লেখালেখিতে যতটুকু সেটেল হতে পেরেছি, রাজনীতিতে বোধহয় সেটেল হতে পারিনি : হাবীব ইমন
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০ | ২২ আষাঢ় ১৪২৭

লেখালেখিতে যতটুকু সেটেল হতে পেরেছি, রাজনীতিতে বোধহয় সেটেল হতে পারিনি : হাবীব ইমন

পরিবর্তন ডেস্ক ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

লেখালেখিতে যতটুকু সেটেল হতে পেরেছি, রাজনীতিতে বোধহয় সেটেল হতে পারিনি : হাবীব ইমন
হাবীব ইমন। একজন লেখক ও কবি। আবার তিনি এদেশে তরুণ বাম রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি। গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শেষ দিক থেকে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখির সুবাদে তিনি ২০০৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের একটি ছাত্র-যুব উৎসবে লেখক হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। শুধু লেখালেখি নয়, তিনি লিটলম্যাগ আন্দোলনের একজন স্থানীয় পর্যায়ে থেকে জাতীয় পর্যায়ে একজন লিরলস কর্মী। একজন সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি তিনি। একসময়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের জড়িত ছিলেন।

আসুন আমরা তার লেখালেখি ও রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কিছু কথা শুনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মাঈনুল এইচ সিরাজী।

প্রশ্ন : এখন কী লিখছেন?
হাবীব ইমন : কবিতা আর পত্রিকায় কলাম লেখা।
একটা সময় কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলাম, কবিতা লেখা ভুলেই গিয়েছিলাম, নানামুখী ব্যস্ততার কারণে। এখন করোনাকালে গৃহবন্দী থাকার কারণে কবিতা লেখাটা আবার জোরালো করার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন : কেন লেখক হলেন?
হাবীব ইমন : এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। এর উত্তর আমার জানা নেই। আমি তো লেখক হতে চাইনি। লেখক হওয়ার স্বপ্নও আমার ছিলো না। আমার স্বপ্ন ছিলো ডাক্তার হবো, মানুষের চিকিৎসাসেবা দিবো। এসএসসি-তে বিজ্ঞান বিভাগ না নেওয়াতে আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে গেলো।

পারিবারিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে আমাকে লেখক হতে হয়েছে। লেখক হওয়ার আগে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমি সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে পড়ি। ওই বয়সে আমি একটি জাতীয় দৈনিকে স্থানীয় প্রতিনিধি হওয়ার কথা বললে সেই দায়িত্ব আমি নেইনি। কেননা ওই দায়িত্ব পালনে আমার আত্মবিশ্বাস ছিলো না।

এবার আসুন, লেখক কিভাবে হলাম, আমার পরিবারে আমার নানা লেখালেখি করতেন, আমার মেজ মামা লেখালেখি করতেন। তাঁদের লেখার সাথেই আমার দিনকাল যেতো বেশির ভাগ সময়। একসময় তখনকার সবচাইতে জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদে একটা কলাম লেখা পাঠাই, সেই লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার পর মনে হলো আমার ভেতরে লেখকস্বত্তা আছে। প্রাসঙ্গিক কিনা জানি না, তবুও বলছি, কোনো জাতীয় দৈনিকে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়, তাও সংবাদ-এ। প্রশ্ন করেছেন, উত্তর হিসেবে এই কথাগুলো বলা যায় : আমি বিস্তর কথা বলতে চাই। কথা বলতে চাই বলেই লিখি।

প্রশ্ন : অশান্ত মন নিয়ে লিখে কি সন্তুষ্ট হতে পারছেন? পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করুন।
হাবীব ইমন : সময়টা আসলে মানসিক অবসাদ কিংবা বিষণ্নতার। সারা পৃথিবী জুড়ে সকল মানুষ একইরকমভাবে জীবন যাপন করছে। এটা হয়তো আমাদের প্রাপ্য ছিলো। প্রকৃতির ওপর আমরা এতো নির্মম আচরণ করেছি, অন্যায় করতে করতে এতো নির্দয় হয়ে গেছি, আজ তার প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি। আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখান থেকে আমরা এখনও শিক্ষা নিতে পারিনি। এখনও পৃথিবী জুড়ে বর্ণবাদ বিদ্বেষ, পুঁজিবাদ, শ্রেণিচ্যুত আচরণ বিদ্যমান। এই তো কয়েকদিন আগে আমেরিকায় পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হওয়া আফ্রিকান-আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড, যার একমাত্র অপরাধ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়া। এমনি এক মানসিক বিষণ্ন সময়ে লিখে সন্তুষ্ট হওয়াটা কঠিন। হেটক্রাইমের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

তবে আমার দিক থেকে বলবো, লেখার মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে আমার পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছি। এর ফলে জীবনটা কাছ থেকে ভালোভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পাচ্ছি। জীবনের নানা বাঁক, ছন্দপতন, শোক, ক্ষুধা, দারিদ্রতা এগুলো চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। লেখাটা ভালো কিংবা মন্দ সেই বিচারটা পাঠকই করবেন। চারপাশের এই ক্লেদ, এ বিষাদ লেখকের মনের ভেতরে পাঠকের জন্যে বিবেচনা বোধটা জাগিয়ে তোলে।

প্রশ্ন : লেখার সময় পাঠকের কোন চাহিদার দিকটা বিবেচনায় রাখেন?
হাবীব ইমন : লেখার সময় আমি কেমন করে যেন পাঠক হয়ে যাই। লেখক এবং পাঠক একটা দ্বান্দ্বিক জায়গাও তৈরি করে। কখনও কখনও পাঠক জিতে যায়, আবার কখনও লেখক তার নিজ বলয়ে এগিয়ে যায়। কোনো কোনো লেখায় আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। কেউ কেউ বলবেন লেখক হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাসের প্রবল ঘাটতি আছে। হয়তো তাই।

সমগ্র পাঠকের এখন মন খারাপ। আমারও মন খারাপ। তাই আমার লেখার মধ্যেও বিষণ্নতা প্রভাব ফেলে। আসলে যেসব লেখা আমাকে ভেতরে টেনে নেয়, আমাকে ভাবায়, আমাকে প্রশ্নের সামনে ঠেলে দেয়। জীবনের গভীর সংকটগুলো যদি লেখায় না আসে তাহলে লেখার কী মূল্য আছে!

প্রশ্ন : লেখালেখির ক্ষেত্রে কাকে আদর্শ মানেন? বা কার মতো হতে চান?
হাবীব ইমন : একজন লেখক আসলে সময়ে কাাছে বন্দী। একটু ঘুরেও বলা যায়, সময়কে ফ্রেমবন্দী করেন লেখক।
আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বপ্নাহত জীবনে একেক সময় একেকরকম বোধ কাজ করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছি। স্থির থাকতে পারছি না। তবে এর মধ্যেও ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সাদাত হাসান মান্টো, নাজিম হিকমত, বুদ্ধদেব বসু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সোমেন চন্দ, সৈয়দ শামসুল হক, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, মহাশ্বেতা দেবীর লেখার একটা গভীর প্রভাব ভিতরে কাজ করে। ওদের মধ্যে লিখতে চাই শেষ পর্যন্ত।

প্রশ্ন : যাঁরা আপনার একটি বইও পড়েনি, তাঁদেরকে (আপনার) কোন বইটি পড়তে বলবেন?
হাবীব ইমন : ওরকমভাবে আমি বলতে পারি না। কারণ যখন আমি লিখি তখন অনেক সংশয়ে থাকি, ভয়ে থাকি। লেখাটা কেমন হচ্ছে, না হচ্ছে বুঝতে পারি না। নিজের লেখার সমঝদার আমি নই। নিজের লেখা ভালো না মন্দ কিছুই জানি না। বারবার পর্বে পর্বে নিজেকে ভেঙে আবার গড়তে চেষ্টা করেছি। পথ চলতে চলতে নিজেকে বদলেছি, বদলেছি নিজের শিল্পরূপ। কোনো বাইরের চাপে নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের চাপে নয়, সম্পূর্ণ নিজের হৃদয়ের তাপে নিজের সচেতন ইচ্ছায় এবং সমস্ত সৃষ্টি প্রবাহটিই রেখেছি আত্মনিয়ন্ত্রণে। যেহেতু প্রশ্ন আসছে, উত্তর দিতে হবে, তাহলে বলবো, ‘জলনৌকো’ পড়ার জন্য। এটা আমার মুক্তগদ্য-পদ্য গ্রন্থ। এ বইটা সম্পর্কে একটু বলি, সময়ের ভিন্ন ভিন্ন ডাইমেনশনে লিখে রাখতে চেয়েছি নিজের খণ্ডিত ইতিহাস। খণ্ড খণ্ড চিত্রে লেখা প্রতিদিনকার প্রকৃতি, ব্যক্তিগত বেদনা, রাজনীতি, আকাঙ্ক্ষা, অমোঘ ব্যর্থতা- সবকিছুর উর্ধ্বে তুলেছি আমাকে। ভাই-বোনের সম্পর্ক প্রাধান্য পেয়েছে। আরেকটি বইয়ের কথা বলবো, এটা কলকাতা থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, ‘কবি হয়ে জন্মাতে চাইনি’। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন ‘অমাবস্যাকাল ও যুবকদের দায়’।

প্রশ্ন : এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল কয়েকজন লেখক বা কবির নাম বলুন।
হাবীব ইমন : সম্ভাবনাময়ী এখন অনেকেই আছে। দুই বাংলাতে বেশ কয়েকজন লেখক জনপ্রিয়ও হচ্ছেন। যেমন সাদাত হোসাইন। আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে আন্তর্জাতিকতার একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলবো। সেটা বোধহয় ততোটা আমরা পারি নি। হুমায়ুন আহমেদ কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন। সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুদীর্ঘকাল আগে আন্তর্জাতিকতার লড়াইটা করে গেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের লেখাও আঞ্চলিক প্রকাশে আন্তর্জাতিকতার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়া ক্ষেত্রে আমাদের প্রকাশনা সংস্থা যে ভূমিকা পালন করার কথা, সেটি তারা করতে পারেন নি।

পুঁজিবাদী ভোগবাদিতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দর্শনে প্রভাবিত হয়ে বুর্জোয়া শ্রেণির যে তোঁয়াজটা চলছে, সেখানে সাহিত্যে টিকে থাকার মতোন লেখক এখন কম আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষায়, ‘প্রচলিত মূল্যবোধ কিংবা সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসার সম্মুখীন করতে সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য ব্যর্থ, কবিরা জীবনের স্পন্দন ও প্রেরণা থেকে বঞ্চিত’।

শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আছে। একটি হলো, আর্ট ফর আর্টস সেক। আরেকটি জনগণের জন্য শিল্প ও সাহিত্য। আর্ট ফর আর্টস সেক এই তত্ত্বে যারা বিশ্বাস করেন তাদের সমালোচনা করে কথাসাহ্যিতিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, আর্টের ধোঁয়ায় এদের চোখ কটকট করে না, শিল্পীর কর্তব্য সম্বন্ধে এদের দ্বিধাও নেই। দুর্বলতাও নেই।’ শিল্পীর সেই কর্তব্য হলো সাহিত্যের প্রগতির ধারাকে অগ্রসর করে তোলা।

যাদেরকে আমরা প্রতিশ্রুতিশীল লেখক বা কবি মনে করতে পারি। তাদের মধ্যে পাপড়ি রহমান, সাখাওয়াত টিপু, দীপঙ্কর গৌতম, মাহবুব মোর্শেদ, সুমন্ত আসলাম, ওবায়েদ আকাশ, স্বকৃত নোমান, মাঈনুল এইচ সিরাজী, মিল্টন রহমান, মোজাফফর হোসেন, হাসান মোরশেদ, শিমুল সালাহউদ্দিন, সুমন সুপান্থ, শফিক হাসান, প্রণব আচার্য্য, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, পিয়াস মজিদ, অমিত চক্রবর্তী অন্যতম মনে করি।

কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার, তাঁর কথা নিশ্চয় এখানে বলাটা অসঙ্গত হবে না। আশাকরি নতুন লেখকদের জন্য তাঁর কথাগুলো কাজে লাগতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘একজন লেখকের শক্তি মানে স্ট্রেংথ। স্ট্রেংথ তার পরিশ্রম। এই ছাড়া আর কিছু না। তাকে অগাধ পরিশ্রম করতে করতে হবে। অনেকে মনে করে আমি একটু বাংলা লিখতে পারি, সুতরাং আমি লিখে গেলাম। এটা তা নয়। আমরা লিখতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, লেখার মধ্যে কত পরিশ্রম করতে হয়। কত হাওড়াতে হয়। কত শব্দ বুঝতে হয়। কতভাবে বাক্য বিন্যাস করতে হয়। কতভাবে মানুষকে, জীবনকে দেখতে হয় এবং কতভাবে ভাবতে হয়। চিন্তা-ভাবনা যদি না থাকে, তুমি কি লিখবে?’

প্রশ্ন : গত একমাসে আপনি কোন বইগুলো পড়েছেন?
হাবীব ইমন : দীর্ঘ লকডাউনে ডিপ্রেশন পোটেনশিয়েটেড্ হয়। এক্ষেত্রে সুইসাইডের রেইট্ বাড়তে পারে। আমাদের এখন এইরকম সময়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত চারপাশকে ঘিরে বিভিন্ন আতঙ্ক-করোনা ভাইরাস, একই সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রার্দভাব, বন্যার আভাস।

দেখুন দেশ ক্রমশ মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। করোনার সঙ্গে ডাক্তার-রা পেরে উঠতে পারছে না। একের পর এক ডাক্তার আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, অন্যান্য সেবাপ্রদান প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। ভয়ানক এক পরিস্থিতির দিকে আমরা যাচ্ছি। কেউ কাউকে স্বান্তনা দেওয়ার ভাষাও সংবেদনশীল থাকছে না। ঠিক এই মুহূর্তে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কোনোকিছুর দিকে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। তবুও বই পড়েছি নাজিম হিকমতের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘জীবন বড় সুন্দর ব্রাদার’, সিলভিয়া প্লাথের উপন্যাস ‘বেলজার’, সোমেন চন্দের গল্পসমগ্র।

প্রশ্ন : প্রথম বইয়ের প্রকাশক পাওয়ার অভিজ্ঞতাটি বলুন।
হাবীব ইমন : দেখুন নোয়াখালীর মাইজদী শহরে বেড়ে ওঠা আমার। আমার জন্মও সেখানে। গর্বের সঙ্গে বলতে হয় এ শহর থেকে লেখক হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। সেই সময়ে তাঁর স্মৃতিকথা গুলো আমাকে ভীষণ উদ্বুদ্ধ করে। ছোটবেলা থেকে কবিতা লেখা শুরু করি। আমার মেজ মামা প্রয়াত কবি মনজুর হাছান লিটনের কথা স্মরণ করতে হয়। তাঁকে দেখেই আমি কবিতা লেখা শুরু করি। সেই কারণে কবি তকমাটা বহুদিন ধরে চলে আসছিল আমার সাথে। মাইজদী শহরে পরিচিত ছিলাম। জীবনের প্রয়োজনে মাইজদী ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। স্বাভাবিক প্রবণতায় আমি একজন গৃহকোণে থাকা মানুষ।

প্রথম বইয়ের প্রকাশক পাওয়াটা কাকতালীয়। ঢাকায় কোথাও আমি নির্দিষ্ট করে আড্ডা দেইনি। গোষ্ঠীবদ্ধ চর্চা আমার কখনই ভালো লাগতো না। একদিন শাহবাগে আড্ডা দিতে দিতে নোয়াখালী পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রয়াত রবিউল হোসেন কচির প্রকাশনা সংস্থা স্বরাজ প্রকাশনী আমাকে একটা পাণ্ডুলিপি দিতে বলেন। রবিউল হোসেন কচি ও তার পরিবারের সকল সদস্য আমাকে খুব ভালোবাসেন এবং স্নেহ করেন। স্বরাজ প্রকাশনী থেকেই প্রথম বই এবং কাব্যগ্রন্থ ‘কালো মেয়ের প্রতি ভালোবাসা’ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম দেখে অনেকে ভেবেছিলেন এটা উপন্যাস বা গল্পের বই। কিন্তু রবিউল হোসেন কচি আমার বইটা প্রকাশ দেখে যেতে পারেন নি।

প্রশ্ন : আপনার পাঠক কোথায় বেশি-ফেসবুকে, বইয়ে, নাকি পত্রিকায়?
হাবীব ইমন : ফেসবুকে এবং পত্রিকায়।
বইয়েরও পাঠক আছে। তবে কিছুটা কম। দুনিয়া বদলে গেছে, প্রিন্ট মিডিয়ার আবেদন কমে আসছে। যারা সেলিব্রেটি লেখক তাদের বই পাঠকরা গ্রোগাসে গিলছে। আমার মনে হয় পাঠক এসব বইও ঠিকমতো পড়ে না।

প্রশ্ন : আপনি কোন ধারার লেখক/ কবি?
হাবীব ইমন : ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেকে একজন র‌্যাডিক্যাল সেক্যুলার পন্থা হিসেবে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। সাম্যবাদ আমার জীবনে প্রবলভাবে কাজ করে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা তো আছে। এইসব মিলিয়ে আমি লেখক হওয়ার চেষ্টা করি। চন্ডিদাস যখন বলেন, ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’- তখন তিনি প্রগতি ধারারই সূত্রপাত করেন। তাতে সব সম্প্রদায়ের ঐক্যের আওয়াজ, শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও যন্ত্রণার প্রকাশ দেখি। আমি নিজেকে কমিউনিস্ট আর্দশে ভাবার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন : একটা প্রশ্ন, আপনি মনে করেন সময় সঠিক পথে যাচ্ছে না, তাহলে আপনার লেখায় সরাসরি যুদ্ধে নামার ডাক নেই কেন?
হাবীব ইমন : প্রশ্নটার জন্য ধন্যবাদ।
আমার কাছে মনে হয় এখনও সেই সময়টা আমাদের আসেনি, সরাসরি ডাক দেওয়ার। ম্যাক্সিম গোর্কির লেখাগুলোর মধ্যে দেখুন, তিনি কিন্তু ডাক দেন নি। তিনি জাগিয়ে তুলেছেন আপনাকে- আমাকে। আমরা লেখকরা আসলে জাগিয়ে তুলতে পারি। ডাক দিতে পারি না।
বিপ্লব তো বলে-কয়ে আসে না। পরিস্থিতি বিপ্লবকে নির্ণয় করে। তবে পরিস্থিতি আমাদের সেখানে নিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধ বা ময়দানে যাওয়ার জন্য ডাক দেওয়ার সময় খুব নিকটে। আপাতত মানুষ জেগে উঠুক, জেগে তোলাটাই এখন জরুরি। মানুষ না জাগলে কোনো বিপ্লবই সুখকর হয় না। ফ্যাসিবাদ-সা¤্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা সহ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখকরা সবসময় সজাগ।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কি ‘ইস্পাত’ উপন্যাস লেখার পর বলেছিলেন, ‘এবার বেরিয়ে পড়েছি লৌহকঠোর বেষ্টনীর ভিতর থেকে ... এখন আমি আবার এসে দাঁড়িয়েছি যোদ্ধাদের সারিতে’। আমিও বলতে চাই প্রকৃত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমিও আছি। বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বলতে পারি, আমরা কয়েকজন লেখকরা সবসময়ই দেশের যেকোনো ক্রাইসিসে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। আমাদের যে ভূমিকা নেয়ার দরকার কিংবা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থেকেছি।

প্রশ্ন : লেখালেখি এবং রাজনীতি- কোন জায়গাকে প্রাধান্য দেন বেশি?
হাবীব ইমন : লেখালেখি এবং রাজনীতি-দুটো ভিন্ন সত্তা আমার ভেতরে কাজ করে। আবার দুটোকে আলাদা করে ভাবিনি। চেষ্টা করি দুটোকে সমানতালে প্রাধান্য দেওয়ার। স্বকীয়তা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। তবুও আত্মউপলব্ধিতে কোথায় যেনো ফারাক থেকেই যায়।

মার্কস ও মার্কসীয় সাহিত্য কিংবা কম্যুনিজম যে চেতনা, তাকে বাস্তব সত্য বলে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জানতে চাই। বাস্তবরূপে জীবনে তা অতোটা হয়তো প্রতিফলন ঘটাতে পারি নি। তবে সেটাই আজ কর্ম, পেশা ও নেশা। সত্যিকার অর্থে, মানুষকে জানা, মানুষকে বোঝা, জীবনকে উপভোগ করা- সবটুকুই মার্কসীয় জ্ঞানের জন্য। সেই চেতনাটা ওই মার্কসীয় দর্শন। মার্কসসিজম বা তার চেতনাই চলার পথ ও চিন্তার পথ রচনা করে দেয়। আমার লেখালেখির একটা পর্যায়ে মেহনতি মানুষের লেখার কথা ভাবি, ছোট ছোট মুক্তপদ্যে আমার দৃঢ়চেতা আর্দশের কথা বলে যাই।

আর রাজনীতি! ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে জড়িত। এছাড়া একই সঙ্গে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি, কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। ব্যক্তিগত অভিমতে বলা যাবে না এ দায়িত্বগুলো ভালোভাবে পালন করতে পেরেছি। আমার আপ্রাণ ইচ্ছা, যুবকদের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যে চর্চা, যুবকরা গবেষণা করবে, সৃজনশীল কাজের ভেতরে আরো বেশি সময় দিবে, সংস্কৃতিবান্ধব হবে, তার সাথে বর্তমান সময়টাকে একটা যোগসূত্র তৈরি করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সত্যিকারার্থে এদেশের যুবশ্রেণিকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার, ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বপ্ন দেখাতে পারি নি, সহজ কথায় বলতে হয় আমি আসলে পারি নি।

লেখালেখিতে যতটুকু সেটেল হতে পেরেছি, রাজনীতিতে বোধহয় আমি একদমই সেটেল হতে পারছি না। এটা আমার নিজস্ব উপলব্ধি। রাজনীতিতে আমি একজন আগাগোড়া ব্যর্থ মানুষ। রাজনীতিতে সেটেল হওয়ার সক্ষমতা আমার হয়তো নেই, কিন্তু পিছনের সারির একজন কর্মী হিসেবে রাজনীতির কাজে থাকতে সামর্থ্য অনুযায়ী আমার চেষ্টা ছিলো।

প্রশ্ন : রাজনীতিতে কেনো সেটেল হতে পারছেন না?
হাবীব ইমন : এখানে অন্য কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই। খুব পরিস্কারভাবে বলছি, আমি যে রাজনীতি করি, তার সঙ্গে দ্বিমত আমার নেই। আরেকটু ভেঙে বলি, রাজনীতিতে সেটেল না হওয়ার পেছনে আমার রাজনৈতিক আর্দশের সাথে কোনো বিরোধ নেই। কোনো ধরনের কনফিউশন আমার নেই। যেটুকু ঘাটতি আছে, তাহলো আমার নিজের ভেতরে বড় একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতিতে সেটেল হওয়া আমার জন্যে অনেক কঠিন। রাজনীতিতে থাকি বা না থাকি, কিন্তু কমিউনিস্ট আর্দশের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করবো।

প্রশ্ন : আপনার লেখায় বোঝা যায় প্রচুর পড়েন। আপনার পাঠাভ্যাস সম্বন্ধে পাঠকদের যদি ধারণা দিতেন।
হাবীব ইমন : আমাদের দেশে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক প্রায়শই একটা কথা বলতেন, ‘পড়ো, পড়ো এবং পড়ো’। এ কথাগুলো নতুন লেখকরা তার কাছে পরামর্শ চাইলে বলতেন। হক ভাইয়ের কথাগুলো ব্যক্তিগত জীবনে মেনে চলার চেষ্টা করি। সবচেয়ে বড় কথা আমার নিজে জানার জন্য, বোঝার জন্য পাঠ্যাভ্যাসটা জরুরি। আপনি যখন কিছু জানবেন না, সেখানে লেখাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সভ্যতা বিকাশে যে জিনিসটি মানুষের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তার নাম বই। বইয়ের পাতার কালো অক্ষরে অমর হয়ে আছে জ্ঞানের চিরন্তন দ্যুতি। বইয়ের পথ মানে জ্ঞার্নাজনের পথ। জ্ঞানকে দীপশিখার সাথে তুলনা করা যায়।

আমি যখন ঢাকার বাইরে যাই, আমি বই পড়ার চেষ্টা করি বাসে বসে বসে। রাতে ঘুমানোর আগে বই পড়ি। আমি কলাম লিখতে বসি, তখন দেখি অনেক রেফারেন্সের প্রয়োজন হয়, বই পড়ি। অন্তর্জাল আমাদের অনেক সুবিধা করে দিয়েছে, চাইলে লেখার বিভিন্ন সোর্স, পিডিএফে বিভিন্ন জনের লেখা পড়ার সুযোগ পাচ্ছি। শেখার চেষ্টা করি ওখান থেকে।

প্রশ্ন : বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কোথায়?
হাবীব ইমন :আমার নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। এক পাল্লায় বিশ্বসাহিত্যকে, আরেক পাল্লায় বাংলা সাহিত্যকে বসিয়ে দিলে অন্যায় করা হবে। বাংলা সাহিত্য কতটুকু, কতটুকু জায়গা করে রয়েছে, খুব অল্প জায়গা বিস্তৃত। সেখানে বাংলা সাহিত্য অনেক এগিয়েছে। সাহিত্যের প্রতি এখনকার তরুণদের আগ্রহ দেখতে পাই। তার মানে সাহিত্যচর্চা হচ্ছে। কিন্তু ঢালাওভাবে ফসলটা ভালো না হলেও আগামী দিনে সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারছি না। আশার কথা, চর্চাটা যেহেতু হচ্ছে, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই ভালো ফসল হবে।

দুজনের মানুষের কথা বলতে হচ্ছে, তারা হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সোমেন চন্দের কথা। এই দুজন পুরোপুরি কমিউনিস্ট আর্দশের লেখক। সোমেন চন্দ শ্রমিক রাজনীতির বড় নেতা ছিলেন। ফ্যাসিবাদচক্রের হাতে তিনি নৃশংসভাবে নিহত হোন। এ বছর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। এ দুজনকে যদি আমরা অকালে না হারাতাম বাংলা সাহিত্যে প্রগতিধারা অনেক দূর এগিয়ে যেতো।

পিএ         


 

: আরও পড়ুন

আরও