কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন আজ
Back to Top

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন আজ

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২১

কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন আজ
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানের ৯৩তম জন্মদিন আজ। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরানো ঢাকার মাহুতটুলির ৪৬ নম্বর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা কবিতার এ প্রাণপুরুষ। বাঙালি জাতির নানা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের অসংগতি ও শোষণের বিরুদ্ধে তার অগ্নিদীপ্ত পঙ্ক্তিমালা বাংলা কবিতায় নির্মাণ করেছে অনন্য কাব্যস্বর।

শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি বলা হলেও গণমানুষের সঙ্গে আধুনিক বাংলা কবিতার আত্মীয়তা সৃষ্টিতে তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদালাভ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ তথা পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হন। অল্প সময়ের ভেতরেই দুই বাংলায় পরিচিতি লাভ করেন।

শামসুর রাহমানের ডাকনাম ছিল বাচ্চু। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন কবি- তাই নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ ও উপকরণ বিচিত্র আঙ্গিকে উঠে আসতে দেখা যায় তার কবিতায়। ষাটের দশকের শুরুর দিকেই তার প্রতিভার বিচ্ছুরণে আলোকিত হতে থাকে কবিতার ভুবন। "উনিশ শ' ঊনপঞ্চাশ" শিরোনামে রচনার মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে পদচিহ্ন আঁকেন বাংলা কবিতার আঙিনায়। এটি প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায়। আধুনিক কবিতার অনন্য পৃষ্ঠপোষক বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' পত্রিকায় তার 'রূপালি স্নান' কবিতাটি প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে শামসুর রাহমান সুধীজনের দৃষ্টিলাভ করেন। 

শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে একে একে রেডিও পাকিস্তান, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা ইত্যাদিতে কাজ করেছেন।

শামসুর রাহমান বাংলা কাব্যে সব সময় নাগরিকতার ধারক। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' (১৯৬০)। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, ব্যর্থতা, শোভাহীনতা, নৈঃসঙ্গ শামসুর রাহমান সেলাই করে দিয়েছেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের অনেক স্তবকে। তার কবিতার বিষয়বস্তু ছিল প্রেম, মানবিকতা, স্বাধীনতা, ভাষা। অসাম্প্রদায়িকতা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার পঙ্ক্তিমালা উচ্চকিত হয়েছে সব সময়। বাংলাদেশের ভাষাসংগ্রাম, স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে তার কবিতা ছিল অনুপ্রেরণা। নব্বইয়ের স্বৈরাচারী আন্দোলনের সময়ও শামসুর রাহমানের কলম থেমে থাকেনি।

'নিজ বাসভূমে', 'বন্দী শিবির থেকে', 'দুঃসময়ে মুখোমুখি', 'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা', 'বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে', 'ইকারুশের আকাশ', 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ', 'যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে', 'অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই', 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে', 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়', 'ভস্মস্তূপে গোলাপের হাসি' প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের শিরোনামই কবির স্বদেশ চিন্তার অন্যতম দলিল।

'বন্দী শিবির থেকে', 'বর্ণমালা', 'আমার দুঃখিনী বর্ণমালা',  'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯'- কবিতাগুলো তার স্বাধীনতাকামী মনের পরিচয় বহন করে। বাংলা কবিতার আধুনিকতম কবি শামসুর রাহমান। দেশমাতৃকার জন্য যার কবিতা স্লোগানে, ব্যানারে, দেয়াললিখনে এমনকি মুখে মুখে ব্যবহার হয়েছে অহরহ।

১৯৬৮ সালের দিকে পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন আইয়ুব খান, যার প্রতিবাদে আগস্টে ৪১ জন কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী বিবৃতি দেন যাদের একজন ছিলেন শামসুর রাহমানও। কবি ক্ষুদ্ধ হয়ে লেখেন মর্মস্পর্শী কবিতা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। 

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান এবং তিনি লিখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি।

১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ নামক কবিতা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’। 

শামসুর রাহমান ১৯৮৭ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী চার বছরের প্রথম বছরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, দ্বিতীয় বছরে ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, তৃতীয় বছরে ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং চতুর্থ বছরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন।

কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক নিবাস বর্তমান নরসিংদী জেলায়। দীর্ঘ ৭৭ বছরের বর্ণময় জীবনে তিনি নিমগ্ন ছিলেন কবিতা সৃজনের মোহে ও অনুরাগে। তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, কলামিস্ট, অনুবাদক ও গীতিকার।

লেখালেখির জন্য তিনি পেয়েছেন- একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, মিতসুবিসি পুরস্কার (সাংবাদিতার জন্য) ও আনন্দ পুরস্কার। এছাড়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবি শামসুর রাহমানকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে।

দিনটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ এবং শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে নানা আয়োজন করা হয়েছে।

এসকে
 

আরও পড়ুন

আরও