রফিক আজাদের জন্যে শোকগাথা
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

>

রফিক আজাদের জন্যে শোকগাথা

হাসানআল আব্দুল্লাহ ২:৪৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০১৬

রফিক আজাদের জন্যে শোকগাথা
একজন কবির জীবনকে জানতে হলে তাঁর কবিতা ধারাবাহিক ভাবে পড়ার বিকল্প নেই। পরতে পরতে, ছন্দের ভাঁজে ভাঁজে, উপমার সমান্তরালে তিনি এঁকে যান প্রকারান্তরে জীবনের একান্ত উত্থান-পতন; সময়ের সাক্ষী হয়ে ধরা দেয় রচনাসম্ভার। তাই তো বলা হয়, তিনিই প্রকৃত স্রষ্টা যিনি শিল্পের সুষমায় ধরতে পারেন জীবনকে, পারিপার্শ্বিকতার ভেতর দিয়ে নিজের লণ্ঠনটিকে করতে পারেন অনবরত আলোক শিখায় সমুজ্জ্বল। এমনই একজন কবি রফিক আজাদ, যাঁর তিরোধানে বাংলা কাব্যাঙ্গণ এই মুহূর্তে চোখের জলে ভাসছে।

পঞ্চাশের প্রধানদের পরে ষাটের যে ক’জন কবির কাব্যাভিযাত্রা পরবর্তী সময়ের কবি ও কাব্যরসিকের মনে দাগ কেটেছিলো তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান ও সিকদার আমিনুল হক আগেই আমাদের কাঁদিয়েছেন, এবার কাঁদালেন রফিক আজাদ। অথচ এই তো সেদিনও তাঁর সাথে দেখা হলো, সপরিবারে এলেন নিউইয়র্কে আমার বাসায়। এ যেনো না চাইতেই অমৃতধারা। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে, প্রায় রাত নয়টার দিকে ফোনের ওপাশ থেকে যাঁর কণ্ঠ ভেসে উঠলো তিনি আমার অতি পরিচিত। বললেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। ছেলেদের কাছে কানাডায় বেড়াতে এসেছিলেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী দিলারা হাফিজ। রাত এগারোটার দিকে দুই ছেলে, ভাবী ও ছোটো ছেলের ফিয়ানসেকে সাথে করে এলেন। কী উজ্জ্বল মুখ, কী যে উৎফুল্ল দেখালো কবিকে! ‘শব্দগুচ্ছ’ পত্রিকার দশবছর পূর্তিতে কবিতা উৎসবে প্রধান অতিথি হয়ে এসে তিনি আমাদের বাসায় ছিলেন দেড় মাসের মতো। তখন থেকেই আমার মাকে তিনি মা বলে ডাকেন। এর অনেক আগেই আমি তাঁর ‘ভাই’ হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি যখন আমার মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছেন, সাথে সাথে পুরো পরিবার, তখনই বোঝা যায়, কবিকে আগে বড়ো মানুষ হতে হয়; বোঝা যায়, রফিক আজাদ কতো বড়ো মাপের মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত আলাপে নবীন-প্রবীণ উভয় ধারার কবিদের উদ্দেশ্য তিনি বলেছিলেন, “ওদের কি করে বোঝাই, বড়ো কবি সবাই হতে পারে না, কিন্তু বড়ো মানুষ হতে বাঁধা নেই।” বাঙালি কবিদের মধ্যে বড়ো মানুষের সেই অভাব কিন্তু রয়েই গেলো।

সপরিবারে আমার ভাই, রফিক আজাদ, আমাদের সাথে সেদিন মাত্র ঘণ্টাখানেক ছিলেন। বলেছিলেন, সকালেই কানাডায় ফিরে যেতে হবে। কে তখন জানতো যে তিনি সেই রাতে শেষ দেখা করতে এসেছিলেন! কবির মৃত্যুর পর দিলারা ভাবী জানালেন, ইদানীং প্রায়ই বলতেন ২০১৭ সালে মধ্যেই তিনি মারা যাবেন। এবং শেষ দিকের একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘সব কথা ফুরিয়ে গিয়েছে, এসে গেছে নির্বাক সময়।’ আমার জানা আরো একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি আমার বাবা, এভাবেই চলে গিয়েছিলেন। পাক হানাদারদের গুলি থেকে বেঁচে গেলেও, তাদের অমানুষিক অত্যাচারে শয্যা নেয়া বাবা একদিন সকালে তাঁর বড়ো ভাইকে বললেন দুটি খাশি জবাই করে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে। বললেন, তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে। বড়ো কাকা তা-ই করেছিলেন, এবং ওইদিন রাতেই বাবা চলে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধা, কবিতার যোদ্ধা, রফিক আজাদের সাথে তাই বোধ করি এই ঘটনার অনেককাল পরে এসে ভাই সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গেলাম। ভাই হারানোর শোক বড়ো কঠিন! নিউইয়র্কে বসে অসহায়ের মতো চোখের পানি ফেলার মাঝে যে পাথর চাপা কষ্ট তার ভেতর দিয়েই বেরিয়ে এলো কবিতার পঙক্তি:

মানচিত্রের অক্ষরগুলো তোমাকে দিলাম
রাষ্ট্রতো এখন কতিপয় বাচালের হাতে
সময় ও সহমর্মীতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে করছে যারা
অনাবিল আস্ফালন
তুমি কখনো ছিলে না তাদের একান্ত অনুগামী।

২.
তাঁর ‘ভাতদে হারামজাদা’ কবিতাটির অপব্যাখ্যাকারীরা কোনোদিনই বুঝতে পারেননি যে এই কবিতায় ‘হারামজাদা’ শব্দটি তিনি আপামর জনগণের শত্রু, লুটেরা রাজনীতিবিদ ও কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর তিনভাগের বেশি মানুষ দরিদ্র, আর ভাত হলো তাদের একমাত্র চাওয়া। আমি তাই ভাত নিয়ে লিখেছি। বঙ্গবন্ধু তখন হেসে বলেছিলেন, ‘যা, ভালো লিখেছিস।’ একজন দরদী যোদ্ধা বুঝেছিলেন আরেকজন যোদ্ধার কষ্ট।

সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদ সারাজীবন নিরন্ন মানুষের কথা ভেবেছেন। তাঁর কলমে উঠে এসেছে, কখনো শিশুর সরলতায়, আবার কখনো বীরের গাম্ভীর্যে; কখনো সংগ্রামের সফলতায়, কখনো আদরমাখা হাতে, সেইসব মানুষের কথা যারা বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। এবং এর ভেতর দিয়ে তিনি এমন একটি কাব্যভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা অনেকটা গদ্যের কাছাকাছি, গল্পের আদলে গড়া। যেমন, ‘তুমি, বিশ বছর আগে ও পরে’ কী অবলীলায় তিনি নারী আন্দোলনের গল্প বলে গেলেন, কী সহজ, কী অনিবার্য বর্ণনায়! ‘আমার একটি আগ্নেয়াস্ত্র চাই’ কবিতাটি ইনিয়ে বিনিয়ে একজন যোদ্ধার প্রথম ও শেষ প্রত্যাশা নিপুণ ক্ষমতাধর শব্দমাধুর্যে অঙ্কিত হলো, ওই অস্ত্রটি তাঁর কতোখানি দরকার, কিন্তু কারুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে নয়, ‘মানুষ খুন করার মতো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ’ তিনি খুঁজে পাননি, কিন্তু তারপরও তাঁর একটি অস্ত্র দরকার। তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত সংগ্রামী মানুষই শেষতক বুঝতে পারেন কেনো দরকার! কিন্তু কবি সেই কথা কবিতার শক্তির ভেতরেই লুকিয়ে রাখেন। এবং নিপুণ ছন্দের কারিগর এই কবি সারাজীবন একাত্ম থাকেন কবিতায়।

৩.
কবিতা লেখার সুবাদে অগ্রজ যে কজন কবির কাছাকাছি এসেছিলাম রফিক আজাদ তাদের অন্যতম। একদিন রিকশায় যেতে যেতে তিনি বললেন, ‘শহীদ ভাইয়ের সাথে তোমার কথা হয়। আহা! বাংলা ভাষার এতো বড়ো একজন কবি, লেখা ছেড়ে দিলেন।’ রিকশা মোড় ঘুরতেই তিনি আবার বলে উঠলেন, ‘এক কাজ করো, তোমার সাথে নিয়মিত কথাবার্তার নোট রেখো। একসময় বাংলা কবিতার সম্পদ হয়ে উঠবে।’ ফিরে এসে, কাদরীর অনুমতি নিয়ে, আমি রফিক আজাদ নির্দেশিত ওই কাজটি করতে থাকলাম। এই ঘটনার দশবছর পর বেরুলো আমার লেখা বই ‘শহীদ কাদরী: সময়ের সম্পন্ন স্বর’। রফিক আজাদ নিজেই ওই বইয়ের সমস্তটা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করলেন ‘কালের যাত্রা’ নামক পত্রিকায়। দৈনিক ‘আজকের কাগজ’-এ প্রকাশিত হলো চারপাতার দুটি শহীদ কাদরী সংখ্যা। হইচই পড়ে গেলো। বই প্রকাশের পর দেশের তরুণ কবিরা একজন বড়ো কবির সাথে পুনরায় পরিচিত হলেন। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব একজন বড়ো মাপের মানুষ, একজন যোদ্ধা, একজন কবি রফিক আজাদের। কবিতায় জীবনকে এঁকে, মানুষের অপরিসীম ভালবাসা পেয়ে, একটি পূর্ণ জীবন কাটিয়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রিয় মানুষ, রফিক আজাদ, যিনি সর্বদাই অগ্রজদের শ্রদ্ধা করেছেন, অনুজদের নিয়েছেন বুকে টেনে। রেখে গেছেন অগণিত ভাই।

 

আরও পড়ুন

আরও
               
         
close