ক্ষমতা স্বাভাবিক থাকত এবং আর্থিক লেনদেন অবস্থা কিছুটা সচল থাকতো। জার্মানিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে এই নীতিই অবলম্বন করা হয়েছে। নাগরিকেদের সরকার টাকা দিচ্ছে বিভিন্নভাবে আর খাদ্যপন্যের দোকান খোলা রাখছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য শিল্প বন্ধই ছিল। ফলে অর্থনীতি একেবারে স্থবির হয়ে পড়েনি। বরং তাদের অর্থনীতি আস্তে আস্তে সচল হচ্ছে। আর আমরা ক্ষুদ্র ঋন, আড়ং ও বৈদেশিক মুদ্রার ফাঁদে আটকে আছি।

ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

: আরও পড়ুন

আরও