টাঙ্গাইলে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার করে প্রবাসফেরত যুবক স্বাবলম্বী
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২০ | ১৯ চৈত্র ১৪২৬

টাঙ্গাইলে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার করে প্রবাসফেরত যুবক স্বাবলম্বী

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০২০

টাঙ্গাইলে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার করে প্রবাসফেরত যুবক স্বাবলম্বী

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার গড়ে তুলে প্রবাস ফেরত এক যুবক স্বাবলম্বী হয়েছেন। ঘুঁচিয়েছেন নিজের ভাগ্যও। উপজেলার ফাজিলহাটী ইউনিয়নের গাছপাড়া কামারনওগাঁ বিলের পাশেই গড়ে তুলেছেন এ ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার।

বর্তমানে বিলের পানি শুকিয়ে পুরো জায়গাটা এখন আবাদি জমিতে রুপ নিয়েছে। কদিন পর এ সব জমিতে বোরো আবাদ হবে। বর্ষার মৌসুমে জমিগুলো জলাশয়ে পরিণত হয়। অল্প সময়ের পানিকে পুঁজি করে উপজেলার কামারনওগাঁ গ্রামের আমিনুর রহমান গড়ে তুলেছেন একটি ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার। পানি থাকাবস্থায় হাঁসগুলো ওই বিলে থাকে। পানি শুকিয়ে গেলে হাঁসগুলোকে নেওয়া হয় অন্যত্র। ভ্রাম্যমাণ খামারটি একদিকে বদলে দিচ্ছে আমিনুরের ভাগ্য, অন্যদিকে এলাকাবাসী পেয়েছে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা।

জানা যায়, এই শীতে বিলের বেশিরভাগ অংশ শুকিয়ে গেলেও কোথাও কোথাও একটু পানি রয়ে গেছে। খাবারের সময়ে মূলত হাঁসগুলোকে কাছে ডাকে আমিনুর। হাঁস পাহারায় ঝুঁপড়ির এক কোনে শোবার জায়গা বানিয়েছেন আমিনুর। ইচ্ছে, চেষ্টা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে বিদেশ ফেরত আমিনুর এখন মাসে লাখ টাকা উপার্জন করছেন হাঁসের খামার থেকে। জলাশয়ের অভাবে গত ৯ মাসে তিনবার জায়গা বদল করতে হয়েছে তাকে।

আমিনুর রহমান বলেন, বছর খানেক আগে তিনি ১ হাজার হাঁসের বাচ্চা কিনে খামার তৈরি করেন। প্রথমে কামারনওগাঁ সিকদারবাড়ি এলাকায় শ্বশুরবাড়ি, এরপর নিজের বাড়ি অতঃপর কামারনওগাঁর বিলে আনা হয়েছে খামারের হাঁসগুলো।

জলাশয় যেখান, সেখানেই ভ্রাম্যমাণ এই খামারটিকে সরাতে হয়। এবার পাশ্ববর্তী এলাসিন ইউনিয়নের সিংহরাগী এলাকায় ধলেম্বরী সংলগ্নে হাঁসগুলো সরানোর কথা ভাবছেন তিনি।

১০/১২বছর আগে তিনি গমের ব্যবসা করতেন। প্রতিদিনের লাভের অংশ থেকে একটি করে হাঁস কিনতেন। এভাবে ১শ৬৫টি হাঁস কিনেছেন। দীর্ঘ দিন ধরে হাঁস পালনের টাকায় সংসার চালিয়ে বিদেশে যাওয়ার খরচও জোগাড় করেছিলেন। উপার্জন বাড়াতে সৌদি আরবে যান। সৌদি থেকে ফিরে সিঙ্গাপুরে যান। প্রবাসের চেয়ে হাঁস পালনেই বেশি উপার্জন হবে ভেবে দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে প্রথমে বেকার হয়ে পড়েন। কদিন পরই ৩৫ হাজার টাকায় ১ হাজার জিনডিং ও খাকী ক্যাম্পবেল প্রজাতির হাঁসের বাচ্চা কেনেন। ঘর তৈরিতেও তেমন খরচ হয়নি। ভ্রাম্যমাণ খামার হওয়ায় সবসময় হাঁসগুলো থাকে জলাশয়ে। ফলে খাবার খরচও কমে আসে। বাচ্চাগুলো প্রথম তিন-চার মাস পালনের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩শডিম দিচ্ছে। প্রতি শতক ডিম ১১শটাকা (৪৪ টাকা প্রতি হালি) দরে খামার থেকেই কিনে নিচ্ছে পাইকাররা। এতে প্রতি দিনের সাড়ে তিনশডিম বিক্রি হয় ৩৮শটাকা। যা মাসে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ৫ মাস যাবত ধারাবাহিকভাবে সাড়ে তিনশডিম তুলছেন আমিনুর। কখনও খামার মাসে থেকে ৪শডিমও আসে।

আমিনুর রহমান আরও বলেন, জলাশয়ে ঠিকমতো পানি থাকলে খাবার খরচ কমে যেতো এতে ডিমের দাম আরও কম হতো। কিন্তু, পানি কমে যাওয়ায় অনেকটা সময় হাঁসগুলো বাড়িতে পালন করতে হয়। এরপরও তার ইচ্ছে চলতি বছরে ৩ হাজার বাচ্চা তার খামারে তুলবেন। বিদেশের চেয়েও এখন তার বেশি উপার্জন হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী অনেকে প্রেরণা পেয়ে খামার করার কথা ভাবছেন। ৪/৫ মাসে খামারের ডিম বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ টাকা। খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। এখন নিয়মিত ডিম দিচ্ছে। এছাড়া একহাজার হাঁসের দাম ৪শটাকা দরে হলে বিক্রি হবে  প্রায় ৪ লাখ টাকা। যার সবটুকুই থাকবে লাভ থেকে। এ হিসেবে মাসে লাখের ওপর উপার্জন হচ্ছে আমিনুরের। সঠিকভাবে শ্রম দিলে হাঁস পালনে বিদেশি টাকার চেয়েও বেশি উপার্জন করা সম্ভব। অনেকেই তাকে দেখে হাঁস পালনের পরামর্শ নিতে আসেন।

তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এসব খামার পরিদর্শন, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ, নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিলে খামারিরা উপকৃত হতো। হাঁস পালন একটি লাভজনক প্রজেক্ট। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাতকে একটি সম্ভাবনাময় খাতে রূপ দেওয়া সম্ভব।

আমিনুরের স্ত্রী বিপুল বলেন, তিনি এবং তার স্বামী দুজনে মিলেই শ্রম দিচ্ছে খামারে। ফলে স্বামী প্রবাসে থাকার চেয়ে তাদের সংসার এখন আরও ভালো চলছে। হাঁসের বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় প্রথম ধাপে ১৭ দিন দ্বিতীয় ধাপে ২১দিন প্রশিক্ষণ করেছেন তিনি। খামারে প্রাথমিক চিকিৎসা এখন নিজেই দিতে পারেন।

ডিম দেওয়ার সময় হাঁসের রোগ কম হয়। গম ভাঙা, কুঁড়া আর ধান একত্র করে হাঁসের খাবার তৈরি করা হয়। বাজার থেকে কেনা কোনো খাবার (ফিড) তাদের খামারে দেওয়া হয় না। সাড়ে তিনমাস বয়স থেকে ডিম দেওয়ার শুরু করে এখনও পালাক্রমে ডিম দিচ্ছে । হাঁস পালনেই মাসে লাখ টাকা উপার্জন করছে। কখনও মাসে এক লাখ আবার কোনো মাসে ১ লাখ ৩৫/৪০ হাজার টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে।

দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভ্যাটেরিনারী সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, আমিনুরের হাঁসের খামারটি নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। তবে হাঁসগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য নিয়মমাফিক ভ্যাকসিন এবং ডাক কলেরার টিকা সিডিউল অনুযায়ী দিতে হবে। সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ভ্যাকসিনসহ, চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবা দেওয়া হচ্ছে।

এএসটি/

 

সমগ্রবাংলা: আরও পড়ুন

আরও