অর্থসংকটে চট্টগ্রাম শহর ছাড়ছে প্রবাসী পরিবারগুলো
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ২০ আষাঢ় ১৪২৭

অর্থসংকটে চট্টগ্রাম শহর ছাড়ছে প্রবাসী পরিবারগুলো

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম ২:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

অর্থসংকটে চট্টগ্রাম শহর ছাড়ছে প্রবাসী পরিবারগুলো
নাসরিন সুলতানা। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে থাকেন চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানার মোহাম্মদপুর আবাসিকের ভাড়া বাসায়। ছেলে-মেয়ে দুটোই পড়ালেখা করে নগরীর স্বনামধন্য বাওয়া স্কুলে। ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে, মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে।

সোমবার (২৯ জুন) সকালে বাসা ছেড়ে দিয়ে ট্রাকযোগে আসবাবপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। বাসা ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বামী কাতার প্রবাসী। সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর থেকে তিনি বেতন না পাওয়ায় ঘর ভাড়ার টাকা দিতে পারছি না। ফলে বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দিতে বলেন, তাই গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছি।

নাসরিন সুলতানা বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানে। স্বামী রাকিব কাতারে সেনাবাহিনীতে কোম্পানীর অধীনে চাকরি করেন। ছেলে-মেয়েকে একটু উন্নত শিক্ষার আসায় চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। ছেলে-মেয়ে দুটো বাওয়া স্কুলে পড়ে। কিন্তু বাসা ছেড়ে দেওয়ায় এখন তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার মনে হচ্ছে। অন্যদিকে বেতন না পেয়ে স্বামীও চাকরি ছেড়ে দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

শুধু নাসরিন নয়, তার মতো প্রতিদিন ভারাক্রান্ত মনে বোবা কান্না নিয়ে চট্টগ্রাম শহর ছাড়ছে শতশত প্রবাসী পরিবার। এমন তথ্য জানা গেছে নগরীর একাধিক আবাসিক কল্যাণ সমিতির দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বাড়িওয়ালাদের সাথে কথা বলে। যাদের করুণ চিত্র ফুটে উঠে এ তথ্যে।

নগরীর মোহাম্মদপুর আবাসিক কল্যাণ সমিতির সদস্য মাওলানা আজহারুল ইসলাম জানান, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে মোহাম্মদপুর আবাসিকে বসবাসকারী দেড়শতাধিক প্রবাসী পরিবার বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। প্রবাসী স্বামীরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে না পারায় বাড়ি ভাড়া দিতে পারেনি তারা। ফলে বাড়িওয়ালার চাপে বাসা ছেড়েছে তারা। আরও দুই শতাধিক পরিবার বাসা ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এদের অনেকে বাড়িওয়ালার ভয়ে বাসায় তালা লাগিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে আছে।

চান্দগাঁও আবাসিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি হাসান মাহমুদ জানান, নগরীর বৃহত্তম এই আবাসিক এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা প্রবাসী পরিবারের। বিশেষ করে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, পটিয়া ও সাতকানিয়া উপজেলার শতাধিক প্রবাসী পরিবার রয়েছে। কিন্তু গত মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে থেকে এসব পরিবারে সংকট শুরু হয়। প্রবাসী স্বামীরা টাকা পাঠাতে না পারায় বাসা ভাড়া আটকে যায়। ফলে ৫০০-৬০০ প্রবাসী পরিবার ইতোমধ্যে বাসা ছেড়েছে। অনেক প্রবাসী পরিবার বাড়িওয়ালার কাছে ভাড়া মওকুফ চেয়ে বাসা ছেড়েছে।

চট্টগ্রামের অভিজাত নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকারও একই অবস্থা। এই আবাসিক এলাকা থেকে ৩০০ প্রবাসী পরিবার বাসা ছেড়েছে বলে জানান আবাসিক কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি হাজী মোক্তার হোসেন।

নগরীর মৌসুমী আবাসিক কল্যাণ সমিতির সদস্য নজির হোসেন বলেন, গত তিন মাসে আবাসিক এলাকা ছেড়ে গেছে ৪০০-৪৫০ প্রবাসী পরিবার। খুলশী আবাসিক কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুর রহমান জানান, গত দুই মাসে শতাধিক প্রবাসী পরিবার আবাসিক এলাকা ছেড়েছে।

আবাসিক কল্যাণ সমিতির নেতারা জানান, ভাড়া দিতে না পারায় বাসা ছাড়লেও ভাড়াটিয়ার অভাবে প্রতিটি আবাসিক এলাকার খালী বাড়িগুলোতে একের পর এক টু-লেট ঝুলছে। ভাড়াটিয়া মিলছে না। যা গত তিন দশকেও দেখা যায়নি। এতে বিপাকে পড়েছেন বাড়িওয়ালারা। কারণ অধিকাংশ বাড়িওয়ালার আয়ের উৎস এই বাড়ি ভাড়া।

নগরীর চান্দগাও আবাসিক এলাকার মমতাজ ভিলার মালিক আরমান বলেন, ৬ তলা ভবনের আমার চারতলার ৮টি ফ্লাটই খালী। এখানে প্রবাসী পরিবার থাকতো। কিন্তু ভাড়া দিতে না পারায় গত তিন মাসে তারা বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এতে আয় কমেছে। এ নিয়ে মহাসংকটে পড়েছি। গরীব এই দেশটা কখন যে করোনামুক্ত হবে আল্লাহই ভাল জানেন।

এদিকে অর্থ সংকটে প্রবাসী পরিবারগুলো শহর ছেড়ে যাওয়ার কারনে গ্রামে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, করোনা যেহেতু সংক্রমণ রোগ, সেহেতু শুরু থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে প্রবাসী পরিবারগুলো শহর ছেড়ে গ্রামে গেলে সেই সামাজিক দুরত্ব আর বজায় থাকে না। তাছাড়া পরীক্ষা ছাড়াই গ্রামে গিয়ে আক্রান্ত প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা স্বজনদের সংস্পর্শে গেলে তারাও করোনা আক্রান্ত হবেন। এ কারনে গত মে মাস থেকে গ্রামে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এরমধ্যে কোন কোন দিন শহরের চেয়ে উপজেলায় আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে।

তিনি বলেন, শহর এবং গ্রামে করোনা সংক্রমণ রোধে প্রবাসী পরিবারগুলোর গ্রামে যাওয়া ঠেকাতে হবে। তেমনি সামাজিক দুরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার দিকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন তিনি।

আইকে/জেডএস

 

: আরও পড়ুন

আরও