ফুটপাতে লাখো মানুষের জীবিকা
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫ মাঘ ১৪২৭

ফুটপাতে লাখো মানুষের জীবিকা

প্রীতম সাহা সুদীপ ও আরিফ সাওন ১২:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৩, ২০২১

ফুটপাতে লাখো মানুষের জীবিকা
ফুটপাতের আয়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেন লাখ লাখ মানুষ। ফুটপাতেই প্রতিদিন লেনদেন হয় কোটি কোটি টাকা। ফুটপাতের এই ব্যবসাকে ‘অবৈধ’ উল্লেখ করে বছরের পর বছর চলে উচ্ছেদ অভিযান।

সকালে অভিযান হলেও বিকালে বসে যান ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব। 

সেই ছোটবেলা; সাত-আট বছর বয়স হবে, তখন থেকে মা-বাবার সঙ্গে ঢাকায় আছেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির হোসনে আরা। এখন তার বেশ বয়স। তিনি তিন সন্তানের মা। বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। নাতনিও আছে। হোসনে আরা তার মা, বাবা, দুই মেয়ে, এক ছেলে, বড় মেয়ের জামাই-মেয়ে সবাই ঢাকায় এক সঙ্গে থাকেন। জীবনের এত বছরে কখনোই তাকে ফুটপাতে নামতে হয়নি। কিন্তু এই করোনা তাকে ফুটপাতে নামিয়েছে।

তিনি এখন রাজধানীর নতুন বাজার ফুটওভার ব্রিজের পাশে ফুটপাতে চা-বিস্কুট বিক্রি করেন। ছোট একটু জায়গা; গাছের সঙ্গে পাউরুটি ঝুলানো, ফ্লাস্কে চা, সামনে কয়েকটি বৈয়মে বিস্কুট-চকলেট, আছে পান-সুপারি-সিগারেটও।

প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এখানেই বসেন হোসনে আরা। তিনি জানান, তার বাসা বাড্ডায়। দুই রুমের বাসা। সব মিলিয়ে বাসা ভাড়ায় চলে যায় ৯ হাজার টাকা। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বেশ আগেই তিনি আলাদা হয়ে যান। তার মা আনোয়ারা বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। বাবা আব্দুল মালেক কোনো কাজ করতে পারেন না। হোসনে আরার মেয়ের জামাই চা পাতার ব্যবসা করেন। মেয়ে জামাইয়ের আলাদা সংসার। হোসনে আরা আর তার মায়ের আয়ের টাকায় চলে পাঁচজনের জীবিকা। শুধু এই হোসনে আরা নন। ফুটপাতের আয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন লাখ লাখ মানুষ।

মাছ, মাংস, সবজি, চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ফল, ফাস্টফুড, পোশাক, আসবাবপত্র, প্রসাধনসহ দাম হিসেবে মানহীন ও মানসম্মত নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যই এখন রাজধানীর ফুটপাতে পাওয়া যায়। যারা ফুটপাতে বসতে জায়গা না পান তাদের অনেকে ঝুড়ি কিংবা ভ্যানে ফেরি করে গলিতে গলিতে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন।

কথা বলে জানা গেছে, শখ করে সবাই ফুটপাতে ব্যবসায় বসেন না। আয়ের সব পথ যখন বন্ধ হয়ে যায় তখনই ভরসাস্থল হয় ফুটপাত। গ্রামে রোজগারের উপায় না পেয়ে বহু আগে থেকে এক শ্রেণির মানুষ কর্মের জন্য রাজধানীতে আসতে থাকেন। আর্থিক সচ্ছলতার আশায় আসা এসব মানুষ ভালোর আশায় ঘোরেন দ্বারে দ্বারে। এক পর্যায়ে যখন সুবিধা মতো চাকরি না পান, যখন আর উপায়ন্ত না থাকে, আবার গ্রামেই ফিরে যাবেন, গ্রামের মানুষ কী বলবে বা গ্রামে গিয়েই বা কি করবেন; এমন পরিস্থিতিতে তখন তাদের ভরসাস্থল হয় ফুটপাত।

প্রথমে হয়তো ফুটপাতের কারো দোকানের কর্মচারী; এরপর লাইনঘাট চিনে কেউ কেউ সামান্য আয়ের টাকা দিয়ে চা-সিগারেট কিংবা অন্য কোনো পণ্য নিয়ে বসেন। কেউ বা ভ্যান ভাড়া নিয়ে মাছ সবজি কিংবা ফল এলাকার গলিতে ফেরি করেন। তবে ফুটপাতের ব্যবসায়ী সবার ক্ষেত্র এক নয়। অনেক প্রভাবশালী বা বেশ টাকা পয়সার মালিকও কর্মচারী রেখে ফুটপাতে ব্যবসা করান।

কেউ ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া করান, কারো ছোট ভাই-বোনের লেখাপড়া-জামাকাপড়, কারো স্ত্রীর শাড়ি-গহনা; ভরণ-পোষণ, কারো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের টাকা আসে এই ফুটপাত দিয়ে। এক শ্রেণির মানুষের রুটিরুজি সবকিছুই নির্ভর করে ফুটপাতের আয়ের ওপর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, তিনি ফেরি করে মাছ বিক্রি করেন। যাত্রাবাড়ী কিংবা কারওরান বাজার আড়ত থেকে মাছ কিনে ভ্যানে করে নিয়ে বিভিন্ন গলিতে বাসার সামনে ঘুরে ‘মাছ লাগবে; মাছ’ বলে হাঁক দেন। কয়েক বছর আগে ঢাকায় আসেন তিনি। ছোট একটি পোশাকের কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু যে বেতন পেতেন তাতে নিজের খাবার জোটানোই ছিল মুশকিল। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেন।

তিনি বলেন, এখন মোটামুটি ভালোই আয় হয়। প্রতিদিন খুব ভোরে বের হন। দুপুরের মধ্যে বিক্রি করে বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেন। কোনো দিন ভালো লাভ হয়; আবার কোনো কোনো দিন লোকসানও হয়। তবে লোকসান গুনতে হয় মাসে হয়তো দু-একদিন।

এইচআর

 

আরও পড়ুন

আরও