কষ্ট আছে, তবে রঙ আলাদা
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

কষ্ট আছে, তবে রঙ আলাদা

খলিলুর রহমান ২:৫৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮

কষ্ট আছে, তবে রঙ আলাদা

কষ্টের আলাদা অদৃশ্য রঙ আছে। বাংলাদেশের মানুষকে কষ্টের সেই আলাদা রঙগুলো দেখিয়ে দিল এশিয়া কাপ। এক, দুই, তিন। এক এক করে এশিয়া কাপের তিনটি ফাইনাল খেলে ফেলল বাংলাদেশ। ক্রিকেট দেবতার আশির্বাদ না পাওয়ায় তিনটিতেই হার। তিনবারই পুড়তে হলো শিরোপা স্বপ্নভঙ্গের কষ্টে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই ‘তিন কষ্ট’ ধরা দিয়েছে আলাদা আলাদা রূপে। গতকাল শুক্রবার, দুবাইয়ের ফাইনালে ভারতের কাছে হারটিতে যেমন হতাশার কষ্ট নেই। আছে শুধু আক্ষেপের কষ্ট।

মাত্র ২২২ রানের পুঁজি নিয়েও মহাশক্তিধর ভারতের সঙ্গে ম্যাচের শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে হার। এমন হারে কি হতাশা থাকতে পারে! তবে আরেকবার শিরোপা স্বপ্নভঙ্গের আক্ষেপ আছে। সেই আক্ষেপের পুরোটাই ব্যাটিং নিয়ে। ইশ, যদি উদ্বোধনী জুটিতে লিটন-মেহেদীর এনে দেওয়া শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে অন্য ব্যাটসম্যানরা একটু দায়িত্বশীল হতেন! ইশ, যদি লিটনের সঙ্গে অন্তত একজন দাঁড়িয়ে যেতে পারতেন। ইশ, যদি ইমরুল, মুশফিক, মিঠুন, মাহমুদউল্লাহ, সৌম্যরা আর কয়েকটি করে রান করতে পারতেন! ইশ, বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা যদি পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করতে পারতেন!

এতোগুলো ইশকে একত্র করলে যে ইশটা দাঁড়ায়, সেটা হলো ইশ, যদি বাংলাদেশ আর ২০-২৫টা রান বেশি করতে পারত! হ্যাঁ, আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শুক্রবার ২০-২৫ রানের আক্ষেপেই পুড়েছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাশরাফির কণ্ঠেও ঝরেছে ২০-২৫ রানের আক্ষেপ। অদৃশ্যে এই ২০-২৫ রানের আক্ষেপটা আসলে বাংলাদেশের সব মানুষেরই।

২২২ রান নিয়েও রুবেল, মোস্তাফিজ, মাশরাফিরা যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, তাদের সেই লড়াইটাই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আক্ষেপটা আঁকিয়ে দিয়েছে। তাদের প্রাণ উজাড় করা লড়াই স্পষ্টই বলে দিচ্ছিল, আর ২০-২৫টা রান হলে দুবাইয়ের ফাইনালের ফলটা অন্য রকম হতো।

সেক্ষেত্রে হয়তো বাংলাদেশের শিরোপা স্বপ্নভঙ্গের কষ্টটা অদৃশ্য বিমানে চেপে আছড়ে পড়ত বিশালাকৃতির ভারতে! আর ভারতীয়দের শিরোপা উৎসবের আবেগ-উচ্ছ্বাসটা হাজার গুণ বৃদ্ধি হয়ে উড়ে এসে ভাসিয়ে দিত বাংলাদেশ নামের ব-দ্বীপকে! বাংলাদেশে আজ হয়ে যেত জাতীয় উৎসব।

এবারের শিরোপা স্বপভঙ্গের কষ্টটা তাই শুধুই আক্ষেপের। যে কষ্টের সঙ্গে মিশে আছে বুক চিতানো লড়াইয়ের বীরত্ব, মর্যাদা, তৃপ্তি, স্বস্তি সর্বোপুরি ভালোলাগা।

এবার পেছন ফিরিয়ে আগের দুটি এশিয়া কাপ ফাইনালের হারের কষ্টটা দেখে নেওয়া যাক। ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনাল হারের কষ্টটা ছিল সত্যিকারের কষ্ট। পুরো দেশ ডুবে গিয়েছিল কষ্টের সাগরে। সেটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলা। স্বাভাবিকভাবেই সেই ফাইনাল নিয়ে দেশবাসীর আবেগ-উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা ছিল অনেক বেশি।

ফাইনালে উঠার আগে বাংলাদেশ হারিয়েছিল টপ ফেভারিট ভারতকে। ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালেও জয়স্বপ্নের মালাই গাথে দেশবাসী। সেই স্বপ্ন আরও রঙিন হয় পাকিস্তানের ইনিংস শেষে। বাংলাদেশি বোলাররা মাত্র ২৩৬ রানেই বেঁধে ফেলে পাকিস্তানকে। ভারতের বিপক্ষে ২৮৯ রান টপকে জয় ছিনিয়ে নেয় মুশফিকুর রহীমের বাংলাদেশ। সেখানে ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় লক্ষ্য ছিল ২৩৭।

দেশবাসী তাই পাকিস্তান ইনিংসের পর থেকেই প্রথম বার এশিয়া শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠে। বাংলাদেশ ইনিংস শুরুর পর সেই স্বপ্ন ক্রমেই আরও রঙিন হয়। এক পর্যায়ে ৪ উইকেটেই বাংলাদেশ করে ফেলে ১৭৯ রান। তখন বারবারই টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠছিল এশিয়া কাপের রূপালী ট্রফিটি। ট্রফির সেই আলোকছটা যেন টিভি পর্দা ভেদ করে গেঁথে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে।

এরপর সাকিব আল হাসানের বিদায়ে পথটা একটু কঠিন হয়ে যায় বটে; তবে বাংলাদেশের জয় আশা শেষ ওভার পর্যন্তও ছিল। এমনকি শেষ বলেও সমীকরণ মেলানোর সুযোগ ছিল। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ৯ রান। হাতে ছিল দুটি উইকেট। তার চেয়েও বড় কথা, আশার প্রদীপ হয়ে উইকেটে ছিলেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু সেদিন তিনি সমীকরণটা মেলাতে পারেননি।

আইজাজ চিমার করা শেষ ওভারের প্রথম ৪ বলে ৫ রান তুলে নেন মাহমুদউল্লাহ-রাজ্জাক। শেষ দুই বলে দরকার ৪ রান। কিন্তু পরের বলেই আউট হন রাজ্জাক। রাজ্জাকের বিদায়ের মধ্যদিয়েই যেন শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের স্বপ্ন। কারণ, শেষ বলে দরকার ছিল ৪ রান। স্ট্রাইকে ছিলেন শেষ ব্যাটসম্যান শাহাদাত হোসেন।

তিনি ৪ মেরে দলকে জেতাবেন, এই আশা করাটা বোকামিই ছিল। তারপরও হয়তো দেশের মানুষ আশায় ছিল, কোনোভাবে বল শাহাদাতের ব্যাটের কানায় লেগেও তো ৪ হতে পারে! হতে পারে না কি! কিন্তু সেদিন সে রকম অলৌকিক কিছু হয়নি। কানায় লেগে ৪ হওয়া দূরের কথা, শাহাদাত বল ব্যাটেই লাগাতে পারেননি। প্যাডে লাগায় বাই হিসেবে নেন ১ রান। তীরে এসে তরী ডুবে বাংলাদেশের। শিরোপা স্বপ্ন জলাঞ্জলি হিসেবে পেতে হয় ২ রানের হার কষ্ট।

সত্যিই মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের সেই হার গভীর কষ্টে ডুবিয়েছিল দেশবাসীকে। দেশবাসীর হৃদয়ভাঙা কষ্টে বাড়তি প্রলেপ দিয়েছিল সাকিব-মুশফিকের কান্না। কাছে গিয়েও শিরোপা না পেয়ে কি কান্নাটাই না কেঁদেছিলেন সাকিব-মুশফিক! তাদের সেই কান্না দ্রুতই সংক্রমিত হয় ৫৫ হাজার বর্গমাইলজুড়ে! ক্রিকেট শুধু একটা খেলা নয়, হৃদয় পোড়ানো কষ্টের উপকরণও, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ হৃদয়ে দিয়েই বুঝেছিল সেদিন।

হার কষ্ট যে খেলোয়াড়দের, দর্শকদের শরীরি শক্তি শুষে নিয়ে পাথুরে মূর্তি বানিয়ে দিতে পারে, সেদিন সেটিই প্রমাণিত হয়েছিল। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরি ভাষাই বলে দিচ্ছিল, তাদের গায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো শক্তি আর অবশিষ্ট নেই! সব শক্তি শুষে নিয়েছে ২ রানের হার। একই অবস্থা ছিল গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদেরও।

ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলেন দর্শকরা, মনে হচ্ছিল যেন শোক মিছিল! গভীর কষ্টে যাদের জোর কদমে হাঁটার শক্তিটুকুও ছিল না। মনে হচ্ছিল, যেন হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাবেন!

২০১৬ এশিয়া কাপ ফাইনালে হারের গল্পটা পুরো বিপরীত। স্বস্তি, তৃপ্তির কোনো ব্যাপার তো ছিলই না। ছিল না আক্ষেপও। একমাত্র যে কষ্টটা ছিল, সেটা শুধুই হতাশার। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমনিতেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বিবর্ণ। সেদিন মিরপুরে আবার শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে ফাইনালটি বৃষ্টির কারণে নেমে আসে ১৫ ওভারে।

তাতে বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করে গড়তে পারে মাত্র ১২০ রানের পুঁজি। দেশবাসীর শিরোপা স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় তখনই। ভারতের বিপক্ষে কি আর অল্প এই পুঁজি নিয়ে লড়াই করা সম্ভব! জমিয়ে লড়াই করতেও পারেনি বাংলাদেশ। শেখর ধাওয়ানের ৬০ রানের ইনিংসের সুবাদে ৭ বল বাকি থাকতেই ৮ উইকেটে জিতে যায় ভারত।

এবার লড়াই করেও হার। যাতে থাকল আক্ষেপ, কষ্ট। বাংলাদেশের মানুষের এই এশিয়া কাপ কষ্ট কবে শেষ হবে?

কেআর

 

: আরও পড়ুন

আরও