বাবা ভাবতেন অধিক বইপড়া ক্ষতিকর: উইলবার স্মিথ
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

বাবা ভাবতেন অধিক বইপড়া ক্ষতিকর: উইলবার স্মিথ

পরিবর্তন ডেস্ক ২:৪০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০২১

বাবা ভাবতেন অধিক বইপড়া ক্ষতিকর: উইলবার স্মিথ
গত ১৩ই নভেম্বর মারা গেলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক উইলবার স্মিথ।

ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখায় তার ছিল সিদ্ধহস্ত। তার বইগুলো মূলত অ্যাডভেঞ্চার এবং নেচার জনারের অন্তর্ভুক্ত। সাংবাদিকতা পেশাকে ভালোবেসে তিনি সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার মন রক্ষা করতে প্রথম জীবনে তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেট হিসেবে পেশা শুরু করেন। অ্যাকাউন্টেট থাকাকালীন সময়ে অফিস ছুটির পর তার হাতে থাকতো প্রচুর সময়। তাই তিনি তার প্রিয় শখের কাজ লেখালেখি করে সন্ধ্যার পরের সময়টা কাটাতে শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে স্টিভেন লরেন্স ছদ্মনামে 'আর্গোসি' ম্যাগাজিনে তার লেখা প্রথম গল্প ‘অন ফ্লিন্ডার্স ফেস’ প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি আরো উৎসাহ বোধ করেন। এবং তিনি তার প্রথম উপন্যাস 'দ্যা গডস ফার্স্ট মেইক ম্যাড' লিখতে শুরু করেন।

এই উপন্যাস ২০ জন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। এতবার প্রত্যাখ্যানের কারণে তিনি দমে যান এবং একজন সাধারণ অ্যাকাউন্টেট হিসেবে জীবনযাপন করতে থাকেন। এরপর একদিন উরসুলা উইলিয়ামস নামে তাঁর লন্ডনের এক এজেন্ট টেলিগ্রাম করেন। টেলিগ্রামে তিনি উইলবার স্মিথের প্রথম উপন্যাস কতটুকু লেখা হলো জানতে চান। এই ঘটনায় উইলবার স্মিথ আবারো উজ্জীবিত হন এবং নতুন আরেক উপন্যাস লিখতে শুরু করেন।

আগের উপন্যাস লেখায় তিনি যে ভুলগুলো করেছিলেন, সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করেন। যেসব বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি জানেন, সেইসব অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করেই তিনি লিখেন 'হোয়েন দ্যা লায়ন ফিডস'। এই বই সারাবিশ্বে পাঠকপ্রিয়তা পায়। একইসাথে সাউথ আফ্রিকাতে বইটি নিষিদ্ধও হয়। এরপর থেকে তিনি পুরোপুরি লেখালেখিতেই মনোনিবেশ করেন। তাঁর লেখা বই সারাবিশ্বে ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।

২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তার একমাত্র আত্মজীবনীমূলক বই ‘অন দ্যা লিওপার্ড রক: অ্যা লাইফ অফ অ্যাডভেঞ্চার’। সেই বই থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠকদের জন্য এইখানে অনুবাদ করা হলো।


আমার কৈশোর কালটা মোটামুটি করুণ সময় ছিল। বইপড়া আমার জন্য একটা গোপন আনন্দের ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে রান্নার কাজে এবং ঘর গরম রাখতে কাঠ ব্যবহার করা হতো, এবং তখন আমার প্রধান কাজ ছিল একদল লোকের সাথে ট্রাক্টর এবং ট্রেলার নিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাওয়া আর সেই কাঠ বোঝাই গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা। তখন আমি সবসময়ই একটা বই আমার শার্টের ভিতরে লুকিয়ে নিয়ে যেতাম, এবং মাথায় হ্যাট পরে ট্রাক্টরের উপরে বসে বসে দুপুরবেলাতেও বই পড়তাম। আমার বাবা কোনোদিনই আমাকে ধরতে পারতো না, কারণ তার গাড়ির আওয়াজ পেলেই আমি বই লুকিয়ে ফেলতাম।


যদিও বাচ্চা ছিলাম তবুও আমি নিজের মতোই থাকতাম, আর সময় পেলেই বই পড়তাম। যখন থেকে আমি পড়তে শিখলাম তখন থেকেই বিগলস এবং উইলিয়াম নামের ছোটদের সিরিজ বই পড়তে শুরু করি। শীঘ্রই আমি সি এস ফরেস্টার'র লেখা 'হোরাসিও হর্নব্লোয়ার' অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের দুনিয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। প্রায় ৮০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত বুলাওয়েইয়ো শহরের গণগ্রন্থাগারকর্মীর সাথে আমার মায়ের বন্ধুত্ব ছিল, তাই প্রতি মাসেই মালবাহী ট্রেনে আমার জন্য এক প্যাকেট অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের বই আসতো। তখন থেকেই আমার সংগ্রহে ভালো ভালো বই থাকতো। মৃত্যু, শঙ্কা, সাহসিকতা এবং বর্বরতার এই মহাদেশের গল্পগুলোতে আমি বুঁদ হয়ে যেতাম। আমি আফ্রিকার রোমাঞ্চকর গল্পগুলোকে ভালোবাসতাম।

ষোল বছর বয়সে আমি একটা ভয়ংকর বোর্ডিং স্কুলে বন্দী হয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, সেই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। আমার বয়স তখন ১৮, সাউথ আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলের শহর গ্রাহামস্টোনে অবস্থিত রোডস বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জন্য স্বর্গের দরজা খুলে গিয়েছিল। হঠাৎই খেয়াল করলাম সেখানকার মেয়েরা জিমস্লিপস পরে আর পরিচ্ছন্নভাবে সরীসৃপের মতন এঁকেবেঁকে গির্জায় যায়। এর আগে আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি মেয়েরা কতটা কমনীয়, উষ্ণ আর মোহনীয় সৃষ্টি।

বোর্ডিং স্কুলে ভালো স্মৃতি বলতে যদি কিছু থেকে থাকে তা হলো একজন প্রভাববিস্তারকারী ইংরেজি শিক্ষকের সাথে আমার সখ্যতা। তিনি সাধারণত আমার সাথে আমার পঠিত বইগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। একটা গল্প লেখার জন্য আমাকে কোন বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে হবে তিনি তাই আমাকে বোঝাতেন। তিনি সাধারণত গল্প লেখার ক্ষেত্রে ধ্রুপদী নিয়ম পছন্দ করতেন; যে লেখায় শুরু থাকবে, মধ্যভাগ থাকবে এবং শেষ থাকবে। আইডিয়াটা এরকম, গল্পটা শুরু হবে সাধারণভাবে এবং চলতে থাকবে। এরপর গল্পের মাঝামাঝি পয়েন্টেও একইরকম চলবে। আর গল্পের শেষে উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা থাকবে। গল্পের প্রথমেই কাহিনিকে বেশি টানা যাবে না। ধীরেধীরে গল্পের চরিত্রগুলোকে গঠন করতে হবে। রহস্যটাকে গল্পের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। এটাই ছিল আমার শিক্ষকের ফর্মূলা। অবশ্যই তোমাকে এই পদ্ধতিতেই আগাতে হবে এবং তার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগাতে হবে। এই পদ্ধতির মাঝেই লেখালেখির সকল প্রতিভা লুকিয়ে আছে।

আমি খুবই ভাগ্যবান কারণ আমি অসাধারণ দুইজন বাবা-মা পেয়েছিলাম। আমার বাবা খুবই কর্মঠ লোক ছিলেন আর মা শিল্পমনস্ক ছিলেন; তিনি খুবই নম্র স্বভাবের ছিলেন এবং বই পড়তে আর ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসতেন। আমার কাছে এখনও তাঁর আঁকা ছবি আছে। আমার বাবা আমাকে বাস্তব জীবনের শিক্ষা দিয়েছিলেন। আর মা আমাকে সঙ্গীত এবং বইয়ের মাধ্যমে জীবনের আয়নায় অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন। খুব ছোট বয়সে যখন আমি পড়তে পারতাম না তখন মা আমাকে প্রতিরাতে বই থেকে গল্প পড়ে শোনাতেন। আমার বাবা ভাবতেন অধিক বইপড়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বাবা সাধারণত নন-ফিকশন বই পড়তেন; সেই বইগুলোর বেশির ভাগই যন্ত্রপাতি সারাইয়ের ম্যানুয়াল ছিল।

১৯৬২ সালে আমার বয়স তখন ২৯। একটা ব্যাচেলর বাসায় থাকি। আমার লেখা প্রথম উপন্যাস 'দ্যা গডস ফার্স্ট মেইক ম্যাড'। এই উপন্যাসটাকে আমি আমার সেরা কাজ ভেবেছিলাম। ২০ জন প্রকাশক পান্ডুলিপিটাকে প্রত্যাখ্যান করে। ২০ তম বার প্রত্যাখ্যাত হবার পর আমার বিছানায় বসে বসে প্রত্যাখ্যানপত্রের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেইটাকে আমি হাতের মুঠোয় দুমড়েমুচড়ে ফেলি। আর মনস্থির করি।

ইসি
 

আরও পড়ুন

আরও