ফেনীতে পতিত জমিতে চাষ হচ্ছে শীতকালীন নানা ফসল
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১ | ৫ মাঘ ১৪২৭

ফেনীতে পতিত জমিতে চাষ হচ্ছে শীতকালীন নানা ফসল

ফেনী প্রতিনিধি ২:৩৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০২১

ফেনীতে পতিত জমিতে চাষ হচ্ছে শীতকালীন নানা ফসল
সরকারী প্রণোদনা ও প্রদর্শনী বাড়ানোয় ফেনীতে রবি মৌসূমে আবাদী জমি বেড়েছে।

চলতি মৌসুমে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমূখী, চীনাবাদাম ও শীতকালীন সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পে জেলায় ১৩ হাজার ৫০০ কৃষকের মাঝে ৪৫ লাখ ১৪ হাজার টাকার বীজ ও সার এবং ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার কৃষকের মাঝে হাইব্রীড বীজ বিতরণ করা হয়েছে।

৯৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যায়ে নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুর কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪৮৩টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিনামূল্যে বীজ, সার ও প্রদর্শনী ব্লক পেয়ে অনেক কৃষক অনাবাদী ও পতিত জমিতে বিভিন্ন ফসল করেছেন।

প্রণোদনা ও প্রদর্শনী বেশি পাওয়ায় ফেনীতে বিগত বছরের তুলনায় এবার ৪ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে রবি মৌসূমে চাষাবাদ হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, ফেনীতে ১৩৪ কৃষি ব্লকে মোট ৬৯ হাজার ৫৫২ হেক্টর চাষাবাদ যোগ্য জমি রয়েছে। রবি মৌসূমে এসব জমির ৪৯ হাজার ৭৯১ হেক্টর আবাদযোগ্য রয়েছে। কিন্তু কৃষকরা নানা সমস্যার কারণে রবি মৌসুমে অনেক জমি অনাবাদী রেখে দেন। গত রবি মৌসূমে জেলায় ২৯ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়।

প্রণোদনা ও প্রদর্শনী পেয়ে এবার তা বেড়ে ৩৩ হাজার ৮৫৫ হেক্টরে দাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী মৌসূমে সরকারী প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে রবি মৌসূমে আবাদযোগ্য পুরো ৪৯ হাজার হেক্টর জমিই চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

এই বিষয়ে কৃষকেরা বলছেন, রবি মৌসূমে যে কোনো ফসলের জন্যই কম-বেশি সেচের প্রয়োজন পড়ে। সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে কিন্তু সেচের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কৃষক ইচ্ছা থাকলেও তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেনা।

শীতের স্থায়িত্বকাল কম হওয়া, কোনো কোনো বছর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অতিবৃষ্টি হওয়ায় কৃষকরা রবি মৌসূমে আবাদী জমিতে ফসল ফলানো থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু চলতি মৌসূমে সরকারী বীজ ও সার পেয়ে পুরো দমেই কৃষকরা চাষাবাদে মনোযোগী হয়েছেন। এতে করে জেলা জুড়ে বাড়ছে আবাদ, বাড়বে উৎপাদন, কমবে খাদ্য ঘাটটি।

কৃষি বিভাগ আরো জানায়, ফেনীতে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৪ পরিবারের মধ্যে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩২০টি পরিবার কৃষি কাজের সাথে জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ৮৭৮ ক্ষুদ্র ও ৫৮ হাজার ৭২ টি প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের বেশির ভাগ কৃষকই অস্বচ্ছল ও দ্ররিদ্র সীমার নিচে বসবাস করেন। রবি মৌসূমে আবাদ একটু বেশি খরচ পড়ায় বিগত বছরগুলোতে অনেক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক চাষাবাদ বিমুখ থাকতো। কিন্তু এবার প্রণোদনা ও প্রদর্শনী পেয়ে তারাও আবাদে ফিরেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিঠুন ভৌমিক জানান, চলতি রবি মৌসূমে বোরো, গম, ভূট্টা, সরিষা, সূর্যমূখী, চিনাবাদাম, মুগ চাষাবাদের জন্য ফেনীতে সাড়ে ৩ হাজার কৃষকের মাঝে ৪৫ লাখ ১৪ হাজার টাকার বীজ ও সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

৬ লাখ ৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ১ হাজার বিঘা বোরো আবাদের জন্য কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ১ মেট্টিক টন বীজ ও ২০ মেট্টিক টন সার বিতরণ করা হয়েছে। একইভাবে ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০০ বিঘা গম চাষের জন্য বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।

৫০০ বিঘা করে ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ১৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ১ হাজার বিঘা সূর্যমূখী চাষ করার জন্য ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকার বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও চীনাবাদাম ও শীতকালীন মুগ চাষের জন্য জেলা জুড়ে ৩০০ জন ৩ লাখ ৯২ হাজার টাকার বীজ ও সার বিনামূল্যে পেয়েছেন কৃষকরা।

জেলায় বোরো ও সূর্যমূখী চাষের জন্য ২ হাজার কৃষক, ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য ১ হাজার কৃষক, গম ও চীনাবাদাম চাষের জন্য ৪শ জন কৃষক, ও শীতকালীন মুগ চাষের জন্য ১শ জন কৃষককে সরকারী এ প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হয়।
এছাড়াও জেলাজুড়ে নির্বাচিত ১০ হাজার কৃষককে ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে হাইব্রীড ধানের বীজ দেয়া হয়েছে।

এদিকে নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও চাঁদপুর কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মনিটরিং ও মূল্যায়ন অফিসার কৃষিবিদ মো. জুলফিকার আলী জানান, কৃষক পর্যায়ে উন্নত জাতের ফসল উৎপাদনের জন্য জেলায় চলতি মৌসূমে ৯৩ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৩ জাতের ১ হাজার ৪৮৩টি প্রদর্শনী করা হয়েছে।

এসব প্রদর্শনীতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে থাকে। নতুন নতুন জাতের ফসল উৎপাদনের প্রতি কৃষকদেরকে আগ্রহী করে তুলতে কৃষকের জমিতে ফসল চাষ করে তা প্রদর্শনী করা হয়ে থাকে। প্রদর্শনীস্থলে কৃষকমাঠ দিবস, কৃষি বিষয়ক সভা, উদ্বুদ্¦করণ সভার আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীর জমিতে উৎপাদিত ফসলের ফলন দেখিয়ে পরবর্তী মৌসূম গুলোতে আশপাশের কৃষকদের ওই ফসল উৎপাদনে আগ্রহী করে তোলা হয়।

সংশ্লিষ্ট বিভাগের রবি মৌসূমের ১৯-২০ ও ২০-২১ সালের প্রতিবেদন বিশ্লেষন করে দেখা যায়, বিগত বছর রবি মৌসূমে ৭টি ফসলে জেলায় ২৯ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। কিন্তু এবার সরকারী প্রণোদনায় তা বেড়ে ৩৩ হাজার ৮৫৫ হেক্টরে উর্ণীত হয়েছে। এর মধ্যে বোরো ধান ২৬ হাজার ২১০ হেক্টরের স্থলে চলতি মৌসূমে ৩০ হাজার ৭৫ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর বেশি। এছাড়াও বিগত বছরের তুলনায় এবার ৩৪০ হেক্টর সরিষা, ২৭ হেক্টর চিনাবাদাম, ২০ হেক্টর সূর্যমূখী, ২৮ হেক্টর মুগ, ৫০ হেক্টর ভূট্টা বেশি চাষাবাদ হয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলার কাজীরবাগ ইউনিয়নের কৃষক আবদুল কুদ্দুস জানান, প্রায় ১ যুগ ধরে তার বাড়ির পাশের ৩ বিঘা জমিতে রবি মৌসূমে কোন চাষাবাদ হতোনা। কিন্তু এবার ১ বিঘা জমিতে সরিষা চাষাবাদের জন্য তিনি বিনামূল্যে সরকারী বীজ ও সার পেয়েছেন। তাই নিজের থেকে আরো কিছু পুঁজি দিয়ে ৩ বিঘায় সরিষা আবাদ করেছেন। তার মতে, এলাকার আরো অনেক কৃষক প্রণোদনার সার ও বীজ পেয়ে বিভিন্ন রকমের ফসল আবাদ করেছেন। যার কারণে এবার অনাবাদী জমির পরিমান অনেক কমে গেছে।

ফেনী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বিথী জানান, অত্যান্ত সতর্কতার সাথে প্রকৃত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। তালিকা প্রস্তুতকালে প্রকৃত চাষীদের নির্বাচন করতে পারায় বিগত বছরের তুলনায় এবার আবাদ ও উৎপাদন পরিস্থিতিতে এর সুফল দেখা যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক তোফায়েল আহমদ চৌধুরী জানান, কৃষকদেরকে উৎপাদনে উৎসাহী করে উৎপাদন বাড়াতে বর্তমান সরকার ফেনীসহ সারা দেশে প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করেছে।

এছাড়াও ৫ জেলা কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনী স্থাপনসহ নানা কার্যক্রমে জেলায় এক ফসলী জমিকে দ্বি-ফসলীতে রূপান্তর ও দ্বি-ফসলী জমিকে তিন ফসলী জমিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা চলছে। এদিকে পানিউন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে আইএমআইসি প্রজেক্টের আওতায় ৮১টি স্কীম চালু হচ্ছে। স্কীমগুলো পুরোপুরী আবাদের কাজে লাগলে ফেনীতে রবি মৌসূমে আবাদ আমন মৌসূমের সমপরিমানে উন্নীত হতে পারে।

জেলা প্রশাসক ও জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি আবাদযোগ্য মাটি উৎপাদনের আওতায় আনতে নানামুখি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। কৃষকদেরকে নানা ধরনের প্রণোদনা ও সহায়তা দিয়ে তাদেরকে উৎপাদনে মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসকে/

 

আরও পড়ুন

আরও